হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে সারেঙ্গীকে একটি অন্যতম বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন রাম নারায়ণ (Ram Narayan)। ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তিনিই প্রথম একক বাদ্য হিসেবে সারেঙ্গীকে ব্যবহার করেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে। প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় সারেঙ্গীবাদক হিসেবে তিনি পরিচিত হন। তরুণ বয়সে একজন সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে কাজ করার পরে ১৯৪৪ সালে লাহোরের ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’য় একজন সঙ্গত হিসেবে কাজ শুরু করেন রাম নারায়ণ । ১৯৫৬ সালে একজন একক কনসার্ট শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় সফর করেন সারেঙ্গীবাদক হিসেবে। ১৯৬৪ সালে আমেরিকায় তিনি প্রথমবার একক সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করেন তাঁর ভাই অন্যতম তবলা বাদক চতুর লালের সঙ্গে। ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান হিসেবে ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত করেন।
১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তর-পশ্চিম ভারতের উদয়পুরের কাছে আম্বর গ্রামে পণ্ডিত রাম নারায়ণের জন্ম হয়। তাঁর বাবা নাথুজি বিয়াভাত দিলরুবা বাজাতে পারতেন খুব ভালো এবং তাঁর মা ছিলেন একজন সঙ্গীতানুরাগী মহিলা। রাম নারায়ণের প্রপিতামহ বাগাজি বিয়াভাত আম্বরের একজন খ্যাতনামা গায়ক ছিলেন। মহারানা উদয়সিং-এর দরবারে গান গেয়েছিলেন তাঁর প্রপিতামহ এবং পিতামহ দুজনেই। রাম নারায়ণের মাতৃভাষা রাজস্থানি হলেও পরে তিনি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা শেখেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর পূর্বসুরির রেখে যাওয়া একটি ছোট্ট সারেঙ্গী খুঁজে পান তিনি। পরে তাঁর বাবার কাছেই তিনি সারেঙ্গী বাজানো শেখেন। সেকালে গণিকাদের মধ্যে সারেঙ্গী বাজানোর চল থাকার কারণে এটি সমাজে অত্যন্ত নিম্ন মর্যাদার বলে মানা হত। তাই নারায়ণের বাবা তাঁকে সারেঙ্গী বাজানো শেখালেও এই দিকটি নিয়ে বেশ ভাবিত ছিলেন। রাম নারায়ণকে সারেঙ্গী শেখানোর তাঁর বাবা জয়পুরের মেহবুব খানের কাছে নিয়ে গেলে মেহবুব খান রাম নারায়ণকে তাঁর বাবার শেখানো আঙুলের কৌশল পাল্টাতে বললে এই সিদ্ধান্ত বদল করেন তাঁর বাবা। পরবর্তীকালে স্কুল ছেড়ে পূর্ণসময়ের জন্য সারেঙ্গী শেখার দিকে রাম নারায়ণ কে মনোনিবেশ করতে উৎসাহ দেন তাঁর বাবা। দশ বছর বয়সে রাম নারায়ণ উদয়পুরের সারেঙ্গীবাদক উদয়লালের সারেঙ্গীবাদন দেখে ও অনুকরণ করে সারেঙ্গী বাজানো শেখার পাশাপাশি হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীত সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করেন। উদয়লালের মৃত্যুর পরে রাম নারায়ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে ভ্রাম্যমান সঙ্গীতজ্ঞ মাধব প্রসাদের যিনি মাইহারের বাঈজিপল্লীতে সারেঙ্গী বাজাতেন। এরপরে মাধব প্রসাদের কাছেই নাড়া বেঁধে গভীর অধ্যবসায়ে খেয়াল সঙ্গীত শেখেন তিনি এবং চার বছর পরে উদয়পুরে এসে সঙ্গীতশিক্ষার স্কুলে গান শেখাতে শুরু করেন। মাধব প্রসাদ এরপরে নারায়ণের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণ সময়ের জন্য সঙ্গীতচর্চায় মনোনিবেশ করতে বলেন কিন্তু এই প্রস্তাব নারায়ণের পরিবার ভালোভাবে মেনে নেয়নি। কিছুদিনের মধ্যে মাধব প্রসাদের মৃত্যু হলে কিছুদিন অন্য এক শিক্ষকের কাছে সঙ্গীতশিক্ষার পরে লাহোরে চলে যান রাম নারায়ণ। পরবর্তীকালে শীলা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের জ্যেষ্ঠপুত্র ব্রিজনারায়ণ একজন সফল সরোদ বাদক, তাঁদের কন্যা অরুণা নারায়ণ ভারতের একমাত্র একক মহিলা সারেঙ্গীবাদক এবং তাঁদের অপর সন্তান শিব তবলাবাদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
১৯৪৩ সালে লাহোরে গিয়ে স্থানীয় ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’তে সারেঙ্গীবাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রাম নারায়ণ। সাধারণত গানের সঙ্গে সঙ্গতেই আগে সারেঙ্গী বাজানো হত। কিন্তু ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’র পরিচালক মাট্টু রাম নারায়ণকে একজন একক সারেঙ্গীবাদক হিসেবে বেতারে অনুষ্ঠান করতে সম্মতি দেন। এভাবেই একক সারেঙ্গীবাদক হিসেবে নিজের কর্মজীবনে নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ভারত বিভাজনের পরে ১৯৪৭ সাল নাগাদ তিনি দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং স্থানীয় অল ইণ্ডিয়া রেডিওতে সারেঙ্গীবাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, বড়ে গোলাম আলি খান, হিরাবাঈ বাদোদেকার এবং কৃষ্ণারাও শঙ্কর পণ্ডিতের সঙ্গে সঙ্গতে সারেঙ্গী বাজিয়েছেন রাম নারায়ণ। ১৯৪৮ সালে পন্ডিত আমির খান যখন প্রথমবার অল ইণ্ডিয়া রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন, তাঁর সঙ্গে সারেঙ্গী বাজান রাম নারায়ণ। ১৯৪৯ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করার জন্য তিনি বোম্বাই পাড়ি দেন এবং ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ এইচএমভি গ্রুপের জন্য তিনটি একক সারেঙ্গীর গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি করেন। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে অর্থকরী প্রাপ্যের পরিমাণ বেশ ভালো হলেও, এতে ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে তাঁর মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। পরবর্তী পনেরো বছরের জন্য তিনি বহু চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীত নির্মাণ করেন যার মধ্যে আদালত, গঙ্গা যমুনা, হামদর্দ, কাশ্মীর কি কলি, মুঘল-ই-আজম, নুরজাহান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৫২ সালে আফগানিস্তানে এবং ১৯৫৪ সালে চীনে সারেঙ্গীবাদনের অনুষ্ঠান করেন তিনি। দুই দেশেই ভীষণ সমাদৃত হন তিনি। ১৯৫৪ সালে মুম্বাইয়ের কাওয়াসজি জাহাঙ্গীর হলের এক অনুষ্ঠানে তাঁকে অনুষ্ঠানের মাঝপথেই থামিয়ে দেন অনুৎসাহী দর্শকরা। কারণ তারা এরপরে জনপ্রিয় এক সঙ্গীতশিল্পীর গান শুনতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। অপমানিত নারায়ণ এর ফলে সেই সময় সারেঙ্গী বাজানো ছেড়ে শুধু গান গাইবার কথাই ভাবতে থাকেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালে মুম্বাইতে আরেকটি অনুষ্ঠানে তাঁর একক সারেঙ্গীবাদন বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিছুদিন পরে গানের সঙ্গতে সারেঙ্গী বাজানো ছেড়ে দেন তিনি, এই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক দিক থেকে খুব সমস্যাজনক ছিল কারণ সেই সময় একক সারেঙ্গীবাদন শোনার জন্য অনুরাগী দর্শকের বড় অভাব ছিল।
বিখ্যাত সেতারবাদক রবিশঙ্কর পশ্চিমের দেশগুলিতে সফলভাবে একক অনুষ্ঠান করার পরে রাম নারায়ণও তাঁকে অনুসরণ করে ১৯৬৪ সালে তাঁর বড় ভাই চতুর লালের সঙ্গে একত্রে আমেরিকায় একটি সারেঙ্গীবাদনের অনুষ্ঠান করেন। ঐ বছরই প্রথম আমেরিকা ও ইউরোপ সফরে যান তিনি। ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি ইউরোপীয় দেশে অনুষ্ঠান করেন রাম নারায়ণ। তাঁর এই অনুষ্ঠানের সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিল গ্যেটে ইনস্টিটিউট। এছাড়া ইংল্যাণ্ডের ‘লণ্ডন ফেস্টিভ্যাল’-এও সারেঙ্গী উপস্থাপনা করেছেন তিনি। ১৯৮০ সাল নাগাদ প্রায় প্রতি বছরই এক মাসের জন্য বিদেশ সফরে যেতে শুরু করেন রাম নারায়ণ এবং একজন জনপ্রিয় সারেঙ্গীবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। তবে ২০০০ সাল নাগাদ এই বিদেশ সফরের পরিমাণ কমে আসে এবং ২০১০ সালের পর রাম নারায়ণ আর বিদেশে যাননি সেভাবে।
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে রাম নারায়ণের সারেঙ্গীবাদন এক বিশেষ ঘরানার জন্ম দিয়েছিল। একক অনুষ্ঠান করার জন্য তাঁর বাদ্যযন্ত্র পছন্দ করা বা তাঁর সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষের থেকে সেই বাদ্যযন্ত্রের তালিম নেওয়া কোনোটাই সাধারণের মত ছিল না। কেবলমাত্র শ্রোতাদের খুশি করা এবং সকলের মধ্যে সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করার মধ্যেই তাঁর সারেঙ্গীবাদনের সার্থকতা। আধুনিক কনসার্টের উপযোগী একটি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সারেঙ্গীকে একটি উন্নত মর্যাদার আসনে বসান পণ্ডিত রাম নারায়ণ । তিনিই প্রথম ভারতীয় সারেঙ্গীবাদক যিনি আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য লাভ করেছিলেন। তাঁর সুনিপুণ ও অভিনব অঙ্গুরীবিন্যাস পদ্ধতি (Fingering technique) কনসার্টে সারেঙ্গীবাদনের এক অভিনব আদল তৈরি করে দিয়েছিল। পরবর্তীকালের বহু সারেঙ্গীবাদক এই ধাঁচেই নারায়ণকে অনুসরণ করে সারেঙ্গীবাদনে অভ্যস্ত হন। ১৯৭০ ও ১৯৮০ সাল নাগাদ মুম্বাইয়ের ‘আমেরিকান সোসাইটি ফর ইস্টার্ন আর্টস’ ও ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস’-এ পড়াতেন রাম নারায়ণ। সারেঙ্গীর জন্য সেখানেই তিনি প্রথম প্রথাগত ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। তাঁর মেয়ে অরুণা নারায়ণ, তাঁর নাতি হর্ষ নারায়ণকে তিনি নিজে হাতে সারেঙ্গীবাদনের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ৫০০ জনেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীর পাশে মোট ১৫ জন ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে সারেঙ্গী শিখতেন রাম নারায়ণের কাছে।
১৯৭৬ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন এবং ১৯৯১ সালে তিনি ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৫ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবদুল কালামের হাত থেকে ভারতের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান হিসেবে তিনি ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে রাজস্থান সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৭৫ সালে জাতীয় সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন পণ্ডিত রাম নারায়ণ। ১৯৯১-৯২ সালে মধ্যপ্রদেশের রাজ্য সরকারের কাছ থেকে তিনি ‘কালিদাস সম্মান’ লাভ করেন। ২০০৭ সালে ভারতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর জীবনকে অবলম্বন করে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় ‘ পণ্ডিত রাম নারায়ণ – সারেঙ্গী কে সঙ্গ’ নামে।
আজও তিনি বহু জায়গায় সারেঙ্গীবাদনের অনুষ্ঠান করছেন পণ্ডিত রাম নারায়ণ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান