সববাংলায়

চন্দননগর চার্চ | সেক্রেড হার্ট চার্চ

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বিশেষত কলকাতা এবং তার আশপাশের অঞ্চলে এমন বহু প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে যা বাংলার ইতিহাসের একেকটি অংশের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। মূলত প্রাচীন মন্দির, মসজিদ এবং গির্জার সংখ্যাই বেশি। প্রাচীনতার কথা বললে একসময়ের ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের কথা আপনা থেকেই এসে পড়ে। এই চন্দননগরেরই বিখ্যাত সেক্রেড হার্ট চার্চ (Sacred Heart Churh) যা চন্দননগর চার্চ নামে পরিচিত সেই উনবিংশ শতাব্দী থেকে আজও বহুদিনের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গির্জাটি কলকাতার আর্চডায়োসিসের অধীনস্থ। চন্দননগরের স্ট্র্যান্ডের নিকটে বড়বাজারের কাছে এই চার্চটির অবস্থান। সাদা মার্বেল দ্বারা নির্মিত এই ক্যাথলিক চার্চটি আজ পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দ্রষ্টব্য এক স্থান। একেবারে খাঁটি ফরাসী স্থাপত্যের নিদর্শন দেখতে হলে অবশ্যই চন্দননগরের এই সেক্রেড হার্ট চার্চে ঘুরে আসতে হবে।

চন্দননগর চার্চ ১৪০ বছরের বেশি পুরনো। ১৬৭৩ সাল নাগাদ চন্দননগরে ফরাসিরা বসতি স্থাপন করে এবং ক্রমে ক্রমে এটিকে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। এরপর ১৭৫৭ সালে এবং ১৭৯৪ সালে চন্দননগরের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে চলে গেলেও পুনরায় ১৮১৫ সালে ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। চন্দননগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ফরাসিরা এখানে তাদের স্থাপত্যেরও নানা চিহ্ন ছড়িয়ে যেতে থাকে। ১৭৪২ সালে জোসেফ ফ্রাঙ্কোইস ডুপ্লে ভারতের গভর্নর জেনারেলের ভূমিকা গ্রহণ করার সময় চন্দননগর নানারকম স্থাপত্যে আরও সজ্জিত হয়ে ওঠে। গির্জা এবং বেসিলিকাও গড়ে উঠতে থাকে ধর্মীয় উপাসনার চাহিদা পূরণের জন্য।

চন্দননগরে যখন ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য তখন ১৮৭৫ সালে এই সেক্রেড হার্ট চার্চটির নির্মাণকার্য শুরু হয়েছিল। রেভারেন্ড পি বার্থেটের নির্দেশনায়, তাঁর ভাই জোয়াকিমের সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টায় ১৮৮৪ সালে এই গির্জার নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল। ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি কলকাতার আর্চবিশপ পল গোয়েথালসের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সেক্রেড হার্ট চার্চের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও আসলে অগাস্টিয়ান সন্ন্যাসীদের হাতে ১৬৮৮ সালে এই গির্জাটির সূত্রপাত হয়েছিল, পরবর্তীকালে নকশা অনুযায়ী বর্তমান গির্জাভবনটি নির্মিত হয়েছিল।

চন্দননগর চার্চটির স্থাপত্যশৈলীটিও বেশ আকর্ষণীয়। এটি ফরাসি স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। একজন দক্ষ ফরাসি স্থপতি জ্যাক ডুচাটজ এই গির্জাটির নকশা তৈরি করে দিয়েছিলেন। সাদা রঙের (উৎসবের জন্য সম্ভবত হলুদ রঙ করা হয়েছিল) এই ক্যাথলিক গির্জার সামনের প্রাঙ্গনে একটি দন্ডায়মান যিশুর মূর্তি চোখে পড়ে। মূর্তিটি প্রাঙ্গনের একেবারে মাঝখানে গির্জার ঠিক সামনে সুন্দর সবুজ ঘাস এবং রেলিং দ্বারা আবৃত একটি বৃত্তাকার স্থানে অবস্থিত। বাইরে থেকে গির্জার কাঠামোটির দিকে তাকালে দুপাশে দুটি উঁচু টাওয়ার এবং মাঝখানে গম্বুজাকৃতি গির্জার চূড়া দেখা যায়। সেই চূড়ায় একটি ক্রশ স্থাপন করা রয়েছে। টাওয়ারদুটি এবং মাঝের অংশটি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। গির্জাটি পূর্বমুখী এবং দোতলা। একটি মার্বেল ফলক সাক্ষ্য দেয় যে ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাদার গোয়েথালস গির্জাটির উদ্বোধন করেছিলেন। উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে গির্জাটির প্লাস্টারে কয়েক জায়গায় ফাটল দেখা যায়।

গির্জার অভ্যন্তরে প্রার্থনা হলের ওপরের দিকে বেলজিয়াম কাচের অলংকরণ দৃশ্যমান। সেই রঙিন কাচের জানালার ফ্রেমের মধ্যেই যিশুর ছবি অঙ্কিত রয়েছে দেখা যায়। এছাড়াও গির্জার দেওয়ালে যিশুর জীবনের নানা ঘটনার চিত্রও চোখে পড়ে। প্রার্থনা হলের মাঝে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ভক্তদের বসবার জন্য দুভাগে বিভক্ত সারি সারি বেঞ্চ পাতা এবং হলের দুপাশে লম্বা করিডোরের মতো জায়গা রয়েছে। একেবারে সম্মুখে রয়েছে শ্বেতপাথরের প্রার্থনা-বেদী। সূর্যাস্তের সময় এই গির্জাটিকে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগে। ১৬৯৬ সালে নির্মিত গির্জা সংলগ্ন সেক্রেড হার্ট ফ্রেঞ্চ কবরস্থানটিও একটি অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থান।

চন্দননগর চার্চে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ কিছু উৎসব ও অনুষ্ঠান জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বলতে ক্রিসমাস বা বড়দিন এবং নতুন বছরের উদযাপনের কথা।

ক্রিসমাসের সময় বহু বিচিত্র আলোকসজ্জায় গোটা চন্দননগর চার্চ সজ্জিত হয়ে ওঠে। অসংখ্য ভক্ত এইসময় প্রভু যিশুর কাছে প্রার্থনার জন্য ভিড় জমান গির্জা চত্বরে। রীতিমতো একটি মেলা বসে যায় গির্জা এবং তার আশপাশে। গির্জার ক্যারল সঙ্গীতে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। এছাড়াও নববর্ষের সময়তেও অসংখ্য মানুষ এখানে ভিড় জমান আনন্দ উদযাপনের জন্য। স্থানীয় মানুষজন তো থাকেননই, সেইসঙ্গে অনেক বিদেশি পর্যটকেরও সমাগম হয় এখানে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading