শিল্প-সাহিত্য

শরৎচন্দ্র এবং নিরুপমা দেবী

শরৎচন্দ্র এবং নিরুপমা দেবী দুজনের  সম্পর্ক ছিল তাদের লেখার মধ্যে দিয়ে। নিরুপমা দেবীকে  শ্রদ্ধা করতেন শরৎচন্দ্র। তাঁর সাহিত্য সাধনায় প্রেরণা জুগিয়েছেন নানা ভাবে। নিরুপমার দাদা বিভূতিভূষণ ও তাঁর বন্ধুদের শরৎচন্দ্র বলতেন, ‘কুঁড়ি সাহিত্যিক’-এর দল। কারণ তখন তাঁরা নাকি ‘ফুটি’ ‘ফুটি’ করছেন। এই দলের ‘গুরু’ ছিলেন শরৎচন্দ্র। তাঁরই পরামর্শে একটি হাতে লেখা কাগজ প্রকাশ করা হত। সেই কাগজে বিভূতিভূষণ ও তাঁর সাহিত্যিক বন্ধুদের লেখা ছাপা হত। লেখা নিয়ে হত আলোচনাও। কাগজটির নাম ছিল ‘ছায়া’। এই আলোচনায় সভ্যদের লেখা পাঠ করা হত। সঙ্গে এক জন অন্তঃপুরচারিণীর লেখাও তাঁর ‘ছোট্‌দা’র মারফত এসে পড়ত সভ্যদের হাতে। বিভূতিভূষণ লিখেছেন,“ইনি আমাদের বন্ধুদের দৃষ্টিপথের অন্তরালে থাকিয়াও আমাদের বন্ধুবর্গের একান্ত আপনার ছোট বোনটিই হইয়াছিলেন।”

এই ছোট বোন নিরুপমা তখন অজস্র কবিতা আর গল্প লিখে চলেছেন। যার কিছু কিছু ছাপাও হয়েছিল ‘ছায়া’ পত্রিকায়। শরৎচন্দ্রের পরামর্শ দাদা বিভূতিভূষণের হাত ঘুরে আসত নিরুপমার কাছে। আর এই ভাবেই কবিতা লিখতে লিখতে একদিন নিরুপমা লিখে ফেলেছিলেন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ গল্পটি।

শরৎচন্দ্রের সঙ্গে নিরুপমা দেবীর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল এক আকস্মিক ও নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। নিজেই তা লিখে গিয়েছেন তিনি,
“শ্রাদ্ধান্তে যখন… ভ্রাতৃজায়ার সঙ্গে বাড়ী ফিরিতেছি, দেখি শরৎ দাদা আমাদের বাড়ীর দিক হইতে পুঁটুলির মত কি লইয়া আসিয়া ছোট্‌দার হাতে দিলেন। ছোট্‌দা তাহা ভ্রাতৃজায়ার হাতে দিলে দেখি একখান পাড়ওয়ালা কাপড় ও হাতের গহনা – ৺ শ্রাদ্ধের পূর্বে যাহা বাড়ীতে খুলিয়া রাখা হইয়াছে। মনের উত্তেজনায় বোধহয় সে সময় আবার সেগুলা লইতে অনিচ্ছা প্রকাশই হইয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু সে জিদ সেদিন জয়ী হইতে পারে নাই। মাতৃসমা ভ্রাতৃজায়া তো কাঁদিতেই ছিলেন— ছোট্‌দা মুখ ফিরাইয়া চোখ মুছিতেছে এবং একজন বাহিরের লোক— তিনিও তাহাদের সঙ্গে কাঁদিতেছেন।”

নিরুপমার বৈধব্যকে শরৎচন্দ্র মেনে নিতে পারেননি। তিনি লিখেছেন,
“আমার সত্যকার শিষ্যা, এবং সহোদরার অধিক একজন আছে, তাহার নাম নিরুপমা। …এই মেয়েটি যখন তাহার ষোল বৎসর বয়সে অকস্মাৎ বিধবা হইয়া একেবারে কাঠ হইয়া গেল, তখন আমি তাহাকে বার বার এই কথাটিই বুঝাইয়াছিলাম, ‘বুড়ি, বিধবা হওয়াটাই যে নারী জন্মের চরম দুর্গতি এবং সধবা থাকাটাই সর্বোত্তম সার্থকতা ইহার কোনটাই সত্য নয়’। তখন হইতে সমস্ত চিত্ত তাহার সাহিত্যে নিযুক্ত করিয়া দিই।”

দুর্গাদাস ভট্টর লেখা থেকে জানা যায়, শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের সম্পর্কে নিজের মতামত নিরুপমা দেবী লিখে রাখতেন তাঁর ডায়েরিতে। নায়িকারা সকলেই বিধবা। তাদের যে ছবি শরৎচন্দ্র তুলে ধরছেন তাঁর লেখায়, তার সঙ্গে নিরুপমা কি মিলিয়ে নিতে চাইতেন নিজের জীবন এবং ভাবনাকে? যদিও আজ তা জানা অসম্ভব। তবে চিত্ররেখা গুপ্তর মতে, “‘বড়দিদি’র মাধবী, ‘পথ-নির্দেশ’-এর হেম, ‘মন্দির’-এর অপর্ণা, ‘পল্লীসমাজ’-এর রমা, ‘চরিত্রহীন’-এর কিরণময়ী সবাই বিধবা। এই সব বিধবা চরিত্র চিত্রণের নেপথ্যে শরৎচন্দ্রের বিশেষ কোনও মানসিকতা কাজ করেছিল কি না এ প্রশ্ন মনে জেগে থাকতে পারে। নিরুপমাও বিব্রত হয়ে থাকতে পারেন।”

কিন্তু যখন দেখা যায় নিরুপমা নিজে কলম ধরছেন এবং নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার উপরে ভিত্তি করে আঁকছেন হিন্দু বাঙালি বাড়ির বিধবাদের দুর্দশা, হতাশা, যন্ত্রণার কথা। আর শরৎবাবু তার প্রশংসা করছেন, সোনার কলম উপহার দিচ্ছেন, পত্রিকার সম্পাদকদের অনুরোধ করছেন নিরুপমার লেখা ছাপাতে, তখন মনে হয় শরৎচন্দ্র ও নিরুপমার মধ্যে নিশ্চয়ই এক আশ্চর্য সুন্দর ‘সাহিত্য-বন্ধন’ গড়ে উঠেছিল। যার স্বীকৃতি সে যুগে সম্ভব ছিল না। বরং জুটেছিল নিন্দা ও কুৎসা। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিরুপমার মধ্যে জন্ম হয়েছিল এক মরমী সাহিত্যিকের। যিনি নিজে বাংলার সকল বিধবার হয়ে কথা বলছেন। কাটাছেঁড়া করে বুঝিয়ে দিতে চাইছেন তাঁদের মনন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, যন্ত্রণা ও সীমাবদ্ধতা। আর ‘সাহিত্যদূত’ হয়ে তা পৌঁছে যাচ্ছে ‘প্রিয়তম’র কাছে। বর্মায় বসেও একাকী শরৎচন্দ্র নিরুপমার লেখার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতেন। তিনি লিখেছেন, ‘সে যাহা লেখে, একটুখানি অংশ আমি মনে মনে আদায় করিয়া নদীর ধারে জেটির উপর বসিয়া পরিপাক করি এবং কামনা করি যেন বাঁচিয়া থাকিয়া বিশেষ একটু ভাল জিনিষের স্বাদগ্রহণ করিতে পারি।’

তৎকালীন বাংলার সাহিত্য মহলে এই দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। নিরুপমার ব্যক্তিজীবন এতই বিষিয়ে উঠেছিল যে, শেষে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন শরৎচন্দ্রকে চিঠি লিখে জানাতে, “আর এখানে আসিবেন না। আমাকে এ’ভাবে নষ্ট করিবেন না।”

শ্রীমতী নবনীতা দেবসেনের মা সাহিত্যিক রাধারাণীদেবী উল্লিখিত নিরুপমার এই চিঠি নাকি আজীবন তাড়িয়ে বেরিয়েছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে। এরই প্রকাশ ঘটেছে দু’জনের সাহিত্যে। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত নিরুপমার ‘দিদি’ উপন্যাসের উমা বলে ওঠে, “যাও, তুমি যাও, কেন এসব বল্লে, কেন এসেছিলে? আমি শুনব না, তুমি যাও।”

আর পরের বছর ১৯১৬ সালে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের ‘পল্লীসমাজ’-এর রমার উক্তি,“আমি মিনতি করছি রমেশদা, আমাকে সব দিকে নষ্ট করো না। তুমি যাও।”

শরৎ ও নিরুপমার সাহিত্য নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হলে হয়তো এই সম্পর্কের এক সুপ্ত দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

তথ্যসূত্র


  1. নিরুপমা দেবী জীবনে ও সাহিত্যে, চিত্র রেখা গুপ্ত, সিগনেট প্রেস (২০১২)
  2. বর্তমান পত্রিকা, ২৭শে জুন ২০১৯ সাল
  3. আজকাল পত্রিকা, ২১শে জুলাই ২০১৮ সাল
  4. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সাল

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!