ভ্রমরম্বা সতীপীঠটি অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলার শ্রীশৈলমে নল্লামালাই বনের মধ্যে কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। এটি একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। শুধু তাই নয়, এটি আঠারো মহাশক্তিপীঠেরও একটি পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর দেবীর গলার অংশ পড়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী ভ্রমরম্বা এবং ভৈরব হলেন মল্লিকার্জুন। তবে দেবীর রূপ এখানে মহালক্ষ্মী এবং ভৈরব শম্বরানন্দ নামেও পরিচিত। জ্যোতির্লিঙ্গ মল্লিকার্জুন মন্দির চত্বরেই মল্লিকার্জুনের মন্দিরের ঠিক পিছনে ভ্রমরম্বা দেবীর মন্দিরের অবস্থান। একইসাথে জ্যোতির্লিঙ্গ এবং সতীপীঠ এই দুইয়ের অবস্থানের কারণে এই মন্দির হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য হয়।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখন্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। এই ভ্রমরম্বা সতীপীঠে দেবীর গলার অংশ পড়েছিল বলে মনে করা হয়। আবার বাংলাদেশের জৈনপুর গ্রামে অবস্থিত সতীপীঠ শ্রীশৈলেও দেবীর গলার অংশ পড়েছিল বলে মনে করা হয়।
ভ্রমরম্বা সতীপীঠকে ঘিরে নানারকম কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। একটি কিংবদন্তী অনুসারে একসময় অরুণাসুর নামে এক রাক্ষস সারা বিশ্বে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করতেন। দীর্ঘকাল ধরে তপস্যা করে ব্রহ্মাকে তিনি খুশি করেছিলেন। অরুণাসুরের তপস্যায় খুশি হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে বর দেন যে, কোন দুই বা চার পায়ের প্রাণী তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। এই বরে দেবতারা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং তাঁরা আদিশক্তির স্মরণাপন্ন হন। আদিশক্তি জানান অরুণাসুর তাঁরও ভক্ত তিনি তাঁকে হত্যা করতে পারবেন না যতক্ষণ না অরুণাসুর তাঁর পূজা বন্ধ করে দেন। দেবগুরু বৃহস্পতি তখন অরুণাসুরের সঙ্গে দেখা করতে যান। বৃহস্পতির আগমনে রাক্ষস অবাক হতেই বৃহস্পতি জানান তাঁরা দুজনেই যেহেতু আদিশক্তির উপাসনা করেন অতএব বৃহস্পতির সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক এবং আশ্চর্যের কিছু নয়। অরুণাসুর যখন দেখলেন যে দেবতারাও আদিশক্তির উপাসনা করেন তখন তিনি আদিশক্তির উপাসনা বন্ধ করে দেন। এতে আদিশক্তি ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠেন এবং ভ্রমরম্বা রূপ ধারণ করে অসংখ্য মৌমাছির জন্ম দেন। ভ্রমরম্বা শব্দের অর্থ হল মৌমাছির মা। মৌমাছির ছয়টি করে পা থাকায় ব্রহ্মার বর অনুযায়ী সেই মৌমাছির দল খুব সহজেই অরুণাসুর ও তাঁর পুরো বাহিনীকে হত্যা করে ফেলতে সক্ষম হয়। ভক্তদের বিশ্বাস যে, তাঁরা এই ভ্রমরম্বা মন্দিরের গর্ত দিয়ে ভ্রমরের গুঞ্জন আজও শুনতে পান। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় অবস্থিত সতীপীঠ ত্রিস্রোতায় অবস্থিত ভ্রামরী দেবীকে নিয়েও একই কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে দুটো সতীপীঠ এক নয় কারণ ত্রিস্রোতা সতীপীঠে সতীর বাঁ পা পড়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়।
এই মন্দিরের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। এই মন্দিরের উল্লেখ যেসব শিলালিপি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায় সেগুলি থেকে বিশেষত সাতবাহন রাজবংশের শিলালিপি থেকে অনুমান করা যায় যে, দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে এই মন্দিরটি বিদ্যমান রয়েছে। চালুক্য রাজবংশ এবং কাকাতিয়া রাজবংশ এই মন্দিরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা হরিহরের শাসনকালে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারগুলি হয়েছিল। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শাসনকালেই মন্দিরের মুখ মন্ডপম এবং গোপুরম নির্মিত হয়েছিল। আবার শ্রী কৃষ্ণদেবরায়ের শাসনকালে, সালু মন্ডপ এবং রাজাগোপুরমও নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৬৭৪ সালে মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজি মন্দিরের বিভিন্ন সংস্কার করবার পাশাপাশি মন্দিরে বিভিন্ন উৎসব পুনরায় শুরু করেছিলেন। পরে মুঘল নবাব এবং তারপর ব্রিটিশরা এলাকাটি দখল করে নেয় এবং মন্দিরের প্রশাসনও তাদের অধীনে আসে। ১৯২৯ সালে ব্রিটিশরা মন্দির পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে মন্দিরটি এনডাউমেন্টস বিভাগের (Endowments Department) প্রশাসনের অধীনে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে এই মন্দিরটি অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা করে।
এই মন্দির অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। চারদিকে পাথরের তৈরি প্রায় ২৮ ফুট লম্বা পাঁচিল রয়েছে এবং সেই পাঁচিলের চারদিকে মন্দিরের মোট চারটি দ্বার রয়েছে। এগুলি হল পূর্বে ত্রিপুরানাথাকম, দক্ষিণে সিদ্ধাবতম, পশ্চিমে আলমপুর এবং উত্তরে উমামহেশ্বরম। পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারকে মহাদ্বারম বলা হয়ে থাকে। ভিতরের প্রাঙ্গণটি নবব্রহ্ম মন্দির নামে পরিচিত নয়টি মন্দির নিয়ে গঠিত। ভগবান মল্লিকার্জুন এবং ভ্রমরম্বা দেবীর জন্য এখানে দুটি পৃথক মন্দির রয়েছে। এছাড়াও বিজয়নগর আমলে নির্মিত মুখ মন্ডপম (রাজকীয় স্তম্ভসহ বিরাট হলঘর) তো রয়েছেই সেই সঙ্গে বৃদ্ধ মল্লিকার্জুন, সহস্র লিঙ্গেশ্বর, অর্ধনারীশ্বর, বীরভদ্র, উমা মহেশ্বরদের জন্য অন্যান্য ছোট মন্দির রয়েছে। উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণদিকে প্রায় ৪২টি স্তম্ভ এবং বারান্দা-সহ বিশাল মন্ডপ রয়েছে। এই মণ্ডপের কেন্দ্রে নন্দীর একটি বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে; এটি ভগবান মল্লিকার্জুনের ঠিক মুখোমুখি অবস্থিত। ভিতরের চত্বরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে নন্দীমণ্ডপ, বীরশিরোমণ্ডপ, মল্লিকার্জুন মন্দির এবং ভ্রমরম্বা মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। ভ্রমরম্বা মন্দিরটি একটি কিঞ্চিৎ উঁচু স্থানে অবস্থিত। ভক্তদের প্রবেশ করানোর সময় প্রথমে মল্লিকার্জুন মন্দির দর্শন করানো হয়, তারপর ভ্রমরম্বা দেবীর দর্শন পাওয়া যায়।
এই ভ্রমরম্বা সতীপীঠে দেবী মূর্তিটিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে দেবীর মোট আটটি বাহু। দেবীর পরণে দেখা যাবে একটি রেশমি শাড়ি। মন্দিরের গর্ভগৃহের ভিতরে অগস্ত্যের স্ত্রী লোপামূদ্রার মূর্তি রয়েছে।
ভ্রমরম্বা সতীপীঠে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানারকম উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে নবরাত্রির উৎসব ধুমধাম করে পালিত হয় দেবীর মন্দিরে। এই সময় নবদুর্গালঙ্কার অর্থাৎ শৈলপুত্রী (পার্বতী), ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডদুর্গা, স্কন্দমাথা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদায়িনীর প্রতিদিন সন্ধ্যায় পূজা করা হয়। এছাড়াও দেবীর বাহন সেবা এবং বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয় এই উৎসবে। দ্বিতীয়ত যে উৎসবটি ভ্রমরম্বা দেবীর মন্দিরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় তা হল কুম্ভোৎসব। চৈত্র মাসের পূর্ণিমার পর প্রথম মঙ্গল বা শুক্রবার এই উৎসব পালিত হয়ে থাকে। এই উৎসবে ভ্রমরম্বা দেবীকে বিভিন্ন নৈবেদ্য দেওয়া হয়ে থাকে। এই দিনে স্থানীয় উপজাতীয় লোকেরা যাদের চেঞ্চুস নামে অভিহিত করা হয়, তারা নিজেরাই দেবীর সামনে উপজাতি নৃত্য করে এবং এই উৎসব উদযাপনে তাদের প্রাধান্য অনেক বেশি। কুম্ভোৎসবের দিন বিকেলে ভগবান মল্লিকার্জুন স্বামীকে অন্নভিষেকম করা হয়। এরপর দেবতাকে দই ভাত দিয়ে আবৃত করা হয় এবং মন্দিরের দরজা পরের দিন ভোর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এইসব বিশেষ উৎসবের সময় অসংখ্য মানুষ এই ভ্রমরম্বা সতীপীঠে এসে ভিড় জমান এবং দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।
খুব কম সংখ্যক মন্দির আছে যেখানে একইসাথে জ্যোতির্লিঙ্গ এবং সতীপীঠ এই দুইয়ের অবস্থান। সতীপীঠ ভ্রমরম্বা তাদের মধ্যে অন্যতম এবং সেই কারণে এই মন্দির হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্দির।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান