ইতিহাস

রাজা দিগম্বর মিত্র

রোনাল্ড রস মশা নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন তার ভিত্তি ছিল এই বাঙালির মৌলিক তত্ত্ব। এই বাঙালির দেখানো  রেলপথ তৈরির ক্ষেত্রে নিকাশি তত্ত্বের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল মালয় যুক্তরাষ্ট্র সহ আরো কিছু দেশ। মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র প্রথম সংস্করণের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছিলেন এই বাঙালি। ইনি রাজা দিগম্বর মিত্র (Digambar Mitra)।

হুগলির কোন্নগরের বিখ্যাত মিত্র পরিবারে ১৮১৭ সালে জন্ম দিগম্বর মিত্রের(Digambar Mitra)।

পড়াশোনা মূলত কলকাতায়। ১৮২৭ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত হেয়ার স্কুলে,তারপর হিন্দু কলেজ।১৮৩৪ পর্যন্ত হিন্দু কলেজে পড়েছেন।

ছাত্রজীবন শেষে মুর্শিদাবাদের কালেক্টর রাসেলের কাছে কিছুদিন কাজ করেছিলেন।মুর্শিদাবাদে স্কুল শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছেন।এরপর ১৮৩৮ সালে কাশিমবাজারের রাজার গৃহশিক্ষক ও দেওয়ানের কাজে নিযুক্ত হন।মৃত্যুর আগে রাজা কৃষ্ণনাথ তাঁকে এক লক্ষ টাকা উপহার দিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে  এই টাকায় উনি রেশম ব্যবসা শুরু করেন আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে।এদেশে কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবন বিষয়ে দিগম্বর মিত্রের ছিল অত্যন্ত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী। তাঁর চেষ্টার ফলেই ১৮৫১তে স্থাপিত হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন যার সহসচিব ছিলেন তিনি।

মহামারী জ্বরের ব্যাপারে যে কমিশন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার গঠন করেছিল তাতে একমাত্র ভারতীয় ছিলেন দিগম্বর মিত্র(Digambar Mitra)।এছাড়াও ১৮৬১ তে  মিউনিসিপ্যাল কমিশন, ১৮৬৬-তে দুর্ভিক্ষ কমিটি বা ১৮৭১-এ পথ কর কমিটি তে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল।

মহামারীর কারণ সন্ধানে অন্য সকলের মতের সঙ্গে দিগম্বরের মত মেলেনি। তিনি ভীষণভাবে নিশ্চিত ছিলেন , গ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলে  কৃত্রিমভাবে জলনিকাশি ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবার ফলেই মহামারীর সৃষ্টি এবং এর জন্য যে রেল ও সড়কপথ জন্য তৈরী উঁচু বাঁধ যা জল নিকাশের স্বাভাবিক গতিকে বাধা দিচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

রোনাল্ড রস মশা নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন তার ভিত্তি ছিল দিগম্বর মিত্রের মৌলিক তত্ত্ব।হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় দিগম্বর মিত্রের মহামারীর কারণ অনুসন্ধান বিষয়ে মত নিয়ে আলোচনার নিদর্শন পাওয়া যায়।উনি একটি বইও লিখেছিলেন ‘বাংলার মহামারী জ্বর’-শিরোনামে।

তবে দিগম্বর মিত্রের নিকাশি তত্ত্বের বিরুদ্ধাচারণ কেবল মাত্র তৎকালীন ইংরেজরাই করেনি, দেশীয় ইংরেজভক্ত রাও তার মতের বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধা করেননি।অথচ ওনার রেলপথ তৈরির ক্ষেত্রে নিকাশি তত্ত্বের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল মালয় যুক্তরাষ্ট্র সহ আরো কিছু দেশ।

আমরা কিন্তু অনেকেই জানিনা দিগম্বর মিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদানের কথা।মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র প্রথম সংস্করণের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছিলেন দিগম্বর মিত্র(Digambar Mitra)।

কবির ভাষায় মঙ্গলাচরণে তেমনটাই দেখা যাচ্ছে-
“মঙ্গলাচরণ/বন্দনীয় শ্রীযুক্ত দিগম্বর মিত্র মহাশয়/বন্দনীয়বরেষু।

আর্য্য, আপনি শৈশবকালাবধি আমার প্রতি যেরূপ অকৃত্রিম স্নেহভাব প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন, এবং স্বদেশীয় সাহিত্যশাস্ত্রের অনুশীলন বিষয়ে আমাকে যেরূপ উৎসাহ প্রদান করিয়া থাকেন, বোধ হয়, এ অভিনব কাব্যকুসুম তাহার যথোপযুক্ত উপহার নহে। তবুও আমি আপনার উদারতা ও অমায়িকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহসপূর্বক ইহাকে আপনার শ্রীচরণে সমর্পন করিতেছি। স্নেহের চক্ষে কোন বস্তুই সৌন্দর্য্যবিহীন দেখায় না।…

কলিকাতা।                                                                                                                                           দাস শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
২২শে পৌষ, সন ১২৬৭ সাল

ইংরেজ সরকারের থেকে দিগম্বর রাজা উপাধি পেয়েছিলেন।ইনিই হলেন কলকাতার প্রথম বাঙালি শেরিফ। ১৮৭৯ এর ২০শে এপ্রিল দিগম্বর মিত্র(Digambar Mitra) মারা যান।

তথ্যসূত্র


  1. বিস্মৃতপ্রায় বাঙালী বিজ্ঞানীঃরণতোষ চক্রবর্তীঃ ম্যালেরিয়ার কারণ সন্ধানেঃপৃ ১২-১৬ 
  2. https://archive.org/details/rajadigambarmit00bholgoog
  3. http://bn.banglapedia.org
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Digambar_Mitra
  5. http://murshidabad.net/glossary/glossary-do-get-word-digambar+mitra.htm
  6. http://dspace.wbpublibnet.gov.in:8080/xmlui/handle/10689/927

 
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।