সববাংলায়

সাত দেউল

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক প্রাচীন মন্দির-মসজিদ এই বঙ্গের পুরাতন ইতিহাসকে ধারণ করে রয়েছে। সেইসব স্থাপত্যকর্ম আজ জরাজীর্ণ। কিন্তু ইতিহাসের স্বাদ গ্রহণের জন্য বহু পর্যটক প্রাচীন এইসব স্থাপত্যকীর্তি পরিদর্শনের জন্য এসে ভিড় করেন। বঙ্গদেশ পোড়া ইটের অর্থাৎ টেরাকোটার স্থাপত্য নিদর্শনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সম্পূর্ণ ইট দিয়ে তৈরি তেমনই আরেকটি স্থাপত্যকীর্তি হল পূর্ব বর্ধমান জেলার বর্ধমান সদর দক্ষিণ মহকুমার মেমারি সিডি ব্লকের সাত দেউল (Sat Deul)। নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ বইয়ে মন্দিরটি ‘সাত দেওলিয়া আঝাপুর’ নামে উল্লিখিত হয়েছে। এই মন্দিরটি ‘সাতদেউলিয়া’ নামেও পরিচিত।

বর্ধমান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আঝাপুরের দেউলিয়া গ্রামে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পূর্বদিকে এই সাত দেউলের অবস্থান। এটি মূলত একটি জৈন মন্দির হিসেবেই পরিচিত। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা অসংখ্য জৈন মন্দিরগুলির মধ্যে এই সাত দেউল অন্যতম প্রাচীন একটি মন্দির। জটিল ও সূক্ষ্ম প্রাচীন নকশায় ভরপুর এই সাত দেউল বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের একটি অংশস্বরূপ অতএব এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপেক্ষা করা যায় না।

উপকূলবর্তী বন্যাসঙ্কুল বঙ্গদেশের সমভূমিতে পাথরের পরিমাণ কখনই খুব বেশি ছিল না। ফলত বাংলার প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তিগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, তুলনামূলকভাবে পাথর দ্বারা নির্মিত স্থাপত্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম। পাথরের পরিবর্তে তাই প্রাচীন স্থপতিরা বঙ্গদেশে অতি সহজলভ্য কাদামাটিকে বেছে নিয়েছিলেন এবং পোড়ামাটির ইট হয়ে উঠেছিল স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান। এই পোড়ামাটির ইট দিয়েই বাংলায় তৈরি হতে থাকে একের পর এক অপরূপ সব শিল্পকীর্তি। তবে এইরকম ইটের স্থাপত্যের আয়ুষ্কাল খুব বেশি হয় না ফলে এমন বহু স্থাপত্য ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যা রয়ে গেছে তাও অত্যন্ত জরাজীর্ণ।

আমাদের আলোচ্য সাত দেউলের মতো আরও অনেক দেউলের অস্তিত্ব রয়েছে। এগুলি মূলত প্রাক-ইসলামি যুগের স্থাপত্যকীর্তি। পূর্ব বর্ধমানের এই সাত দেউলটি ঐতিহাসিকদের মতে, আনুমানিক দশম থেকে একাদশ শতকের সময়কালের হতে পারে। কথিত আছে যে, রাজা শালিবাহন এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। ডেভিড জে. ম্যাককাচিওন বলেছেন যে, প্রাক-মুসলিম যুগে বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের মন্দিরগুলির স্থাপত্যশৈলী হল প্রধানত লম্বা বক্ররেখাবিশিষ্ট দেউল ধরনের এবং এগুলি সপ্তম শতকের শেষ থেকে দ্বাদশ শতকের কাছাকাছি পর্যন্ত বিকাশ লাভ করেছিল।

১৯৩৪ সালে এন.জি মজুমদার প্রথম সংক্ষিপ্তভাবে ইটের তৈরি এই মন্দিরের অস্তিত্বের কথা লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৩ সালে এস.কে. সরস্বতী এই দেউল পরিদর্শন করেন এবং এর বিগ্রহহীন গর্ভগৃহ, শিখর, স্থাপত্যশৈলীর নানারকম দিক ইত্যাদি বিশদে লেখেন। তবে ১৯৭৩ সালে পিসি দাশগুপ্ত প্রথম এই সাত দেউলকে একটি জৈন মন্দির হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, কারণ সেইসময় তিনি এই সাত দেউলের কাছাকাছি একটি কালো ব্যাসল্ট পাথরের ভাস্কর্য আবিষ্কার করেছিলেন যেটি অষ্টপদ-তীর্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তারপর থেকে সেই সাত দেউলের কাছে এবং আশেপাশের গ্রাম থেকে আরও অনেক জৈন পুরাকীর্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল বেশ কয়েকটি তীর্থঙ্কর মূর্তি।

বেস্পোকেন আর্কিটেকচারাল অ্যান্ড ইউনিক লিগ্যাসিস অফ বেঙ্গল-এর প্রধান পরামর্শদাতা সম্রাট চৌধুরী বলেছিলেন যে, মন্দিরটি ১০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে এবং এই এলাকাটি একসময় সম্ভবত জঙ্গলের অংশ ছিল। এছাড়াও সাত দেউল নামটি থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, এখানে মোট সাতটি মন্দির ছিল। অন্য মন্দিরগুলি কীভাবে ও কোন সময়ে ধ্বংস হয়েছিল তা অনুসন্ধানের বিষয়।

এই সাত দেউল মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলীটিও খুবই আকর্ষণীয় দেউল রীতির। প্রাচীন ভারতের মন্দির শিল্পে বাংলার অবদান হল দেউল রীতি। দেউল শব্দটা ‘দেবালয়’ এর থেকেই তৈরি। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় দেউল স্থাপত্যরীতির উন্মেষ ঘটেছিল। দেউল রীতিতে চার রকমের শৈলী আছে – রেখা বা শিখর দেউল, ভদ্র বা পীড় দেউল, স্তূপযুক্ত পীড় বা ভদ্র দেউল আর শিখরযুক্ত পীড় বা ভদ্র দেউল। এই মন্দিরটি রেখা বা শিখর দেউল স্থাপত্যশৈলী দ্বারা নির্মিত তবে নাগারা শৈলীর বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়ে। মন্দিরটির কাঠামো লম্বা বাঁকানো একটি সুউচ্চ টাওয়ারের মত। এর উচ্চতা ২৩ মিটারের একটু বেশি। দেউল রীতির মন্দিরগুলির মধ্যে পোড়ামাটির তৈরি এই মন্দিরটি সবচেয়ে উঁচু। এই মন্দিরের ভিত পঞ্চরত্ন আলেখ্যে নির্মিত। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে ক্রমবর্ধমান খিলান বা করবেলড্ আর্চের ব্যবহার লক্ষনীয়। প্রবেশপথটি অনেকটা উল্টানো ইংরেজি ‘ভি’ বর্ণটির মতো দেখতে। এছাড়া মন্দিরের বহির্গাত্রে চৈত্য-জানালার মোটিফও বেশ আকর্ষণীয়। এছাড়াও মন্দিরের বাইরের দেওয়ালের গায়ে ইটের ফুল ও বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশার সূক্ষ্ম ও জটিল অলঙ্করণগুলি ভীষণই নান্দনিক। তবে দুঃখের বিষয় মন্দিরের গা থেকে এমন অনেক নকশাই হারিয়ে গিয়েছে কালের অতলে।

এখানে দেউলের ভিতরে গর্ভগৃহে কোন বিগ্রহ নেই। ফলত এই মন্দিরে যে কার উপাসনা করা হত তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। জৈন মন্দির হিসেবে আপাতত পরিচিত হলেও অনেকেই আবার একে বৌদ্ধ মন্দিরও বলেছেন। বিগ্রহ না থাকার কারণে নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যায় না। মন্দিরটির চারপাশে সুদৃশ্য সবুজ ঘাসে ঘেরা বিস্তীর্ণ চত্বর। সেখানে সারি সারি ফুলগাছ এবং চতুর্দিকে বিভিন্ন গাছের ঘেরাটোপ মনোরম ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এখানকার পরিবেশকে।

সাত দেউল মন্দিরটি আসলে কোন ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মনুমেন্টস অব ন্যাশানাল ইমপর্টেন্স-এর তালিকায় এটিকে ইটের তৈরি জৈন মন্দির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের একটি অংশকে চাক্ষুষ দেখতে এবং এই বর্তমানে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসকে একটু ছুঁয়ে নিতে, তার স্বাদ গ্রহণ করতে অনেক পর্যটক পূর্ব বর্ধমানের এই সাত দেউল মন্দিরটিতে এসে ভিড় জমান। প্রাচীন বাংলার উচ্চমার্গীয় স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবেও এই সাত দেউল মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading