সববাংলায়

রাহুল দেব বর্মণ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বলিউড ও টলিউডে ইতিহাস সৃষ্টিকারী সুরকার হলেন রাহুল দেব বর্মণ (Rahul Dev Burman)। বিখ্যাত সুরকার শচীন দেব বর্মণের পুত্র হয়েও নিজের দক্ষতায় তিনি ভক্তদের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন।

১৯৩৯ সালের ২৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে রাহুল দেব বর্মণের  জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বলিউডের স্বনামধন্য সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক শচীন দেব বর্মন ও মা ছিলেন গীতিকার মীরা দেব বর্মণ। জন্মের পর আদর করে মামারবাড়ির সবাই নাম দিয়েছিলেন টুবলু। পরে তাঁর বাবা নাম রাখেন পঞ্চম। ছোট বেলায় শিশু রাহুল যখন কাঁদতেন বাবা তাঁকে সপ্তসুর শোনাতেন। সা রে গা মা পা এই পাঁচটি ধ্বনির “পা” ধ্বনিটি শুনে শিশু রাহুল পা শব্দ  উচ্চারণ করে চুপ করে যেতেন। সেই পঞ্চম ধ্বনি পা থেকে তাঁর নাম দেওয়া হয় পঞ্চম। আবার শোনা যায় অভিনেতা ‘অশোক কুমার’ রাহুল দেব বর্মণের নাম রেখেছিলেন পঞ্চম। পরবর্তীসময়ে রাহুল দেব বর্মণ পঞ্চম নামে বলিউডে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

রাহুল দেব বর্মণের শিক্ষা জীবন কেটেছে কলকাতায়। বাবা ও মা সঙ্গীত জগতের সাথে যুক্ত থাকায় বাড়িতে ছোট থেকেই গানের একটা আলাদা পরিবেশ ছিল এবং রাহুলেরও গানের প্রতি বরাবরই আকর্ষণ ছিল। তিনি উস্তাদ আলি আকবর খানের কাছে সঙ্গীতের অনুশীলন করতেন। এছাড়া সমতা প্রসাদের কাছে তিনি তবলার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বাংলার বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরীর কাছে তিনি গানের যাবতীয় জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জন করেন। সলিল চৌধুরী ছিলেন রাহুল দেব বর্মণের গুরু। এছাড়াও বাড়িতে বাবা তো ছিলেনই। বাবার সঙ্গী হয়ে ছোট-খাটো জলসায় গিয়ে রাহুল হারমোনিয়াম বাজাতেন। এইভাবে গান বাজনার সাথে তিনি ছোট থেকেই যুক্ত থাকতেন।

রাহুল ছোটো বেলায় নয় বছর বয়সে প্রথম একটি গানের সুর করেছিলেন, “ইয়ে মেরি টোপি পালাট কে আ”। এই গানটিকে তাঁর বাবা শচীন দেব বর্মণ ১৯৫৬ সালে ‘ফান্টুস’ ছবিতে ব্যবহার করেন। ছোট বেলায় তিনি আরেকটি গানেরও সুর করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে শচীন দেব বর্মণ এই গানকে গুরু দত্ত অভিনীত ‘পেয়াসা’ ছবিতে রেখেছিলেন। বাবা মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সুরকার হওয়ার সুবাদে তিনিও বাবার সাথে মুম্বাই পাড়ি দেন। প্রথম দিকে তিনি বাবা শচীন দেব বর্মণের সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হয়ে কাজ করতেন। বাবার সহকারী হয়ে তিনি অনেক হিন্দি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন। চলতি কা  নাম গাড়ি (১৯৫৮), কাগজ কে ফুল (১৯৫৯), বন্দিনী (১৯৬৩), তেরে ঘর কে সামনে (১৯৬৩), জিদ্দি (১৯৬৪)। ১৯৫৮ সালে রাহুল শচীন দেব বর্মণের সহসঙ্গীত পরিচালক হয়ে ‘সোলভা সাল’ ছবিতে কাজ করেছিলেন। ছবির একটি গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় “হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা” বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গানের দরকারে সুর দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি নিজে মাউথ অর্গান বাজাতেন।  ১৯৫৯ সালে তিনি গুরু দত্ত পরিচালিত একটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেন যেটি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সম্পূর্ণ হয়নি শেষ পর্যন্ত। রাহুলের নিজস্ব সঙ্গীত পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘ছোটে নবাব’ (১৯৬১)। কমেডিয়ান মেহেমুদ ছিলেন এই ছবির প্রযোজক। মেহেমুদ প্রথমে শচীন দেব বর্মণের কাছে ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনার আবেদন নিয়ে আসেন কিন্তু শচীন দেব বর্মণ না করে দেন। মেহেমুদের হঠাৎ চোখে পড়ে রাহুল নিজের তালে দুর্দান্ত তবলা বাজাচ্ছেন। মেহেমুদ রাহুলকে  ছবির সঙ্গীত পরিচালনার কথা বললে রাহুল রাজি হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে মেহেমুদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠলে তাঁর ‘ভুত বাংলো’ ছবিতে রাহুল ছোট্ট ক্যামিও চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।

পঞ্চমের নিজস্ব পরিচালনায় প্রথম সফল ছবি ‘তিসরি মনজিল’ (১৯৬৬)। এই ছবিতে তিনি আশা ভোঁসলে ও মহম্মদ রফিকে দিয়ে গান গাইয়ে বেশ সফল হয়েছিলেন। ষাট-সত্তরের দশকে পরপর হিট হিন্দি ছবির গান দিয়ে তিনি ভক্তদের মনে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর সুর দেওয়া  উল্লেখযোগ্য কতগুলি ছবি হলো- পডোসন (১৯৬৪), ইয়াদো কি বারাত (১৯৭৩), আরাধনা (১৯৬৯)। ‘আরাধনা’  ছবির একটি গান “মেরি স্বপ্ন কি রানি কব আয়েগী তু” সত্তর দশকে বিশাল হিট করেছিল। গানের জগতে তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করতে সফল হয়েছিলেন।

রাজেশ খান্না অভিনীত ৪০টি ছবির সুরকার ছিলেন পঞ্চম। সত্তর দশকে পঞ্চম-মহম্মদ রফি-কিশোর-আশা-লতা বলিউডি হিন্দি ছবিতে অমূল্য সব গান উপহার দিয়েছেন। এই ব্যাক্তিত্বরা সত্তর দশকে গানের জগতে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। রাজেশ খান্নার ছবিতে ও পঞ্চমের সুরে কিছু বিখ্যাত গান-
“ইয়ে যো মোহাব্বত হ্যায়”, “ভিগি ভিগি রাতো মে”, “ইয়ে সাম মস্তানি”, “জয় জয় শিব শঙ্কর”, “রূপ টেরা মস্তানা” ইত্যাদি। রাহুলের সুর দেওয়া কিছু বিখ্যাত গান হল – “দম মারো দম”, “বুড্ডা মিল গ্যায়া”, “মেহবুবা মেহবুবা”, “পিয়া তু আব তো আজা”,”কেয়া হুয়া তেরা বাদা” গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বলাবাহুল্য গানের কারণেই ছবিগুলি সাফল্য পেয়েছিল।

রাহুল ছিলেন মনে প্রাণে বাঙালি। মুম্বাইতে বাস করলেও কলকাতাতেই তাঁর মন পড়ে থাকত। তিনি অনেক বাংলা গানেও সুর দিয়েছিলেন। “মনে পড়ে রুবি রায়” “শোনো মন বলি তোমায়” “একদিন পাখি উড়ে যাবে” “যেতে দাও আমায় ডেকো না” “যেতে যেতে পথে হলো দেরি” বাংলা ছবির ইতিহাসে যুগান্তকারী গান এগুলি।

রাহুলের প্রথম বিবাহিতা স্ত্রী রিতা প্যাটেল। রিতা ছিলেন পঞ্চমের গুণমুগ্ধ ভক্ত। দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে দুজনের দেখা হয়। এই সূত্রে তাঁদের দেখা প্রেম ও বিয়ে।  ১৯৬৬ সালে তাঁরা বিয়ে করলেও ১৯৭১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। স্ত্রী’র সাথে বিচ্ছেদের পর পঞ্চম মানুষিক ভাবে ভেঙে পড়েন। এই সময়ে তিনি মুম্বাইয়ের ফাঁকা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, হোটেলে গিয়ে থাকতেন। এই সময়েই তিনি বিখ্যাত গান “মুসাফির হো ইয়ারো না ঘর হে না ঠিকানা” রচনা করেছিলেন যেটি ‘পরিচয়’ (১৯৭২) ছবিতে ব্যবহার হয়েছিল। ১৯৮০ সালে  রাহুলের সাথে আশা ভোঁসলের বিয়ে হয়। তবে আশাও পঞ্চমের জীবনে শেষ পর্যন্ত সাথ দিতে পারেননি।

১৯৮৪ সালের পর পঞ্চমকে সেভাবে আর ছবির কাজ করতে দেখা যেত না, বলা ভালো তাঁকে আর ছবির কাজ দেওয়া হত না। শোনা যায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বাপি লাহিড়ীর আগমনের পর পঞ্চমের কাজ কমে আসে। এক সময় যে পরিচালকদের সাথে কাজ করে তিনি সফল গান উপহার দিয়েছিলেন তাঁরাই পঞ্চমকে পরে কাজ দিতে অনীহা দেখাতেন। বলতেন পঞ্চম ছবির কাজ করলে সেই ছবি আর হিট করবে না। ১৯৮৮ সালে তাঁর হার্ট অ্যাট্যাক হয়। লন্ডনের হাসপাতালে তাঁর বাইপাস সার্জারি করা হয়। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর তিনি কতগুলি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন তবে তাঁর বেঁচে থাকাকালীন এই ছবিগুলি মুক্তি পায় নি। পঞ্চমের সুর দেওয়া শেষ ছবি ‘১৯৪২ আ লাভ স্টোরি’। এই ছবিটি তাঁর মৃত্যু’র পর মুক্তি পেয়েছিল।জীবনের শেষ পর্বে তিনি আর্থিক কষ্টে ভুগতেন। তাঁর খোঁজ নেওয়ার মত কেউ ছিল না। এটাই হয়ত ভাগ্যের পরিহাস। তবে জীবনের শেষ সময় অবধি তিনি সুরেই ডুবে ছিলেন ও নিজের মনে নানা সুর করে গেছেন।

১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি মাত্র ৫৪ বছর বয়সে কিংবদন্তি এই সুরকারের  মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading