খেলা

স্টেফি গ্রাফ

স্টেফি গ্রাফ

স্টেফি গ্রাফ (Steffi Graf) একজন বিশ্বখ্যাত জার্মান মহিলা টেনিস খেলোয়াড়। ১৯৮৮ সালে প্রথম টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে চারটি গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম জিতে গোল্ডেন স্ল্যাম খেতাব অর্জন করেন এবং ঐ বছরই অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। ৭ বার উইম্বলডন, ৬ বার ফ্রেঞ্চ ওপেন, ৫ বার ইউএস ওপেন এবং ৪ বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে জয়লাভ করেন স্টেফি এবং তার ফলে সর্বকালের সেরা গ্র্যান্ডস্ল্যামজয়ী মহিলা টেনিস খেলোয়াড়দের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে জার্মানির একটি পেশাদার টুর্নামেন্টে যোগদানের মধ্য দিয়ে টেনিসের জগতে পদার্পণ করেন স্টেফি গ্রাফ। ১৫ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালে অলিম্পিকে সর্বকনিষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষতার পরিচয় রাখেন তিনি। ৩৭৭ সপ্তাহ ধরে উইমেন্স টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের সমীক্ষায় টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের ১ নং স্থানে থাকার রেকর্ড গড়েছেন স্টেফি গ্রাফ। ১০৭টি সিঙ্গেলস জিতে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা এবং ক্রিস এভার্টের পরেই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। গ্রাস কোর্ট হোক বা ক্লে কোর্ট কিংবা হার্ড কোর্ট সবরকম কোর্টেই স্বচ্ছন্দে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারতেন স্টেফি গ্রাফ।

১৯৬৯ সালের ১৪ জুন পশ্চিম জার্মানির ব্যাডেন উর্তেমবার্গের ম্যানহেম শহরে স্টেফি গ্রাফের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম স্টেফানি মারিয়া গ্রাফ। তাঁর বাবা পিটার গ্রাফ পেশায় ছিলেন গাড়ি ও বিমা বিক্রেতা। তাঁর মায়ের নাম ছিল হেইডি স্ক্যাল্ক। তাঁর যখন নয় বছর বয়স, সেই সময় তাঁর পরিবার নিকটবর্তী ব্রুহল শহরে চলে আসেন। স্টেফির একটি ছোট ভাই ছিল মাইকেল নামে। তাঁর বাবা পিটার গ্রাফ একজন টেনিস প্রশিক্ষকও ছিলেন যিনি প্রথম স্টেফিকে টেনিসের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই স্টেফিকে নিয়ে বাড়ির সামনের বাগানে কাঠের র‍্যাকেট চালানো শেখাতেন তিনি। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই কোর্টে টেনিস খেলা অভ্যাস করতে শুরু করেছিলেন স্টেফি আর পাঁচ বছর বয়সেই জীবনের প্রথম টেনিস টুর্নামেন্টে অংশ নেন তিনি। তারপর থেকেই নিয়মিত জুনিয়র টুর্নামেন্টগুলিতে পুরস্কার জিতে আসতেন স্টেফি। এমনকি ১৯৮২ সালে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও পুরস্কার জিতেছেন স্টেফি গ্রাফ। পরবর্তীকালে ২০০১ সালের ২২ অক্টোবর অপর আরেক বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় আন্দ্রে আগাসিকে বিবাহ করেন স্টেফি গ্রাফ। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তান জন্মায় যাদের নাম যথাক্রমে জ্যাডেন গিল এবং জ্যাজ এল।  

১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে জার্মানির ফিল্ডারস্ট্যাট শহরে প্রথম পেশাদারি টুর্নামেন্টে অংশ নেন স্টেফি। কিন্তু দুবার ইউএস ওপেন জয়ী টেনিস খেলোয়াড় ট্রেসি অস্টিনের কাছে প্রথম রাউন্ডেই পরাজিত হন তিনি। ১৩ বছর বয়সে ১৯৮৩ সালে পাকাপাকিভাবে পেশাদারি টেনিস খেলা শুরু করেন স্টেফি এবং সেই সময় বিশ্বের মধ্যে ১২৪তম স্থানে ছিলেন তিনি। পরবর্তী তিন বছরে কোনো ম্যাচ না জিতলেও ১৯৮৫ সালে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে তিনি ৬ নং স্থানে উন্নীত হন। ১৯৮৪ সালে উইম্বলডনে একটি সেন্টার কোর্ট ম্যাচের চতুর্থ রাউন্ডে ইউনাইটেড কিংডমের ডো জুরিকে পরাজিত করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন স্টেফি গ্রাফ। ১৯৮৪ সালে লস এঞ্জেলসে আয়োজিত অলিম্পিক গেমসে পশ্চিম জার্মানির পক্ষ থেকে টেনিস প্রদর্শনীমূলক প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেন তিনি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫ বছর। তাঁর বাবা পিটার গ্রাফ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে স্টেফির সময়সূচি বেঁধে দিতেন এবং যাতে তাঁর জীবনীশক্তি অটুট থাকে তাই খেলার সংখ্যা সীমিত রাখতেন। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে যাওয়াও বন্ধ করেছিলেন পিটার যাতে স্টেফির মনোযোগ নষ্ট না হয়ে যায়। প্রথমে বাবার কাছে এবং পরে প্রশিক্ষক পাভেল স্লোজিলের কাছে প্রত্যহ চার ঘন্টা করে টেনিস অভ্যাস করতে থাকেন তিনি। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে ক্রমেই মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা এবং ক্রিস এভার্টের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন স্টেফি গ্রাফ। সেই সময় এভার্টের কাছে ছয় বার এবং নাভ্রাতিলোভার কাছে তিন বার পরাজিত হন স্টেফি। ১৯৮৬ সালের ১৩ এপ্রিল প্রথমবারের মত স্টেফি গ্রাফ তাঁর ওমেন্স টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের টুর্নামেন্ট জেতেন। এই সময়েই দক্ষিণ ক্যারোলিনার হিলটন হেডের ম্যাচে প্রথমবার ক্রিস এভার্টকে পরাজিত করেন তিনি। এরপর অ্যামেলিয়া দ্বীপ, চার্লস্টন এবং বার্লিনে পরপর তিনটি ম্যাচে জয়লাভ করেন স্টেফি। কিন্তু অসুস্থতা আর পায়ের আঙুলের আঘাতের কারণে উইম্বলডনের ম্যাচ তিনি খেলতে পারেননি, পরে ইউএস ওপেন খেলার সময়ে যদিও পুনরায় সুস্থ হয়ে ওঠেন স্টেফি। সেই মরশুমে নাভ্রাতিলোভার কাছে দুবার পরাজিত হলেও টোকিও, জুরিখ এবং ব্রাইটনের তিনটি ম্যাচেই পরপর জয়লাভ করেন তিনি।

১৯৮৭ সালেই টেনিস খেলার কেরিয়ারের উন্নতি শুরু হয় স্টেফি গ্রাফের। মিয়ামির একটি টুর্নামেন্টে সেমি ফাইনালে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে এবং ফাইনালে ক্রিস এভার্টকে পরাজিত করে সকলের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। পরে ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালেও স্টেফি নাভ্রাতিলোভাকে পরাজিত করেন। ১৯৮৭ সালের ১৭ আগস্ট লস এঞ্জেলসের ভার্জিনিয়া স্লিমসে ক্রিস এভার্টকে সরাসরি ফাইনালে পরাজিত করার পরে স্টেফি গ্রাফ প্রথমবার বিশ্বের ১ নং টেনিস খেলোয়াড়ের মর্যাদায় উন্নীত হন এবং মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকেও ছাপিয়ে যান তিনি। নাভ্রাতিলোভা কিংবা এভার্টকে বাদ দিয়ে ১৯৮০ সালে ট্রেসি অস্টিনের পর থেকে একমাত্র স্টেফি গ্রাফই একমাত্র এই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন বহু বছর। ১৯৮৮ সালে স্টেফি প্রথম এক বছরে পরপর চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম প্রতিযোগিতা জিতে রেকর্ড তৈরি করেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে ঐ বছরই সিওলে আয়োজিত অলিম্পিক গেমসেও টেনিসে স্বর্ণপদক জেতেন স্টেফি। পরপর চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে গোল্ডেন স্ল্যাম খেতাব অর্জন করেন তিনি। ঐ বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ক্রিস ইভার্টকে, ফ্রেঞ্চ ওপেনে নাতাশা জেভেরাকে, উইম্বলডন ওপেনে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে পরাজিত করে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন তিনি। এছাড়া ইউএস ওপেনে তিনি সাবাটিনিকে পরাজিত করেন। সিওলের অলিম্পিক গেমসেও সাবাটিনিকে ৬-৩, ৬-৩ স্কোরে পরাজিত করেছিলেন স্টেফি গ্রাফ। ঐ বছরই আবার সাবাটিনির সঙ্গে একত্রে উইম্বলডন ডাবলস ম্যাচে জয়লাভ করে একমাত্র ডাবলস গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন স্টেফি গ্রাফ। এর পরের বছরেও হেলেনা সুকভকে পরাজিত করেছিলেন তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। এরপর একে একে ওয়াশিংটন ডিসি, সান এন্টোনিও, টেক্সাস, বোকা র‍্যাটন, ফ্লোরিডা, হিল্টন হেড, দক্ষিণ ক্যারোলিনা ইত্যাদি ম্যাচে জয়লাভ করেন তিনি। ওয়াশিংটনের ম্যাচে প্রথমবার ২০ পয়েন্ট স্কোর করে রেকর্ড গড়েন স্টেফি। ১৯৮৯ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনে পরাজিত হলেও এরপরে উইম্বলডন ও ইউএস ওপেনে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে পরাজিত করে মোট তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন তিনি। কিন্তু ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে যেখানে মেরি জো ফার্নান্ডেজকে পরাজিত করেন স্টেফি, অন্যদিকে উইম্বলডন ও ইউএস ওপেনে পরাজিত হন তিনি। মনিকা সেলেসের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি তাঁর গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেতাবই কেবল হারান তাই নয়, উপরন্তু বিশ্বের ১ নং স্থান থেকেও সরে যান তিনি। একের পর এক ম্যাচে হারতে থাকেন স্টেফি গ্রাফ।  

কিন্তু ১৯৯২ সালে আবার ঘুরে দাঁড়ান তিনি। উইম্বলডন ওপেনে মনিকা সেলেসকে পরাজিত করে আবার নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন স্টেফি। ঐ বছর অলিম্পিকে তিনি রৌপ্য পদক জেতেন। ১৯৯৩ সালে তিনি আবার তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন। কিন্তু আঘাত পাওয়ার কারণে বহুদিন যাবৎ খেলতে পারেননি তিনি এবং পরে আবার খেলা শুরু করলেও নিজের ফর্মে ফিরে আসতে অনেকটা সময় লেগেছে তাঁর। ১৯৯৯ সালে তিনি যখন খেলা থেকে অবসর নেন, সেই সময় টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের ৩ নং স্থানে ছিলেন তিনি। তারপরেও বহু প্রদর্শনীমূলক ম্যাচে অংশ নিয়েছেন স্টেফি গ্রাফ।

স্টেফি গ্রাফ তাঁর সম্পূর্ণ ক্রীড়াজীবনে মোট আটবার ‘প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ খেতাব পেয়েছেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে মোট ২২টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম সিঙ্গেলস জয়ের শিরোপা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ১৯৯৮ সালে কোরেল উইমেন্স টেনিস অ্যাসোসিয়েশন (WTA) তাঁকে ‘মোস্ট ইন্টারেস্টিং প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ খেতাবে ভূষিত করেছে। ২০০২ সালে জার্মান ফেডেরাল প্রদেশ উর্তেমবার্গের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ‘মেডেল অফ অনার’ অর্জন করেন স্টেফি গ্রাফ। ২০০৪ সালে তাঁকে ‘টেনিস হল অফ ফেম’ সম্মানে ভূষিত হন।

সম্প্রতি ২০২০ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার একটি সমীক্ষায় বিগত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সেরা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে পত্রিকার পাঠকরা নির্বাচন করেছিলেন স্টেফি গ্রাফকে। খেলা থেকে অবসর নিলেও আজও তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি।           


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ১৪ জুন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়