ইতিহাস

সালিম আলী

ভারতের একজন অন্যতম বিখ্যাত পক্ষীবিদ হলেন সালিম আলী (Salim Ali)। তিনি প্রথম ভারতীয় প্রকৃতিপ্রেমী ও পক্ষীবিশারদ যিনি ভারতীয় পাখি সম্পর্কে নিয়মনিষ্ঠ পদ্ধতিতে সমীক্ষা করেছিলেন। তাঁর লেখা পাখি বিষয়ক বইগুলি আজও পক্ষীবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পাখিবিষয়ে তাঁর অনবদ্য দক্ষতা এবং জ্ঞানের জন্য সালিম আলীকে ‘বার্ডম্যান অফ ইণ্ডিয়া’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। পাখি আর প্রকৃতিপ্রেমের বাইরে তাঁর খুব শখের বিষয় ছিল মোটরসাইকেল।

১৮৯৬ সালের ১২ নভেম্বর বম্বের সুলাইমান বোহরা গোত্রীয় এক মুসলমান পরিবারে সালিম আলীর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম সালিম মঈজুদ্দিন আবদুল আলী। তাঁর বাবার নাম মঈজুদ্দিন আলী এবং মায়ের নাম জিনাত্‌-উন্‌-ন্নিসা। সালিম আলী ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের সর্বকনিষ্ঠ তথা নবম সন্তান। মাত্র এক বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান এবং তিন বছর বয়সে মাকেও হারান সালিম আলী। বোম্বের খেতওয়ারিতে পাঁচ ভাই ও চার বোনের সঙ্গে একত্রে তিনি তাঁর মামা আমিরুদ্দিন তায়েবজি এবং মামী হামিদা বেগম-এর কাছে বড়ো হন। তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান। সালিম আলীর আরেক মামা আব্বাস তায়েবজি ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। কৈশোরে তিনি শিকার সংক্রান্ত বইপত্র পড়তে বেশ ভালোবাসতেন এবং শিকারে তাঁর প্রভূত আগ্রহ জন্মায়, বিশেষত ‘স্পোর্ট্‌স-শ্যুটিং’-এ (Sports-Shooting)। তাঁদের এলাকায় আশেপাশে বহু জায়গায় শ্যুটিং-প্রতিযোগিতা হত। তাঁর শিকারের অন্যতম সহচর ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা যিনি সালিম আলীর এক দূর সম্পর্কের খুড়তুতো ভাই ছিলেন। পরবর্তীতে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।     

সালিম আলীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল গুরগাঁওয়ের ‘জেনানা বাইবেল অ্যাণ্ড মেডিকেল মিশন গার্লস হাই স্কুল’ (Zenana Bible & Medical Mission Girls’ High School) থেকে। এই স্কুলে তিনি তাঁর দুই বোনের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করেছিলেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে ক্রনিক মাথাব্যথার কারণে তাঁকে মাঝে মাঝেই পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি নিতে হয়েছিল। সেইজন্য তাঁর এক কাকা তাঁকে পাকিস্তানের সিন্ধুতে নিজের কাছে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন যাতে সেখানকার শুষ্ক আবহাওয়ায় সালিম সুস্থ হন। এভাবে বারবার বিরতি দিয়ে অনিয়মিত শিক্ষাজীবনে কোনোক্রমে তিনি বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরমধ্যে কলেজের পড়াশোনা বন্ধ রেখে তিনি চলে যান বার্মার তেভয়ে (Tevoy) অধুনা যা মায়ানমারের তেনাসেরিম নামে পরিচিত। সেখানে পারিবারিক টাঙস্টেনের খনি ও টিম্বারের ব্যবসা দেখাশনা করতেন সালিম। সেখানকার অরণ্য-অধ্যুষিত পরিবেশ তাঁর ভিতরকার শিকারীসত্তাকে জাগিয়ে তোলে, প্রকৃতিপ্রেম আরো ঘনীভূত হয়। বার্মার বনদপ্তরের সঙ্গে যুক্ত জে. সি. হোপউড (J. C. Hopewood) এবং বার্থোর্ল্ড রিবেনট্রপ (Berthrold Ribentrop)-এর সঙ্গে সালিমের পরিচয় হয়। ১৯১৭ সালে ভারতে ফিরে এলে, তিনি আবার প্রথাগত পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। দেভ্‌র কলেজে (Devar College) তিনি বাণিজ্যিক আইন (Commercial Law) এবং হিসাববিদ্যা (Accountancy) বিভাগে ভর্তি হন। শিকারের প্রতি তাঁর আগ্রহের দিকটি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ফাদার এথেলবার্ট ব্লাটার (Ethelbert Blatter) বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি তাই সালিমকে জীববিদ্যা (Zoology) পড়ার জন্য উৎসাহ দেন। সেইমত সকালে দেভ্‌র কলেজে ক্লাস করে বিকালে তিনি সেন্ট জেভিয়ার্সে জীববিদ্যা পড়তে যেতেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যে এভাবে সালিম আলী জীববিদ্যার কোর্স সম্পূর্ণ করেন।       

 ১৯২৬ সালে বম্বের প্রিন্স অফ ওয়েলস সংগ্রহশালায় প্রাকৃতিক ইতিহাস (Natural History) বিভাগে গাইড-লেকচারার হিসেবে মাসিক ৩৫০ টাকা বেতনে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কিংবা সার্টিফিকেট না থাকায় ‘জুলজিকাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া’য় (Zoological Survey of India) পক্ষীবিদের পদটি পাননি। তাঁর বদলে সেখানে এম.এল.রুনওয়াল (M.L.Roonwal) কাজ পান। এর দুই বছর পরে, ১৯২৮ সালে জার্মানির ‘বার্লিনস ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’-এ অধ্যাপক এরউইন স্ট্রেসম্যান (Erwin Stresseman)-এর অধীনে তিনি কাজ শিখতে চলে যান শিক্ষা-অবকাশ নিয়ে। স্ট্রেসম্যানকে সালিম তাঁর গুরু মানতেন। এই কাজের মধ্যে তাঁকে বার্মা থেকে জে.কে. স্ট্যানফোর্ড-এর পাঠানো নমুনাগুলি পরীক্ষা করে দেখতে হত। স্ট্যানফোর্ড তাঁকে বম্বের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেন এবং সেখানকার ক্লড টাইসহার্স্ট-এর (Claud Ticehurst) সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু একজন ভারতীয় হিসেবে বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সালিমকে জায়গা দিতে তিনি চাননি। জার্মানিতে ইতি মধ্যে জার্মানির শ্রেষ্ঠ পক্ষীবিজ্ঞানী বের্নহার্ড রান্‌শ (Bernhard Rench), রুডলফ ড্রস্ট (Rudolf Drost), আর্নস্ট মেয়র (Ernest Mayr) প্রমুখদের সান্নিধ্যে আসেন সালিম । এই বার্লিনেই তাঁর সঙ্গে বিপ্লবী চম্পাকর্মণ পিল্লাইয়ের দেখা হয়। ‘হেলিগোল্যাণ্ড বার্ড অবজারভেটরি’তে (Heligoland Bird Observatory) সালিম আলি পাখির ডাক বিষয়ে নানাবিধ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। জার্মানিতে থেকে তাঁর পক্ষীবিজ্ঞানে আগ্রহ আরো বেড়ে গিয়েছিল এবং অভিজ্ঞতার ঝুলিও খানিক সমৃদ্ধ হয়েছিল।

 ১৯৩০ সালে দেশে ফিরে তিনি তাঁর আগের গাইড-লেকচারারের চাকরিটি পাননি কারণ ততদিনে তহবিলের অভাবে পদটি লুপ্ত হয়ে গেছে। সেহেতু তিনি এবং তাহ্‌মিনা মুম্বাইয়ের কাছে কিহিম নামক একটি সমুদ্র-উপকূলবর্তী গ্রামে দেশি বাবুই (Baya Weaver) পাখির জন্ম ও প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ দেখার সুযোগ পান। এই পাখিদের ক্রমান্বয়ী বহুগামী প্রজনন রীতি (Sequential polygamy) আবিষ্কার করেন সালিম। হায়দ্রাবাদ, ত্রিবাঙ্কুর, কোচিন, ইন্দোর, ভূপালের মতো বেশ কয়েকটি করদ রাজ্যে সেসময় তিনি পক্ষী-জরিপ চালিয়েছিলেন। এইসব এলাকার পাখিদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁর পৃথক পৃথক বই আছে। এই পক্ষী জরিপের সমস্ত খরচ বহন করেছিল সেইসব রাজ্যগুলি। কুমায়ুনের তরাইয়ে তিনিই প্রথম ‘ফিনের বাবুই’ (Finn’s Baya) আবিষ্কার করেন। ভারতের প্রাচীন মুঘল আমলে পক্ষীবিদ্যা চর্চার বিষয়ে তাঁর বেশ আগ্রহ ছিল। ১৯৭১ সালে ‘সুন্দরলাল হোরা মেমোরিয়াল লেকচার’ এবং ১৯৭৮ সালে ‘আজাদ মেমোরিয়াল লেকচার’-এ তিনি ভারতে পক্ষীজরিপের ইতিহাস এবং গুরুত্ব বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কাছে চিঠি লিখে বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’র সংরক্ষণের জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন সালিম আলী। পক্ষীবিদ্যা ছাড়াও অদ্ভুতভাবে সালিম আলীর ছিল মোটরবাইকের শখ। ‘হার্লে ডেভিডসন’, ‘ডগলাস’, ‘স্কট’, ‘নিউ হাডসন’ এবং ‘মেক’ ইত্যাদি বিখ্যাত কোম্পানির মোটরবাইকগুলি ব্যবহার করেও মৃত্যুকালে তাঁর আফশোস ছিল বি.এম.ডব্লিউর মোটরবাইক চড়তে পারেননি বলে। ১৯৫০ সালে সুইডেনের ‘আন্তর্জাতিক পক্ষীতাত্ত্বিক কংগ্রেস’-এ তিনি একমাত্র ভারতীয় হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বাইক ‘সানবিম’।

সালিম আলীর সবথেকে বড় কৃতিত্ব হল দশ খণ্ডের ‘হ্যান্ডবুক অফ দ্য বার্ডস অফ ইণ্ডিয়া অ্যাণ্ড পাকিস্তান’ বইটি রচনা করা। এই বৃহৎ কাজে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন এস. ডিলন. রিপলি (S. Dilon. Ripley)। ‘বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’র জার্নালে সালিম আলী বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত রচনা হল ‘দ্য বুক অফ ইণ্ডিয়ান বার্ডস’ যা ১৯৪১ সালে প্রকাশ পাওয়া মাত্র প্রায় ৪৬ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল৷ এছাড়া তিনি লিখেছেন ‘স্টপিং বাই দ্য উডস ইন এ সানডে মর্নিং’। ১৯৮৫ সালে সালিম আলীর আত্মজীবনী ‘দ্য ফল্‌ অফ স্প্যারো’ প্রকাশ পায়। বর্তমানে যে ‘ভরতপুর অভয়ারণ্য’ (Bharatpur Bird Sanctuary) সালিম আলীই তাঁর প্রতিষ্ঠাতা।   

অনেক পরে কাজের স্বীকৃতি পেলেও, বহুবিধ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন সালিম আলী। ১৯৫৩ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল তাঁকে ‘জয় গোবিন্দ ল’ স্বর্ণপদক’-এ সম্মানিত করে। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ১৯৫৮, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৮ সালে তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট প্রদান করেছে৷ সালিম আলীই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ১৯৬৭তে ‘ব্রিটিশ অরনিথোলজিস্টস ইউনিয়ন’ কর্তৃক ইংরেজ না হয়েও স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। ভারত সরকার তাঁকে একাধারে ১৯৫৮ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ১৯৭৬ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’-এর চূড়ান্ত সম্মানে সম্মানিত করেছে। এছাড়াও তাঁর নামে বহু প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯০ তে কোয়েম্বাটোরে ভারত সরকার স্থাপন করে ‘সালিম আলী সেন্টার ফর অরনিথোলজি এন্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রি’। গোয়া রাজ্য সরকার সেখানে স্থাপন করে ‘সালিম আলী পাখিরালয়’। তাঁর মৃত্যুর শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারতের ডাক বিভাগ দুটি পোস্টাল স্ট্যাম্প প্রকাশ করেছিল ১৯৯৬ সালে।

১৯৮৭ সালের ২৭ জুলাই ৯০ বছর বয়সে প্রোস্টেট ক্যানসারে দীর্ঘ রোগভোগের পর এই প্রতিভাধর পক্ষীবিদ সালিম আলীর মৃত্যু হয়।   

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন