ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা সুপারস্টার হিসেবে খ্যাত, প্রতিভাবান অভিনেত্রী শ্রীদেবীর আকস্মিক মৃত্যুতে বলিউড জগত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। হিন্দি, মালায়ালাম, তামিল, তেলেগু ও কন্নড় ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জনকারী শ্রীদেবী সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে একটি হোটেলের বাথরুমে মারা গিয়েছিলেন। এমন আকস্মিক মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু হলে সন্দেহজনক এমন কিছু তথ্য সামনে আসে যার ফলে এই মৃত্যুটিকে ঠিক স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শ্রীদেবীর মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী বনি কাপুর সেই হোটেলের ঘরেই উপস্থিত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে অনেকেই সন্দেহের আঙুল তুলেছিল এই বিখ্যাত প্রযোজকের দিকেও। এই বনি কাপুরই পরবর্তীকালে শ্রীদেবীর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছিলেন। সব মিলিয়ে বেশ কয়েক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্য (Sridevi Death Mystery) যবনিকার আড়ালেই রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইতে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রীদেবীর মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর ঠিক চারদিন আগে অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি শ্রীদেবী তাঁর ভাগ্নে মোহিত মারওয়ার বিবাহ-অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য কনিষ্ঠা কন্যা খুশিকে নিয়ে বিমানপথে চলে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ-এর দক্ষিণে অবস্থিত একটি শহর আল জাজিরাহ আল হামরা-এ। বিবাহের পর বড় মেয়ে জাহ্নবীর ২১তম জন্মদিনের উপহার কেনবার জন্য কয়েকদিন দুবাইতে কাটাবেন বলে স্থির করেন শ্রীদেবী। তাঁর স্বামী বিখ্যাত প্রযোজক বনি কাপুর বিবাহের দিন দুবাইতে উপস্থিত থাকতে পারেননি কারণ ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে লক্ষ্ণৌয়ের একটি সভায় যোগ দিতে হয়েছিল। কিন্তু বনি কাপুর তাঁর স্ত্রীয়ের কাছে একটি সারপ্রাইজ ভিজিট-এর পরিকল্পনা করে নিয়েছিলেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি সকালেই শ্রীদেবীর সঙ্গে বনি কাপুরের টেলিফোনে কথা হয়েছিল। তখন শ্রীদেবী জানিয়েছিলেন যে, তিনি পাপাকে অর্থাৎ বনি কাপুরকে খুবই মিস করছেন। সেই ২৪ ফেব্রুয়ারিতেই বনি কাপুর দুবাই যাওয়ার সাড়ে তিনটের বিমানে চড়েছিলেন এবং দুবাইয়ের জুমেইরাহ এমিরেটস টাওয়ারস হোটেলে শ্রীদেবীর কক্ষ অর্থাৎ ২২০১ নম্বর ঘরে পৌঁছেছিলেন ছয়টা কুড়ি নাগাদ। সেখানে প্রায় আধঘন্টা বা তার একটু বেশি সময় তাঁরা কথাবার্তা বলেছিলেন এবং সেদিন রাতে একসঙ্গে ডিনার করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শ্রীদেবী স্নান সেরে ডিনারের পোশাক পরে তৈরি হয়ে নিতে যখন চলে যান তখন বনি কাপুর বসবার ঘরে অপেক্ষা করছিলেন। প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট বা তারও একটু পরে শ্রীদেবীর আসতে অনেক সময় লাগছে দেখে বনি কাপুর স্ত্রীকে ডাকলেন কিন্তু জবাব পাননি। অবশেষে সাতটা নাগাদ বনি কাপুর তাঁর স্ত্রী শ্রীদেবীকে মৃত অবস্থায় বাথটাবে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর সর্বপ্রথম সঞ্জয় কাপুর ভারতীয় গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়ে শ্রীদেবীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু রবিবার ভোর থেকেই এই আকস্মিক মৃত্যুর তদন্ত শুরু করে দেয় দুবাই পুলিশ এবং পরবর্তীতে মামলাটি দুবাই পুলিশ কর্তৃক দুবাই পাবলিক প্রসিকিউশনে স্থানান্তরিত করা হয়।
মৃত্যুর সময় শ্রীদেবীর হোটেলের রুমে একমাত্র বনি কাপুর উপস্থিত থাকার ফলে প্রাথমিকভাবে শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্যর সন্দেহের তীর তাঁর দিকেই যায়। কিন্তু দুবাইয়ের জেনারেল ডিপার্টমেন্ট অব ফরেনসিক অ্যাভিডেন্সের রিপোর্ট অনুসারে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে যাওয়াই মৃত্যুর কারণ। এছাড়াও টক্সিকোলজি রিপোর্টে শ্রীদেবীর শরীরে অ্যালকোহলের চিহ্ন এবং ফুসফুসে জলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে বাথরুমের বাথটাবে ডুবে দুর্ঘটনাবশত শ্রীদেবীর মৃত্যু হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
যদিও কেরালার ডিজিপি অর্থাৎ ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (জেল) মনে করেন যে বাথটবে ডুবে মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক নয়। তিনি দাবি করেন যে আসলে শ্রীদেবীকে হত্যা করা হয়েছিল। এই মন্তব্যের সমর্থনে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি তাঁর মৃত বন্ধু ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড: উমাদাথানের কথা বলেন। উমাদাথানও মনে করতেন এটি হত্যাকান্ড হওয়া সম্ভব কারণ, তাঁর মতে, একজন মানুষ যতই মদ্যপ অবস্থায় থাকুক না কেন বাথটবের মাত্র এক ফুট গভীর জলে ডুবে মারা যাওয়া সম্ভব নয় যদি না কেউ জোর করে সেই জলের মধ্যে তার মাথা ডুবিয়ে দেয়৷
ডিজিপি এবং উমাদাথানের এই দাবী শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্যকে আরও জটিল করে তুলেছিল। দিল্লী পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এসিপি বেদ ভূষণের মতেও শ্রীদেবীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং তিনি আরও দাবী করেন যে, হয়তো-বা শ্রীদেবীর মৃত্যুতে দাউদ ইব্রাহিমেরও ভূমিকা থাকতে পারে। পাশাপাশি এও প্রশ্ন উঠতে পারে যে মৃত্যুর পর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর না দিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা পরে কেন পুলিশ ডাকা হয়! এমন সব প্রশ্ন বলিউডের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর মৃত্যুকে বিতর্কিত করে তোলে।
চিত্র-পরিচালক সুনীল সিং মনে করতেন শ্রীদেবীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তিনি প্রথমে দিল্লি হাইকোর্টে ও পরে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনও করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ওমানে শ্রীদেবীর নামে ২৪০ কোটি টাকার বীমা করা হয়েছিল আর সেই বীমার শর্ত ছিল তিনি আরব আমিরশাহীতে মারা গেলে তবেই সেই টাকা পাওয়া যাবে। বনি কাপুরের বেশ কিছু সিনেমা ভাল ফল না করায় তিনি নাকি আর্থিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই এই মৃত্যুতে বনি কাপুরের মোটিভ ছিল। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এই আবেদন নাকচ করে দিয়েছিল। তবে এই বীমা নিয়ে কাপুর পরিবার থেকে কোন রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এত সব জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বনি কাপুর নিজে শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্য নিয়ে নতুন এক তত্ত্ব সামনে আনেন। তিনি জানান দুবাই পুলিশের প্রায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার জিজ্ঞাসাবাদে সব বলেছিলেন বলেই চুপ করে ছিলেন। বনি কাপুর স্পষ্ট করে বলেন যে শ্রীদেবীর নিম্ন রক্তচাপ ছিল, তা সত্ত্বেও কঠোর ক্র্যাশ ডায়েট শুরু করেছিলেন এবং নুন খাওয়া কম করে দিয়েছিলেন, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তা করা মোটেই উচিত ছিল না তাঁর, ফলে তিনি নাকি বেশ কয়েকবার ব্ল্যাক আউট হয়ে গিয়েছেন। এমনকি ডায়েটের চক্করে অনেকসময় ক্ষুধার্ত অবস্থাতেও থাকতেন। বনি কাপুর জানান তিনি সবসময় শ্রীদেবীকে লবণ খেতে বলতেন এমনকি তাঁর স্যালাডেও বনি লবণ মিশিয়ে দিতেন। কিন্তু ডায়েট ছেড়ে দিতে নারাজ ছিলেন শ্রীদেবী। এই নিম্ন রক্তচাপ এবং নুন কম খাওয়ার ফলে ব্ল্যাক আউট হয়ে যাওয়াকেই মৃত্যুর জন্য দায়ী করতে চেয়েছেন বনি কাপুর। এই যে বেশ কয়েকবার ব্ল্যাক আউট হয়ে যাওয়ার তথ্যটি তার সমর্থনে বনি কাপুর জানান যে, শ্রীদেবীর মৃত্যুর পর বিখ্যাত অভিনেতা নাগার্জুন সমবেদনা জানাতে এসে নাকি জানিয়েছিলেন যে, এর আগেও তাঁর সঙ্গে সিনেমার সময় একবার ব্ল্যাক আউট হয়ে গিয়ে শ্রীদেবী বাথরুমে পড়ে দাঁত ভেঙেছিলেন৷
দুবাই পুলিশের তদন্তের পর এমনকি লাই ডিটেক্টর মেশিনে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর বনি কাপুরকে ক্লিনচিট দেওয়া হলেও এবং পরবর্তীতে বনি কাপুরেরই দেওয়া শ্রীদেবীর ডায়েট সংক্রান্ত উক্ত এইসব তথ্যের পাশেও হত্যার যে তত্ত্ব উঠে এসেছিল তাকে অনেকেই উপেক্ষা করতে নারাজ। ফলত শ্রীদেবী মৃত্যুরহস্যের কিনারা আজও নিশ্চিতভাবে করা সম্ভব হয়নি। বলিউডের প্রথম মহিলা সুপারস্টারের এমন আকস্মিক মৃত্যুর রহস্য যবনিকার আড়ালেই রয়ে গেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান