সমগ্র পশ্চিমবাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। সেইসব পুরাতন স্থাপত্যকীর্তির মধ্যে লক্ষ করলে দেখা যাবে মন্দির, মসজিদ এবং গির্জার সংখ্যা নেহাত কম নয়। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্গত কৃষ্ণনগরের রোমান ক্যাথলিক চার্চ (Roman Catholic Church, Krishnanagar) সেই তালিকার মধ্যে পড়বে নিঃসন্দেহেই। এই চার্চটি রোমান ক্যাথলিক ডায়োসিস নামে পরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এই গির্জা নির্মিত হলেও তার নেপথ্যে রয়েছে অনেকদিনের ইতিহাস। তাছাড়াও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথাও বর্তমান চার্চটির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে। একেবারে নির্ভেজাল ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন কৃষ্ণনগরের রোমান ক্যাথলিক চার্চটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। খ্রিস্টানদের বিশেষ বিশেষ উৎসব ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে পর্যটকেরা এই চার্চ পরিদর্শনে আসেন। কৃষ্ণনগরের দ্রষ্টব্য স্থানের তালিকায় এই ঐতিহাসিক চার্চটি উপরের দিকেই স্থান পায়।
কৃষ্ণনগরের রোমান ক্যাথলিক চার্চ নির্মাণের ইতিহাসের সঙ্গে উনিশ শতকের একটি দীর্ঘ সময়কাল জড়িয়ে রয়েছে। ১৮৪৫ সালের মে মাসে একজন পর্তুগীজ কারমেলাইট টমাস জুবিবুরু চট্টগ্রাম থেকে কৃষ্ণনগরে আসেন এবং এখানে প্রথম ক্যাথলিক সম্প্রদায় গঠন করেছিলেন। ১৮৪৬ সালে তিনি সেখানে একটি চ্যাপেল তৈরি করেন, যা ‘আওয়ার লেডি অব কারমেল’-কে উৎসর্গ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অসুস্থতার কারণে টমাস সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং সেই ক্যাথলিক মিশন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পৌরসভা সেই চ্যাপেলটি দখল করে নেয় এবং তাকে একটি ডিসপেনসারিতে পরিণত করে। দশ বছর পরে ১৮৫৫ সালে দ্য মিলান ফাদারস সেন্ট্রাল বেঙ্গল মিশনে কাজ করতে আসেন। তখন ফাদার লুইগি লিমানা পৌরসভার কাছ থেকে চ্যাপেলটি দাবি করেন এবং এটি মধ্য বাংলার মিসিও সুই আইউরিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার ক্যাথলিক সম্প্রদায় দলবদ্ধ হতে শুরু করে। ১৮৭০ সালের ১৯ জুলাই হলি সী (Holy See) কৃষ্ণনগরকে একটি প্রিফেকচার অ্যাপোস্টোলিক হিসেবে গড়ে তোলে এবং ফ্রে মারেত্তি তার প্রথম প্রিফেক্ট অ্যাপোস্টোলিক নিযুক্ত হন। এরপর ১৮৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণনগরের ডায়োসিস তৈরি করা হয় এবং এম. পোজি তার প্রথম বিশপ নিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই বিশপই পুরাতন গির্জার স্থানে প্রথম ক্যাথেড্রাল তৈরি করেছিলেন (যেখানে আজ রয়েছে সদর হাসপাতাল)। ১৮৮৭ সালে গির্জাটির সরকারী নাম হয় কৃষ্ণনগর রোমান ক্যাথলিক ডায়োসিস (Roman Catholic Diocese)। ১৮৯৭ সালে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে সেই ক্যাথেড্রালটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিশপ পোজি তখন একটি নতুন ক্যাথেড্রাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেটির ডিজাইন করেছিলেন আরমানাস্কো। খুব দ্রুত কাজ এগোতে থাকে। ১৮৯৯ সালে বর্তমান স্থানে ক্যাথেড্রালটির পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সেবছর ১৯ মার্চ নবনির্মিত গির্জাটি খোলা হয়েছিল। ১৯২৮ সালের ২০ জুন দিনাজপুরের ডায়োসিস দ্বিখন্ডিত হলে মিলান ফাদারস দিনাজপুরের জন্য কাজ করবার সিদ্ধান্ত নেন এবং কৃষ্ণনগরের দায়িত্ব ডন বস্কোর সেলসিয়ানদের কাছে হস্তান্তর করেন।
কৃষ্ণনগরের এই রোমান ক্যাথলিক গির্জার স্থাপত্যশৈলীটি ভীষণই আকর্ষণীয়। গির্জাটি কেবল গথিক, নিও-ক্লাসিক্যাল কিংবা ভিক্টোরিয়ান—কোন একটি নির্দিষ্ট স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি নয় বরং এখানে বিভিন্ন রকমের শৈলীর সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। তবে এককথায় বলা যায় গির্জাটির আকৃতি একেবারেই ইউরোপীয় ঘরানার এবং যেসময়ে এটি নির্মিত হয়েছিল, সেসময়ের সমস্ত গির্জার থেকে এটি গঠনগত দিক থেকে ছিল স্বতন্ত্র। দূর থেকে দেখলে দেখা যাবে গির্জার সঙ্গেই সংলগ্ন হয়ে আছে সুউচ্চ একটি ক্লক টাওয়ার। এছাড়াও সামনের পেডিমেন্টটির মাথায় বড় আকারের এক ক্রশ হাতে যিশুর একটি মূর্তি যেমন রয়েছে, ঠিক তার পিছনে দেখা যায় একটি গম্বুজ এবং তার শীর্ষে রয়েছে একটি ক্রশ। চার্চের শীর্ষদেশে স্থাপিত যিশুর মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী বীরেন পাল। ওয়াচ টাওয়ারের শীর্ষদেশেও একটি গম্বুজ এবং তার ওপরে বসানো ক্রশ চোখে পড়ে। সামনের পেডিমেন্টটি যে চারটি পিলার বা স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেগুলি আয়নিক, ডোরিক বা কোরিন্থিয়ান স্টাইলের নয়, বরং এই স্তম্ভগুলিতে টাস্কান নকশার ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। পেডিমেন্টের নীচে একটি বড় ধনুকাকৃতি খিলানের তলায় দুটি ছোট ছোট আর্চের আউটলেট যেগুলিতে তিনটি কোরিন্থিয়ান স্তম্ভ দেখা যায়। পেডিমেন্টের নীচের দুপাশে হাঁসের ঘাড়ের মতো বক্রাকৃতি ধরনের কাঠামো দেখা যায়, যা গির্জাটিকে দেখতে রাজকীয় করে তুলেছে। পেডিমেন্টের নীচে পুষ্পশোভিত নকশার ঠিক পরে বাংলায় একটি লাইন খোদাই করা রয়েছে, যেখানে লেখা আছে ‘ঈশ্বরের গৃহ – স্বর্গের দ্বার’। গির্জার অভ্যন্তরে অনেক তৈলচিত্র এবং কিছু পুরাতন আসবাবপত্র চোখে পড়ে। সেইসব তৈলচিত্রে যিশুর জীবনের নানা কাহিনিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেহেতু এটি ক্যাথলিক চার্চ সেকারণেই এখানে যিশু এবং মেরীসহ অন্য অনেকের মূর্তি লক্ষ করা যাবে।
২০০৯ সালে পুরনো গির্জার ঠিক বিপরীতে ‘ক্রিস্টো মন্দির’ নামে আরেকটি বিশাল কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এটি মূলত একটি বিশাল প্রার্থনা হল এবং প্রদর্শনী কক্ষ। এখানে ধর্মীয় এবং সামাজিক তাৎপর্যপূর্ণ বহু অত্যাশ্চর্য ভাস্কর্য রয়েছে। এর বাইরের দেয়ালে সেন্ট অগাস্টিন, সেন্ট পলস, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার, সেন্ট জেমস প্রভৃতি সাধুদের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। হলের মেঝেটি সম্পূর্ণ মার্বেলের এবং দেওয়ালগুলি যেসব ভাস্কর্য এবং কাচের চিত্রগুলি দ্বারা অলঙ্কৃত, সেগুলিতে যিশুর জীবনকাহিনি, বাইবেলের নানারকম গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
পুরনো গির্জাটি জনসাধারণের জন্য সবসময় খোলা থাকে না, বরং বিক্ষিপ্তভাবে বিশেষ কিছু দিনে খোলা হয় এবং নতুন ভবনটি পর্যটকদের জন্য মোটামুটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিনই খোলা থাকে।
বছরের বিশেষ বিশেষ উৎসবের সময় এখানে বহু মানুষের ভিড় হয়। বিশেষত ২৫ ডিসেম্বর অর্থাৎ বড়দিন, যেটি যিশু খ্রীস্টের জন্মদিন হিসেবে পরিচিত এবং নতুন বছর উপলক্ষে কৃষ্ণনগরের এই রোমান ক্যাথলিক চার্চ দারুণভাবে সেজে ওঠে। এই দুটি উৎসব খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এখানে। বিচিত্র বর্ণের আলোকমালায় সজ্জিত হয়ে ওঠে গির্জা এবং তৎসংলগ্ন প্রাঙ্গন। অসংখ্য ভক্ত এবং পর্যটকেরা এইসময় এসে ভিড় জমান এখানে, প্রভু যিশুর কাছে প্রার্থনা জানান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান