ইতিহাস

রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা

রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা

রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা ভারতের সমাজ-রাজনৈতিক ইতিহাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এক অন্যতম জ্বলন্ত নিদর্শন। ভারতীয় সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে সংবিধানে স্বচ্ছতা তুলনায় একটু কম। এই মামলা ভারতীয় সংবিধান এবং আইনের এই দিকটিকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলে। দেশের নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার কারণে অন্য এক নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কী খর্ব করা যায়? ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টকে এই জটিল সমস্যার মুখোমুখি এনে দিয়েছিল এই মামলা।

১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে সুপ্রিম কোর্টে রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা শুরু হয়। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন বি. পি. জীবন রেড্ডি। এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন তামিলনাড়ুর ‘নাক্ষীরান’ নামের একটি তামিলভাষী পত্রিকার সম্পাদক আর. রাজাগোপাল। তামিলনাড়ু থেকে প্রকাশিত ‘নাক্ষীরান’ পত্রিকার সম্পাদকের পাশাপাশি সহ-সম্পাদক, মুদ্রক এবং প্রকাশক প্রত্যেকেই এই মামলার অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের বিপক্ষে মামলা লড়েছিল তামিলনাড়ু রাজ্য, কারা-মহাপরিদর্শক (Inspector General of Prison) এবং কারা-সুপারিনটেন্ডেন্ট (Superintendent of Prison)।  


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে মাদ্রাজ এলাকার এক অখ্যাত সিরিয়াল কিলার গৌরী শঙ্কর ওরফে অটো শঙ্করকে ঘিরে। দুই বছরের ব্যবধানে অটো শঙ্কর এবং তার দল পরপর ৬টি খুন করার অপরাধে অভিযুক্ত হয়। চেঙ্গালপাত্তু সেশন আদালতের বিচারে অটো শঙ্কর এবং তার দুই সঙ্গীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। কারাবন্দি থাকাকালীন একটি আত্মজীবনী লেখেন অটো শঙ্কর এবং তামিলনাড়ুর সাপ্তাহিক ‘নাক্ষীরান’ পত্রিকায় তা প্রকাশ করার শেষ ইচ্ছে জানান। এই আত্মজীবনীর মধ্যেই কারা-আধিকারিক এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অটো শঙ্করের সখ্যতা ও এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্পষ্ট লেখা ছিল। এমনকি অটো শঙ্কর তার আত্মজীবনীতে এও উল্লেখ করেছিলেন যে তাদের করা খুনের সঙ্গেও সেই আধিকারিকদের সম্পর্ক ছিল। এই আত্মজীবনী প্রকাশের আগে কারা-আধিকারিকরা অটো শঙ্করকে বলপূর্বক পত্রিকা দপ্তরে চিঠি লিখে আত্মজীবনী প্রকাশ না করার আবেদন জানাতে বলেন। অটো শঙ্কর এই চিঠি লিখতে চাননি। ফলে কারা-মহাপরিদর্শক নিজেই পত্রিকার সম্পাদকের কাছে এই আত্মজীবনীটি প্রকাশ করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি চিঠি লেখেন। এই কারণেই অভিযোগকারীরা ভারতীয় নাগরিকের বাক-স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেন মাদ্রাজ উচ্চ আদালতে। কিন্তু সেখানে এই অভিযোগ খারিজ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের প্রকাশনার অধিকার আদায়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযোগকারীরা। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং ধারায় ভারতীয় নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গেই গোপনীয়তার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই অধিকার আসলে ব্যক্তিকে নিজের মত একাকী থাকতে দেওয়ার অধিকার। একজন নাগরিকের তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, বিবাহ সংক্রান্ত, সন্তানাদি, মাতৃত্ব, শিক্ষা এবং বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত সমস্ত প্রকার সত্য গোপন রাখার অধিকার রয়েছে। সেই নাগরিকের অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কিত এই ধরনের গোপন তথ্য প্রকাশ্যে আনতে পারেন না, তা যদি সত্যও হয় তাহলেও নয়। যদি এই ঘটনা ঘটে, তবে সেক্ষেত্রে অপর নাগরিক উদ্দিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করবেন এবং উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নষ্টের জন্য দায়ী হবেন। তবে কেউ যদি নিজেকে স্বেচ্ছায় এই ধরনের বিতর্কে জড়াতে চায় তাহলে তার ক্ষেত্রে ঘটনার গতিবিধি অন্যরকম হবে। ফলে এই মামলা থেকে যে কয়টি প্রশ্ন উঠে আসে তা হল –

  • কোনও ব্যক্তিকে তার আত্মজীবনী লেখা বা প্রকাশ করা থেকে বিরত করা যায় কী যেখানে সেই আত্মজীবনীটি অন্য কোনও নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করছে?
  • সংবিধানের ১৯ নং ধারা অনুসারে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকারের ভিত্তিতে কোনও পত্রিকা যদি এই ধরনের কোনও অননুমোদিত লেখা প্রকাশ করে থাকে আর তা যদি অন্য কারও মানহানি কিংবা গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপ করে; তবে সেক্ষেত্রে প্রতিকারের রাস্তা কী?
  • রাজ্য কিংবা জন-আধিকারিকরা মানহানির বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং তারা কি সংবাদপত্র বা পত্রিকাকে এই ধরনের মানহানিকর লেখা প্রকাশে বাধা দিতে পারেন?
  • কারাবন্দির বকলমে কারা-আধিকারিকেরা কি আত্মজীবনীটি প্রকাশ করার উপর পত্রিকা দপ্তরকে নিষেধাজ্ঞা পাঠিয়ে ঠিক করেছেন?

রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা চলাকালীন বাদীপক্ষ হিসেবে পত্রিকা সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও অন্যান্যরা দাবি করেন যে অটো শঙ্করের লেখা বইতে কারা-আধিকারিকদের সম্পর্কে কথিত ঘটনাগুলি সবই নিখাদ সত্য এবং সেই সূত্রে সত্যকে কখনই মানহানিকর দোষে সাব্যস্ত করা যায় না। বিবাদী পক্ষ আবার প্রশ্ন তুলেছিলেন যে সেই আত্মজীবনীটি আদৌ অটো শঙ্করের লেখা কিনা তা বিষয়ে। এই প্রশ্নের উত্তরে কারা-আধিকারিকরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে অটো শঙ্কর সেই জীবনীটি লেখার পর তার পাণ্ডুলিপিটি তার স্ত্রীর হাতে পত্রিকা দপ্তরে প্রকাশের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন যে ঘটনা নথিবদ্ধ করা আছে কারা-বিভাগের কাছে। বাদীপক্ষ এও জানিয়েছিলেন যে মামলা চলার সময় গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ধরাই হয়নি। কিন্তু বিবাদী পক্ষ এই বয়ানের বিরোধিতা করে জানিয়েছে যে ভারতীয় সংবিধানে যে মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে তাও কিছু বিধিনিষেধের অধীন, কিন্তু এই মামলার ক্ষেত্রে কোনও প্রকার বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করা হয়নি। গোপনীয়তার অধিকারের তুলনায় বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল এই মামলায়।

১৯৯৪ সালের ৭ অক্টোবর রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা সংক্রান্ত রায় ঘোষণা করে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ে গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আদালত উল্লেখ করেছে যা –

১) গোপনীয়তার সাধারণ আইন লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতির বিরুদ্ধে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

২) গোপনীয়তার অধিকারকে দেওয়া সাংবিধানিক স্বীকৃতি ব্যক্তির নিজস্ব পরিসরে সরকারের হস্তক্ষেপকে বে আইনি ঘোষণা করে।

আদালত বিশ্ব জুড়ে বেশ কিছু আইনি ধারার উল্লেখ করেছে এই মামলার বিচারের ক্ষেত্রে এবং ভারতীয় সংবিধানের ক্ষেত্রে সেই ধারাগুলি কতটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আদালত ব্যাখ্যা করেছে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। আদালত এও বিচার করেছে যে রাষ্ট্রের পক্ষে মানহানিকর এমন লেখাপত্র প্রকাশের উপর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার অধিকার নেই। তবে আদালত তার রায়ে জানিয়েছে যে লেখা প্রকাশের পরে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে মানহানির দায়ে মামলা করতেই পারে, কিন্তু লেখা প্রকাশের আগে তার উপর কোনও রূপ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে না। সর্বোপরি আদালত তার রায়ে জানায় যে পত্রিকা সম্পাদক কারাবন্দি অটো শঙ্করের অনুমতিসাপেক্ষে কিংবা বিনা অনুমতিতেই তার আত্মজীবনী কিংবা অন্য কোনও নিবন্ধ প্রকাশ করতেই পারেন কারণ তা সরকারি দলিল। কিন্তু যদি তা রাষ্ট্রের কোনও নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে ভারতের সমাজ-রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজাগোপাল বনাম তামিলনাড়ু মামলা এভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে একটি সেতু রচনা করতে সক্ষম হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন