ধর্ম

সৌভাগ্য চতুর্থী ব্রত

সৌভাগ্য চতুর্থী ব্রত আশ্বিন মাসের যে চতুর্থীতে দুর্গা পুজো হয়, সেই চতুর্থীতে পালন করা হয়। চার বছর এই ব্রত উদযাপন করতে হয়। সাধারণত সধবা এবং পুত্রবতী নারীরা এই ব্রত পালন করে থাকে। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এককালে আসাম রাজ্যে এক রাজা ছিল,তার দুই রানী, বড়রানী দো রানী, আর ছোট রানী সো রানী। রাজা দো রানীকে একদম দেখতে পারত না । তাই দোরানী মনের দুঃখে গোয়ালঘরে গিয়ে থাকতে চালু করল, ছেঁড়া কাপড় পরে ছেড়া কাঁথায় শুয়ে সে খালি কাঁদত। এতে সো রানীর খুব মজা হত। সে খালি তার সখীদের সাথে এই আলোচনা করত যে কিভাবে দো রানীকে একেবারে রাজ্যছাড়া করা যায়। এই কথা এক দাসী জানতে পেরে দো রানীকে সব জানাল। দাসীর মুখে এই কথা শুনে দো রানী ভারী কষ্ট পেল। সব শুনে দো রানী আর রান্না করল না, শুয়ে শুয়ে কাঁদতে থাকলো। সেই দিনটি ছিল আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থীর দিন।দিন কেটে সন্ধ্যা হলো তাও রানী উঠে না,এই ভাবে সারাদিন উপোস থেকে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লো। শেষ রাত্রে রানী স্বপ্ন দেখল লাল শাড়ি পরা এক সুন্দরী নারী  তাকে বলছে, “কাঁদছিস কেন? ওঠ! আজ তো চতুর্থী ছিল। রাত পোহালে তুই চতুর্থীর পারণ করবি। তোর সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।” আসলে স্বপ্নে দেখা সেই নারী স্বয়ং মা দুর্গা। মা দুর্গা তাকে পুজোর সমস্ত নিয়ম বললেন।

রানী সেইমত সকালে উঠে পুকুরে চান করে এলো, আর পুজোর নিয়ম মতো দেবীকে ভোগ নিবেদন করে,গলায় কাপড় দিয়ে প্রনাম করে তারপর নিজে প্রসাদ গ্রহণ করল। এইভাবে তিন বছর কেটে গেল, কিন্তু তার দুঃখ আর দূর হয় না। কিন্তু রানী প্রতি বছর মা দুর্গার পুজো নিয়ম মত পালন করে যায়। এই দিকে সো রানীর প্রতাপ দিন দিন বাড়তে থাকলো, সে দাস দাসী প্রজাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকল। একে একে সবাই কাজ ছেড়ে দেয়,রাজার কাছে নালিশ করে। রাজ্যে বৃষ্টি হয় না, হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া সব মারা যায়। এইসব দেখে রাজা একদিন তার নগরে ঘুরতে বেরোয়, দেখে সবাই সো রানী কে হায় হায় করছে আর দো রানীর নামে প্রশংসা করছে। তারা বলছে বড়োরানী রাজ্যের লক্ষ্মী ছিল, সে থাকাকালীন তাদের কোনো অসুবিধা হতো না, বড়োরানী তাদের সন্তানের মত ভালোবাসত, রাজ্যে অন্নের অভাব ছিল না। আর এই সো রানী অপয়া ,অহংকারী, রাজ্যে মহামারী লাগিয়ে ছাড়লো। সব শুনে রাজা দো রানীকে দেখতে বনে গেলো। সে দিনও আশ্বিন মাসের চতুর্থী ছিল, দো রানী নিয়ম মতো মায়ের পুজো সেরে আসছিল, এসে দেখে রাজা মশাই দোর আগলে দাঁড়িয়ে আছে। রাজাকে দেখে রানী প্রনাম করতেই রাজা তাকে হাত ধরে তুলে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে রাজ প্রাসাদে নিয়ে এলো। তারপর সো রানী কে বনবাসে পাঠিয়ে দিলো।

বড় রানী ফিরে এসেছে শুনে দাস দাসী সবাই আবার কাজে যোগ দিলো, রাজ্য ধনধান্যে ভরে উঠলো। দেখতে দেখতে আবার আশ্বিন মাস এসে গেল। তখন রানী খুব ঘটা করে শুক্লপক্ষের চতুর্থীতে দুর্গা পুজো করলো। রাজা রানীর থেকে সেই পুজোর মাহাত্ম্য শুনল, তারপর সারা রাজ্যে সেই পুজোর মাহাত্ম্য প্রচার করল। এইভাবে সৌভাগ্য চতুর্থীর কথা চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৪৮
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১০৭

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ষট পঞ্চমী ব্রত



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন