ঠাণ্ডা পানীয় বাচ্চা থেকে বয়স্ক সকলেরই ভীষণ পছন্দের। ঠাণ্ডা পানীয়ের জগতে ‘পেপসি’ (Pepsi) একটি বহুল পরিচিত নাম।বাণিজ্যিক প্রচারের উদ্দেশ্যেই পেপসিকো কোম্পানি ‘ফিডো ডিডো’ (Fido Dido) ম্যাসকটটিকে বাজারে আনে। নব্বইয়ের দশকে ‘ফিডো ডিডো’ ঠাণ্ডা পানীয়ের জগতে আইকনিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। একটি সাধারণ ছেলের একদম সাধারণ একটা চেহারা আর ঢিলেঢালা পোশাকের কার্টুন মানুষকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছিল। তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমে আমেরিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল নেদারল্যান্ড, ভারত, তুরস্ক প্রভৃতি আরো বহু দেশে। আজও ‘সেভেন আপ’ নামের একটি বিশেষ সফ্ট ড্রিঙ্কের বিজ্ঞাপনে এই ফিডো ডিডোকে দেখা যায়। পেপসিকো কোম্পানির এই ম্যাসকট বর্তমানে সেভেন আপ ফিডো ডিডো (7 up Fido Dido) নামেই পরিচিত।
আমেরিকার বিখ্যাত কার্টুনিস্ট এবং টেলিভিশন স্ক্রিপ্ট রাইটার স্যু রোজ ১৯৮৫ সালে ‘ফিডো ডিডো’র স্কেচটি করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জোয়ানা ফোরেন। একদিন কফি হাউসে বসে স্যু রোজ একটা ন্যাপকিনের উপরে একটি ডুড্ল স্কেচ করেন যার অবয়বটি রোগা-পাতলা এবং তাঁর মাথায় রয়েছে মাত্র আটটি চুল। তার নাক, চোখ, মুখ একটি উল্টানো ত্রিভুজের মত আর তার মুখের দুপাশে রয়েছে গোলাকৃতি দুটি কান। তার পরনে ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট, সাদা শর্টস এবং পায়ে মানানসই সাদা স্নিকার্স। পরের দিন জোয়ানা এই ডুড্লটির নামকরণ করেছিলেন ‘ফিডো ডিডো’। প্রথমে একটি কার্টুন হিসেবেই তাঁরা এই ডুড্লটিকে টি-শার্টের উপরে স্কেচ করেন একটি স্লোগানসহ। স্লোগানটি ছিল ‘ফিডো ইজ ফর ফিডো, ফিডো ইজ এগেইন্সট নো ওয়ান’। নিউইয়র্কে ভীষণভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে এই ডুড্লটি। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এই ডুড্লটি কার্টুন হিসেবে বিভিন্ন স্টেশনারি দ্রব্যে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯০ সালে পেপসিকো সংস্থার অনুমোদন প্রাপ্ত হয় ডুড্লটি। তাদের ‘কুল স্পট’ নামের প্রোডাক্ট যা কিনা ‘সেভেন আপ’ নামে পরিচিত ছিল, তার ম্যাসকট হিসেবে ডুড্লটিকে বাজারে নিয়ে আসে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে ডুড্লটি মানুষের মধ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। এর পরবর্তী দুই বছরে ম্যাসকটটি তাঁর চেহারা এবং জীবনের প্রতি অপ্রচলিত মনোভাবের জন্য মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কখনও ফিডোকে আমরা দেখছি জীবনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সেই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার বুদ্ধি ব্যবহার করতে। আবার কখনও দেখেছি ধূসর বর্ণহীন জীবনকে রঙিন বর্ণময় করে তোলায় সাহায্য করতে। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে আমরা দেখেছি মাথা ঠাণ্ডা করে জীবনের জটিল সমস্যাগুলোকে সহজ করে তুলতে। ১৯৮৯ সালে ‘ফিডো ডিডো : লাইফ ইন দ্য থার্ড লেন’ নামে একটি দুই মলাটের বইও প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে ‘ফিডো ডিডো’ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর আরো সাতটি দেশে ‘সেভেন আপ’-এর ম্যাসকট হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯০ সালে আমেরিকার টেলিভিশনে শনিবারের সকালের শো-তে ফিডোর বিজ্ঞাপনটি দেখানো শুরু হয় এবং এটি টানা তিন বছর চলে। ১৯৯২ সালে ম্যাগাজিনের পাতাতেও প্রকাশিত হয় ‘ফিডো ডিডো’। সেই বছরই ফিডোর পুরো পরিবারকে আমরা প্রথমবারের জন্য প্রকাশ্যে দেখতে পাই। তাঁর দুই ছেলে মেয়ে, বন্ধু এবং পোষ্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় ঘটে। তাঁর ছেলের নাম মারিও ডিডো এবং কন্যার নাম জুলিয়া পি ডিডো। ফিডোর কুকুরের নাম গাটো এবং বিড়ালের নাম ফিডো। ১৯৯৩ সালে ফিডো ডিডো নামে একটি ভিডিও গেম আবিষ্কার করে জাপানি ভিডিও গেম প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘ক্যানেকো কোং’, কিন্তু সে গেম বেশি দিন চলেনি।
১৯৮৮ সালে আমেরিকায় পেপসিকো’র ‘সেভেন আপ’ ব্র্যান্ডটি ডা. পেপার স্ন্যাপল গ্রুপের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। ফলে ম্যাসকট হিসেবে ‘ফিডো ডিডো’ও তার জনপ্রিয়তা হারায়। ১৯৯০ সালে সেভেন আপ ভারতীয় বাজারে আসে এবং ১৯৯২ সাল থেকে সেভেন আপ তাঁর ম্যাসকটের মাধ্যমে ভারতে প্রচার শুরু করে। ক্রমশ ভারতেও ফিডো ডিডো জনপ্রিয়তা লাভ করে। টেলিভিশনে তাঁর উপস্থিতি এক অন্য মাত্রা এনে দেয় বিজ্ঞাপন জগতে। টেলিভিশনের পর্দায় মূলত তাঁর উপস্থিতি একপ্রকার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু কখনও কখনও তাঁকে বলিউডের বিভিন্ন অভিনেত্রীদের সঙ্গেও দেখা গেছে। এই অভিনেত্রীরা হলেন মল্লিকা শেরাওয়াত এবং ইয়ানা গুপ্তা। মডেল ইয়ানা গুপ্তার সঙ্গে ফিডো ডিডোকে প্রথমবার রঙিন পোশাকে দেখা যায়। ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ‘ফিডো ডিডো’ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০০ সালে ‘ফিডো’ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবার তাঁর নিজের জন্মভূমি আমেরিকায় ফিরে আসে। ২০১৫ সালে ইউনাইটেড কিংডম এবং আয়ারল্যান্ডে যখন সেভেন আপ পুনরায় ফিরে আসে, তখন সেভেন আপের ক্যানে আবার ফিডো ডিডোকে দেখতে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ফিডো তুর্কিতে পেপসিকোর একটি আলাদা প্রোডাক্ট ‘ফ্রুকো’র জন্যও ম্যাসকট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফিডো ডিডোর মূল আকর্ষণ ছিল যুব সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে সেভেন আপের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যেই পেপসিকো কোম্পানি ফিডো ডিডোর বিজ্ঞাপনগুলিকে তৈরি করেছে। যুব সম্প্রদায়কে সবসময় চাঙ্গা রাখতে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁদের সঠিক বুদ্ধি প্রয়োগ করে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে শেখায় ফিডো ডিডো। সেই কারণেই সেভেন আপের বিজ্ঞাপনগুলি যুবসমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং একই সঙ্গে সেভেন আপের ব্যাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতেও সাহায্য করে। সেভেন আপ ফিডো ডিডোর সাহায্যে ঠাণ্ডা পানীয় বা সফ্ট ড্রিঙ্কের জগতে পেপসিকোর এই প্রোডাক্টটি খুব সহজেই ‘কোকাকোলা’ (Cocacola) কোম্পানির ‘স্প্রাইট’কে (Sprite) একটি চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই সাফল্যের পিছনে অন্যতম অবদান রয়েছে ফিডো ডিডোর। সম্প্রতি ২০১৯ সালে সেভেন আপ বাংলাদেশে তাঁদের প্রচার শুরু করে ‘ফিডো ডিডো’র মাধ্যমে। সেভেন আপ ফিডো ডিডো একটি কার্টুন চরিত্র হয়েও তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে একজন সত্যিকারের মানুষের মতই করে তুলেছে। আশির দশকের শেষ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় অবধি তার জনপ্রিয়তা একই রয়ে গেছে। মাঝে কিছু বছর ফিডোকে সেভেন আপে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে সে আবার ফিরে এসে তার যাদুতে মুগ্ধ করেছে সবাইকে। বর্তমানে তাকে আমরা দেখি এক উৎসুক কাকার হাত থেকে এক যুবক যুবতীকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার হওয়ার উপায় করে দিতে। সেই প্রথম থেকে আজ অবধি ফিডো তার মনোভাব একই রেখেছে, এটাই হল তার বৈশিষ্ট্য আর এই কারণেই সে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সকলের মধ্যে। দীর্ঘদিনের বিরতির পরে ফিরে এসে সে একইভাবে মানুষের মনে রয়ে গেছে। আজও ভারতীয় উপমহাদেশ সহ বিশ্বের আরো অন্যান্য দেশে সেই আশির দশকের মতই জনপ্রিয় হয়ে আছে সেভেন আপ ফিডো ডিডো।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান