ইতিহাস

সমরেশ মজুমদার

সমরেশ মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের জগতে এক অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার (Samaresh Majumdar)। ‘দৌড়’ উপন্যাসের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছিলেন তিনি। তারপর ক্রমান্বয়ে ‘উত্তরাধিকার’ ,’কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’ এই তিন উপন্যাসের মাধ্যমে আপামর বাঙালি পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন সমরেশ মজুমদার এবং বলা যায় এই তিনটি উপন্যাসের মধ্যে দিয়েই উত্তরবঙ্গের জল-জঙ্গলের প্রতি লেখকের যে মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে তা বহু ভ্রমণপিপাসু মানুষকেও উত্তরবঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এই তিনটি উপন্যাসকে একত্রে তাঁর একটি সেরা ট্রিলজি ধরা হয়। এর মধ্যে কালবেলা উপন্যাসের জন্য ১৯৮৩ সালে সমরেশ মজুমদার আকাদেমি পুরস্কার পান। এছাড়াও তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’-এর জন্য তাঁকে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর লেখা অন্যতম বিখ্যাত একটি উপন্যাস ‘তেরো পার্বণ’ অবলম্বনে দূরদর্শনে প্রথম বাংলা ধারাবাহিক নির্মিত হয়। জলপাইগুড়ির জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা সমরেশ মজুমদারের লেখায় বারবার ফুটে ওঠে রাজনৈতিক চেতনা, প্রেম, অপ্রাপ্তি, হতাশা এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের নানা গোপন ঘাত-প্রতিঘাতের ছবি। তাঁর লেখা ‘কালবেলা’ উপন্যাসের অনিমেষ ও মাধবীলতা, ‘সাতকাহন’ উপন্যাসের দীপাবলি কিংবা শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা অ্যাডভেঞ্চারমূলক উপন্যাসের চরিত্র ‘অর্জুন’ বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে আজও অমলিন। ‘গর্ভধারিনী’, ‘কলকাতা’, ‘আবাস’, ‘ফেরারি’, ‘বন্দীনিবাস’, ‘হারামির হাতবাক্স’, ‘এই আমি রেণু’, ‘কলিকাতায় নবকুমার’, ‘মৌষলকাল’ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘অর্জুন’ চরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি লিখেছেন অজস্র উপন্যাস যার মধ্যে ‘খুনখারাপি’, ‘জয়ন্তীর জঙ্গলে’, ‘জুতোয় রক্তের দাগ’, ‘হাঙরের পেটে হিরে’, ‘কালাপাহাড়’, ‘অর্জুন এবার কলকাতায়’, ‘অর্জুন বেরিয়ে এলো’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

১৯৪৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গয়েরকাটা চা বাগানে সমরেশ মজুমদারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল কৃষ্ণদাস মজুমদার এবং মায়ের নাম ছিল শ্যামলী দেবী আর ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ ঠাকুরদাদা পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। বাল্যকালে তাঁর ডাকনাম ছিল বাবলু। তাঁর জন্মের পরেই তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেজোপিসিমার স্তন্যে বড়ো হয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর কাছে সেজোপিসিমাই হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত জননী। বাবা-মায়ের বদলে ঠাকুরদাদার কাছেই মানুষ হয়েছেন সমরেশ। একাধারে কঠোর অনুশাসন, সংযম, অধ্যবসায় এবং নিয়মানুবর্তিতার পাঠ তিনি শিখেছিলেন ঠাকুরদাদার কাছেই। পেশায় চা বাগানের ম্যানেজার পূর্ণচন্দ্রের প্রভাবই সবথেকে বেশি ছিল সমরেশ মজুমদারের জীবনে। তাঁর জন্মের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল সমগ্র বিশ্বে। আর এর আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েই তাঁর ঠাকুরদাদা পূর্ণচন্দ্র নদীয়ার গেদে গ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গের চা বাগানে এসে ইংরেজি জানার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ম্যানেজারের চাকরি পেয়েছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে সমরেশ মজুমদার তাঁর ঠাকুরদাদার সঙ্গে জলপাইগুড়ির হাকিমপাড়ায় এসে ওঠেন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি হাকিমপাড়ার এই বাড়িতেই ছিলেন। যুদ্ধের সময় কেরোসিন না থাকায় সমস্ত পাড়া অন্ধকার থাকার   


বাংলায় শিখুন ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং ও আরও অনেক কিছু

ইন্টার্নশিপ

আগ্রহী হলে ছবিতে ক্লিক করে ফর্ম জমা করুন 


 

গল্প শুনেছেন তিনি ঠাকুরদাদার কাছেই। তাঁদের বাড়ির কাছেই বয়ে যেত আংরাভাসা নদী। তাঁর উপন্যাসে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে এসেছে এই নদীর কথা। স্থানীয় মদেশিয়া ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলো করেই তাঁর বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেটেছে। রাজবংশি এবং বাহে সম্প্রদায়ের লোকদের সঙ্গেও তাঁর গভীর সখ্যতা তৈরি হয়েছিল।

গয়েরকাটা চা বাগানের ভবানী মাস্টারের পাঠশালায় সমরেশ মজুমদারের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তারপর জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে ভর্তি হন তিনি। দীর্ঘ বারো বছর এখানে পড়াশোনা করে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ছোটোবেলা থেকেই গল্পের বই পড়ার তীব্র নেশা ছিল সমরেশের। বাবার সংগ্রহের পত্র-পত্রিকা, মায়ের আলমারির বইপত্র লুকিয়ে পড়তে পড়তেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যচেতনা গড়ে ওঠে। জলপাইগুড়ি জেলার স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি গল্প লিখে পত্রিকা দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন তিনি যা পরে চিত্রবাণী পত্রিকায় ‘নাজলী’ নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর এই অসম্ভব সাহিত্যপ্রীতির কথা জানতে পেরে স্কুলের সতী মাস্টার বাংলা সাহিত্যের নানা দিকপাল লেখকদের লেখা পড়তে আগ্রহী করে তোলেন। তিনিই প্রথম সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বই পড়তে দিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদারকে। এই সতী মাস্টারের কাছেই তিনি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের কথা জেনেছেন ও উপলব্ধি করেছেন, মার্ক্স ও গোর্কির কথা জেনেছেন। ১৯৬০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বাংলায় সাম্মানিক নিয়ে পড়াশোনার করার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু তাঁর পরিবারের ইচ্ছে ছিল তিনি যেন অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ফলে অর্থনীতির বদলে বাংলা নিয়ে পড়ার কারণে পারিবারিক মনোমালিন্যের শিকার হন তিনি। স্কটিশ চার্চ কলেজের পড়া শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন তিনি। পারিবারিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের দরুণ কলেজে পড়ার দিনগুলিতে একজায়গায় থিতু হতে পারেননি সমরেশ। প্রথমে কিছুদিন অনিলবাবুর মেসে, তারপরে স্কটিশচার্চ কলেজের হোস্টেল টমোরিতে, হাতিবাগানের রেসিডেন্ট হোস্টেলে, এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলেও দিন কাটিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদার আর এই হোস্টেল জীবন বা মেস জীবনের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে তাঁর ‘কালবেলা’ উপন্যাসে।

সংবিত্তি পত্রিকার সম্পাদক সুশীল মুখোপাধায়ের সৌজন্যে আর্মহার্স্ট স্ট্রিটে তাঁদের পত্রিকার প্রেসে একটি অস্থায়ী প্রুফ রিডারের কাজের মাধ্যমেই সমরেশ মজুমদারের কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে এই কাজে তখন তাঁর বেতন ছিল মাত্র তিরিশ টাকা। রাত্রি ন’টা থেকে সকাল ন’টা পর্যন্ত এই প্রেসের অফিসেই সময় কাটাতেন তিনি। ১৯৬৭ সালে আয়কর দপ্তরের চাকরিতে যোগ দেন সমরেশ মজুমদার। ২২৮ টাকা বেতনের এই চাকরি করার সময় ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির পিছনের একটি মেসে ভাড়া থাকতেন তিনি। ১৯৭৫ সালে আবার এই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকায় চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানেই নিযুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর পূর্ণসময়ের জন্য সাহিত্যসাধনাকেই ব্রত করে নেন সমরেশ মজুমদার।

সাহিত্যজীবনে পদার্পণের আগে ১৯৬৫ সাল নাগাদ বন্ধুস্থানীয় সুব্রত ভট্টাচার্য ও হরেন মল্লিকের সঙ্গে একত্রে ‘শাতকর্ণী’ নামের একটি নাটকের দল তৈরি করেছিলেন সমরেশ মজুমদার। বিমল করের একটি গল্প অবলম্বনে পিয়ারিলাল বার্জ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেন সমরেশ মজুমদার। সেসময় দেশ পত্রিকার যাত্রা-নাটক বিভাগের সম্পাদক প্রবোধচন্দ্র অধিকারী সমরেশ মজুমদারকে নাটক রচনায় অনুপ্রাণিত করেন। নিজেদের দলের জন্য নতুন নতুন নাটক লিখতে গিয়েই গল্প-উপন্যাস লেখার শুরু হয় তাঁর জীবনে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


প্রথম গল্প লিখে দেশ পত্রিকার সম্পাদক বিমল করের দপ্তরে জমা দিয়ে আসেন সমরেশ। কিন্তু ছয় মাস পরে সেই গল্প অমনোনীত অবস্থায় ফেরত এলে ফোন  করে বিমল করকে কটু মন্তব্য করেছিলেন সমরেশ মজুমদার। সেই শুনে বিমল কর গল্প নিয়ে পত্রিকা দপ্তরে আসতে বলেন তাঁকে এবং জানান যে পিওনের ভুলেই সেই গল্প ফেরত গেছে। ফলে ১৯৬৭ সালে ‘অন্তরাত্মা’ নামের তাঁর লেখা সেই প্রথম গল্প ছাপা হয় দেশ পত্রিকায়। গল্প লেখার পারিশ্রমিক হিসেবে পঁচিশ টাকা পেয়েছিলেন প্রথম, পরে আরো গল্প লিখতে থাকেন তিনি। দেশ পত্রিকায় আট বছরে মোট ২৪টি গল্প লিখেছিলেন তিনি এবং পরের দিকের প্রতিটি গল্পের জন্য তখন ৫০ টাকা করে পারিশ্রমিক পেতেন তিনি। এই দেশ পত্রিকাতেই ‘দৌড়’ নামে প্রথম উপন্যাস লেখেন তিনি ১৯৭৬ সালে। দেশ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক সাগরময় ঘোষের অনুরোধে এরপর থেকে ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা শুরু করেন তিনি এবং তাঁর প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাস বেরোয় ‘উত্তরাধিকার’ নামে ১৯৮৯ সালে। পাঠকের মধ্যে প্রবলভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই উপন্যাস এবং পাঠকের আবেদনে সাড়া দিয়ে এর আরো দুটি পর্ব লেখেন তিনি ‘কালবেলা’ ও ‘কালপুরুষ’ নামে। বাংলা সাহিত্যে অনিমেষ আর মাধবীলতাকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই ট্রিলজি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছে আজও। এর চতুর্থ পর্ব হিসেবে ‘মৌষলকাল’ লেখেন সমরেশ মজুমদার ২০১৩ সালে।

তাঁর লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘গর্ভধারিনী’, ‘কলকাতা’, ‘আবাস’, ‘সাতকাহন’, ‘ফেরারি’, ‘বন্দীনিবাস’, ‘হারামির হাতবাক্স’, ‘এই আমি রেণু’, ‘কলিকাতায় নবকুমার’ ইত্যাদি। তাঁর লেখা ছোটগল্পের মধ্যে অন্যতম কিছু গল্পগ্রন্থ হল – ‘একাদশ অশ্বারোহী’, ‘যে যেরকম থাকে’, ‘চোখের জলে শ্যাওলা পড়ে না’, ‘গোপন ভালোবাসা’ ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর লেখা নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘স্বরভঙ্গ’, ‘আদিম খেলা’, ‘উল্লুক’, ‘বিরহের অন্তরালে’ ইত্যাদি। শিশু-কিশোরদের উপযোগী অ্যাডভেঞ্চারমূলক বহু গল্প লিখেছেন সমরেশ মজুমদার যার মূল চরিত্র ‘অর্জুন’। ‘খুনখারাপি’, ‘জয়ন্তীর জঙ্গলে’, ‘জুতোয় রক্তের দাগ’, ‘হাঙরের পেটে হিরে’, ‘কালাপাহাড়’, ‘অর্জুন এবার কলকাতায়’, ‘অর্জুন বেরিয়ে এলো’ ইত্যাদি এই ধারার গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

তাঁর লেখা ‘দৌড়’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে যেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। এই চলচ্চিত্রে কাহিনিকার হিসেবে তিনি বিএফজে দিশারি পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এছাড়া তাঁর লেখা বিখ্যাত একটি উপন্যাস ‘তেরো পার্বণ’ অবলম্বনে দূরদর্শনে প্রথম বাংলা ধারাবাহিক নির্মিত হয়।

১৯৮২ সালে দৌড় উপন্যাসের জন্য তিনি আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তারপর ১৯৮৪ সালে কালবেলা উপন্যাসের জন্য তিনি আকাদেমি পুরস্কার পান।

সম্প্রতি হৃদরোগের জটিলতায় অসুস্থ হলেও নিরলসভাবে পত্র-পত্রিকার পাতায় গল্প-উপন্যাস লিখে চলেছেন সমরেশ মজুমদার। আজও তিনি বাঙালির কাছে অতি প্রিয় এক লেখক।     

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য



সেই রহস্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন