ইতিহাস

শান্তি স্বরূপ ভাটনগর

শান্তি স্বরূপ ভাটনগর একজন বিখ্যাত ভারতীয় কলয়েড রসায়নবিদ যিনি ‘ভারতীয় গবেষণাগারের জনক’ হিসাবে পরিচিত। কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR) -এর প্রথম পরিচালকও (Director General) ছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সাল থেকে ভারতীয় বিজ্ঞান ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর সম্মানে ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার’ প্রদান শুরু হয়েছে।

১৮৯৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শান্তি স্বরূপ ভাটনগর। মাত্র আট মাস বয়সেই তিনি তাঁর বাবা পরমেশ্বরী সাহাই ভাটনগরকে হারান। মামারবাড়ির দাদুর কাছেই মূলতঃ তিনি বেড়ে ওঠেন। তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় সিকান্দ্রাবাদ স্কুলে। পরবর্তীকালে তিনি ভর্তি হন আ্য‌ংলো বৈদিক স্কুলে যেখান থেকে উনি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯১৬ সালে ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে (বিএসসি) ডিগ্রি লাভ করেন এবং এখান থেকেই ১৯১৯ সালে তিনি রসায়নে (এম এস সি) ডিগ্রি লাভ করেন।

এই কলেজেই তিনি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিভাগের ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে জীবনের প্রথম উপার্জন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে দয়াল সিং কলেজের সিনিয়র ডেমনস্ট্রেটর হিসেবেও কাজ করেছেন কিছুকাল। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাও সমান তালে চালিয়ে গেছেন তিনি। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে তিনি ডি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করেন। এই একই বছরে তিনি ভারতে ফিরে এসে নতুন স্থাপিত বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। এখানে তিন বছর অধ্যাপনার পর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হয়ে যোগদান করেন। বেনারসে থাকাকালীন তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘কূলগীত’ বা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত রচনা করেছিলেন।

কলয়েড রসায়নবিদ্যা ও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে চৌম্বকক্ষেত্রের ব্যবহার শান্তি স্বরূপ ভাটনগরের গবেষনার বিষয় ছিল। তিনি সর্বদাই নানান বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে মগ্ন থাকতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের মধ্যে একটি হল অপরিশোধিত তেলকে নানা উপায়ে শোধিত করার পদ্ধতি আবিষ্কার। একটি বিখ্যাত তেল শোধনকারী সংস্থা অয়েল ড্রিলিং (oil drilling) অপারেশনের সময় কাদা ও লবনাক্ত জলের কারণে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। সেই সমস্যার সমাধান শান্তিস্বরূপ কলয়েড রসায়নের মাধ্যমে করেছিলেন। তিনি এক প্রকার আঠা আবিষ্কার করেন যার দরুন কাদা জলে বসে যাওয়া যন্ত্রগুলি সহজে আটকে না গিয়ে সহজ গতিতে ড্রিলের কাজ সম্পন্ন করত।

তিনি এবং ডঃ এন. মাথুর একত্রে একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন যেটির নাম দেন তাঁরা বি. এইচ.এম.আই.বি ( ভাটনগর মাথুর ম্যাগনেটিক ইন্টারফেয়ারেন্স ব্যালান্স)। তৎকালীন সময়ে চৌম্বকত্ব পরিমাপের ক্ষেত্রে সব থেকে সংবেদনশীল যন্ত্র ছিল এটি। তাঁদের এই যন্ত্র লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও তিনি কিভাবে কেরোসিনের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত আগুন শিখার আয়তন ও উচ্চতা বৃদ্ধি করা যায়, মোম কে কিভাবে গন্ধহীন করা যায় তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি গ্যাস নিরোধক পোশাক এবং বর্জ্য থেকে কিভাবে প্লাস্টিক তৈরি করা যায় তাও আবিষ্কার করেছিলেন।

তিনি তাঁর কর্মজীবনে ভারত সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তরগুলিতে উচ্চপদে আসীন ছিলেন।কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর ( CSIR) প্রথম ভারতীয় মহাপরিচালকও ছিলেন তিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ভারত সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা দপ্তরের প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি আ্যটোমিক এনার্জি কমিশনেরও প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন। এছাড়াও তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষাদপ্তরের সেক্রেটারির পদও সামলেছেন। ভারতবর্ষে জাতীয় গবেষণা উন্নয়ন পর্ষদ (NRDC) স্থাপনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

সারা জীবনে একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তিনি ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সের প্রথম নির্বাচিত ফেলোদের (FASc) মধ্যে একজন।ভারতের ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (FNI) এর ফেলো নির্বাচিত হন।আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, পদার্থবিজ্ঞান ইন্সস্টিটিউটের এর ফেলো (FInstP), রয়্যাল ইন্সস্টিটিউট অফ কেমিস্ট্রির (FRIC) ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (OBE) এবং নাইটহুড খেতাবেও ভূষিত হয়েছিলেন। এছাড়াও ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে ১৯৫৪ সালে।
১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি এই কিংবদন্তি বিজ্ঞানীর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন