রবার্ট বয়েল (Robert Boyle) বিজ্ঞানের জগতে একটি চির উজ্জ্বল নাম। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, রসায়নবিদ, পদার্থবিদ এবং উদ্ভাবক। বয়েলকে আধুনিক রসায়নবিদ্যার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তিনিই প্রথম রসায়নবিদ যিনি পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে রসায়নবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটান। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন, পার্থিববিজ্ঞান, মেডিসিন, হাইড্রোস্ট্যাটিক্স ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর অবদান রয়েছে। ১৬৬০ সালে তিনি লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৬২৭ সালের ২৫ জানুয়ারি আয়ার্ল্যান্ডে এক সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারে রবার্ট বয়েলের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রিচার্ড বয়েল (Richard Boyle) একজন ইংরেজ জমিদার ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ক্যাথরিন ফেন্টন বয়েল (Catherine Fenton Boyle)। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা মায়ের চতুর্দশতম সন্তান এবং সপ্তম পুত্রসন্তান।
তিনি গৃহশিক্ষকের কাছে ল্যাটিন, গ্রীক এবং ফ্রেঞ্চ শিখেছিলেন। আট বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর পর তাঁকে এবং তাঁর ভাইকে ইংল্যাণ্ডের এটন কলেজে (Eton College) ভর্তি করা হয়। তখন কলেজের বরিষ্ঠ শিক্ষা অধিকর্তা (provost) ছিলেন স্যার হেনরি ওটন । তিনি এবং তাঁর ভাই ১৯৩৯ সালে একটি গ্র্যাণ্ড ট্যুরে গিয়েছিলেন, সাথে তাঁদের গৃহশিক্ষক আইস্যাক মারকম্বেস (Issac Marcombes) ছিলেন। এই ভ্রমণকালে তাঁরা অনেক শিক্ষালাভ করেছিলেন।
এক নজরে রবার্ট বয়েল -এর জীবনী:
- জন্ম: ২৫ জানুয়ারি, ১৬২৭
- মৃত্যু: ৩১ ডিসেম্বর, ১৬৯১
- কেন বিখ্যাত: রবার্ট বয়েল একাধারে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, রসায়নবিদ, পদার্থবিদ এবং উদ্ভাবক। গ্যাসের আয়তন ও চাপের সম্পর্ক নিয়ে বয়েলের সূত্র বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি অসংখ্য বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ক লেখা প্রকাশ করেছেন। তাঁকে রসায়ন বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
- স্বীকৃতি: রয়্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ফেলো অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তাঁর নামে ‘রবার্ট বয়েল প্রাইজ় ফর অ্যানালিটিক্যাল সায়েন্স’ পুরস্কার দেওয়া হয়।
রবার্ট বয়েল ১৬৪৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যাণ্ডে ফিরে আসেন বিজ্ঞানের উপর গবেষণা করার প্রবল আগ্রহ নিয়ে। এই সময় থেকে পরের কিছু বছর বিভিন্ন ধরনের লেখালিখি যেমন নীতিকথা, ভক্তিমূলক ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৬৪৯ সালে রবার্ট বয়েল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতিকে অনুসন্ধান করা শুরু করেন। ১৬৪৭ সাল থেকে ১৬৫০ সাল পর্যন্ত সময়কালে বিজ্ঞানী বয়েল একদল দার্শনিক এবং সমাজ সংস্কারকদের সংস্পর্শে ছিলেন, যাঁরা বুদ্ধিজীবি স্যামুয়েল হার্টলিবের (Samuel Hartlib) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৬৫২ সাল থেকে ১৬৫৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে, বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছিলেন তাঁর মাতৃভূমি আয়ারল্যান্ডে, যেখানে তিনি কিছু শারীরবৃত্তিয় ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন। ১৬৫৪ সালে তাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং তিনি সেখানে ১৬৫৬ সাল থেকে ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন। সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক এবং পদার্থবিদ, জন উইলকিন্স (John Wilkins), ক্রিস্টোফার রেন (Christopher Wren), জন লক (John Locke) প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন। তাঁরা সবাই মিলে ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিলোজ়ফি ক্লাব’ (Experimental Philosophy Club) গঠন করেছিলেন।
১৬৫৯ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল এবং রবার্ট হুক দু’জনে মিলে তাঁদের বিখ্যাত এয়ার পাম্প তৈরি সম্পূর্ণ করেছিলেন, যেটি বায়ুবিজ্ঞানে (pneumatics) সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বায়ুচাপ এবং বায়ুশূন্যতা (vaccum) সংক্রান্ত তিনি যে গবেষণা রবার্ট হুকের সঙ্গে একত্রে করেছিলেন, তা ১৬৬০ সালে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র, ‘নিউ এক্সপেরিমেন্ট ফিজ়িও-মেক্যানিকাল, টাচিং দ্য স্প্রিং অফ দ্য এয়ার অ্যান্ড ইট্স্ এফেক্টস্’-এ (New Experiments Physico-Mechanical, Touching the Spring of the Air and Its Effects) প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল এবং রবার্ট হুক মিলে বায়ুর বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে দীর্ঘ গবেষণা করেছিলেন, তারমধ্যে অন্যতম যে সূত্রটি বয়েলের সূত্র (Boyle’s Law) নামে পরিচিত। এই সূত্র অনুসারে, “স্থির তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট ভরের আদর্শ গ্যাসের আয়তন ওই গ্যাসের উপর প্রযুক্ত চাপের সঙ্গে ব্যাস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়”।
এছাড়াও রবার্ট বয়েল শূন্যস্থান তৈরি করে বেশ কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন – যেমন শব্দ বায়ুশূন্য স্থানে চলাচল করতে পারে না এবং শব্দ চলাচলের জন্য কোন মাধ্যম প্রয়োজন। এছাড়াও আগুন জ্বালানো, প্রশ্বাস নেওয়া ইত্যাদির জন্য বায়ুর প্রয়োজন হয় একথাও তিনি প্রমাণ করেন, মনে রাখতে হবে তখনও অক্সিজেন আবিষ্কৃত হয়নি।
তিনি মেক্যানিকাল ফিলোজফির কথা বলেছিলেন, যে মত অনুযায়ী এই পৃথিবী হল বিশাল মেশিন অথবা ঘড়ির মত যেখানে বিস্ময়কর ঘটনাগুলি ঘটে চলে মেক্যানিকালভাবে অথবা ঘড়ির কাঁটার অনুকূলে।
বিজ্ঞানী বয়েল তাঁর জীবনের একটি দীর্ঘ সময়কাল ধরে অ্যালকেমিস্টদের মতো সাধারণ ধাতুকে কীভাবে সোনায় রূপান্তরিত করা যায় সেই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি এই অপরসায়নের পিছনে সময় নষ্টের কথা বুঝতে পারেন। বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের সবচেয়ে আলোচিত ও বিখ্যাত লেখা ১৬৬১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য স্কেপটিক্যাল কাইমিস্ট’ -এ (The Sceptical Chymist) এই অপরসায়ন নিয়ে বলা হয়েছে। ১৬৬৬ সালে তাঁর লেখা ‘ফর্মস অ্যান্ড কোয়ালিটিস্’ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি সবসময়ই যুক্তিগ্রাহ্য এবং দৃঢ়ভাবে প্রতিটি বিষয় পর্যালোচনা করতেন, তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা ও উদ্ভাবনীশক্তি এবং রসায়নবিদ্যার প্রতি অবিস্মরনীয় আবদানের কারণে তাঁকে রসায়নবিদ্যার জনক আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের কাছে বিশ্ব প্রকৃতিকে জানা ছিল ঈশ্বর আরাধনার সমান। ১৬৯০ সালে প্রকাশিত দ্য ক্রিশ্চিয়ান ভার্চুয়োসোতে (The Christian Virtuoso) তাঁর এই সমস্ত চিন্তাভাবনার কথা বিশদভাবে উল্লেখ করা ছিল।
১৬৬৮ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল অক্সফোর্ড ছেড়ে লন্ডনে নিজের বোন ক্যাথরিন জোনসের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তিনি নিজের ল্যাবরেটরি গড়ে তুলেছিলেন, বেশ কিছু কর্মীকে তাঁর গবেষণার কাজে সাহায্য করার জন্য নিয়োগ করেছিলেন এবং তখন থেকে প্রায় প্রতি বছর একটি করে বই প্রকাশ করতেন। লন্ডনে থাকার ফলে রয়্যাল সোসাইটির সাথে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে পেরেছিলেন। ১৬৮০ সালে তাঁকে রয়্যাল সোসাইটির সভাপতির পদের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেন।
বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের লেখা উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল ১৬৬৭ সালে প্রকাশিত সাম নিউ এক্সপেরিমেন্টস অ্যাবাউট লাইট অ্যান্ড এয়ার (Some new experiments about light and aire)।
এছাড়াও, ১৬৮৬ সালের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত ‘অ্যাকাউন্ট অফ গ্রেট হেইল ফলেন ইন ফ্রান্স’-এ (Account of great haile fallen in France) ২৬ এবং ২৭ তারিখে ঘটে যাওয়া এক ঘন্টার এক ভয়ঙ্কর শিলাবৃষ্টির কথা বলা আছে। শিলাগুলির আয়তন এবং পরিমাণ, উভয়ই ব্যতিক্রমী ছিল। এর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী ছিল, বাগানের সমস্ত গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং সকালবেলা তিনি যখন গিয়ে দেখেন তখন দেখতে পান যে ৬০০০ এরও বেশি পাখি মারা গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে।
বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের প্রচুর বিজ্ঞাল বিষয়ক লেখা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সেইগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য লেখাগুলি হল, ‘কনসিডারেশন্স্ টাচিং দ্য ইউজ়ফুলনেস্ অফ এক্সপেরিমেন্টাল ন্যাচরাল ফিলোজ়ফি’ (Considerations touching the Usefulness of Experimental Natural Philosophy), ‘হাইড্রোস্ট্যাটিক্যাল প্যারাডক্সেস’ (Hydrostatical Paradoxes), ‘মেমোয়ার্স ফর দ্য ন্যাচরাল হিস্ট্রি অফ দ্য হিউম্যান ব্লাড’ (Memoirs for the Natural History of the Human Blood ), ‘এ ফ্রি এনকোয়ারি ইনটু দ্য ভালগারলি রিসিভড্ নোশন্স্ অফ নেচার’ (A Free Enquiry into the Vulgarly Received Notion of Nature) ইত্যাদি।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্র ছাড়াও, দর্শন ও আধ্যাত্মিক জগতেও রবার্ট বয়েলের বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাঁর গবেষণা ও লেখা ভগবান ও খ্রীষ্ট ধর্মের স্বপক্ষে। আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় লেখাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সাম্ কনসিডারেশন্স্ টাচিং দ্য স্টাইল অফ দ্য হোলি স্ক্রিপচার্স্’ (Some Considerations Touching the Style of the H[oly] Scriptures), ‘এক্সেলেন্স অফ থিয়োলজি কম্পেয়ার্ড উইথ ন্যাচরাল ফিলোজ়ফি’ (Excellence of Theology compared with Natural Philosophy) ইত্যাদি। এমনকি তিনি উইল করে গিয়েছিলেন তাঁর লেখাগুলি নিয়ে লেকচারের আয়োজন করতে যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। সেই লেকচারগুলি বর্তমানে বয়েলের লেকচার (Boyle’s Lecture) নামে পরিচিত।
রসায়নবিদ্যার জনক বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল তাঁর সমগ্র জীবনে প্রচুর সম্মান এবং স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৬৬৩ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ফেলো অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। রসায়নবিদ্যার প্রতি তাঁর অবদানের কারণে রয়্যাল সোসাইটি একটি সম্মাননা প্রচলন করেছিলেন, যার নাম ‘রবার্ট বয়েল প্রাইজ় ফর অ্যানালিটিক্যাল সায়েন্স’। তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৯৯ সালে রয়্যাল ডাবলিন সোসাইটি এবং দ্য আইরিশ টাইম্সের যৌথ উদ্যোগে ‘দ্য বয়েল মেডেল ফর সায়েন্টিফিক এক্সেলেন্স ইন আয়ারল্যান্ড’ পুরস্কারের প্রচলন হয়েছিল।
তাঁর প্রিয় দিদির মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর ১৬৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর লন্ডনে রবার্ট বয়েলের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান