খেলা

স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস

গ্রিসের প্রথম ম্যারাথন দৌড়বিদ হিসেবে বিখ্যাত স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস (Stylianos Kyriakides) ১৯৪৬ সালের বস্টনে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। তবে এ কারণে তিনি বিখ্যাত নয় ইতিহাসে, অলিম্পিকে ম্যারাথন দৌড়েছিলেন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষ পীড়িত গ্রিসের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য। এছাড়াও গ্রিসের অ্যাথলিটদের উপযুক্ত সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থসংগ্রহের লক্ষ্যেও তিনি বস্টনে ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্যভাবে তিনিই প্রথম অ-আমেরিকান অ্যাথলিট যিনি বস্টন অলিম্পিকে যোগ দেন এবং পদক জয় করেন। এমনকি আমেরিকান কমিক বইতেও প্রথম অলিম্পিকজয়ী ম্যারথন দৌড়বিদ হিসেবে তাঁরই ছবি ছাপা হয়। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ছয় মাস যাবৎ অলিম্পিকে অন্য কোনো গ্রিসের অ্যাথলিট তাঁর রেকর্ড ভাঙতে পারেননি। মোট বারোবার গ্রিসের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৫০০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেছেন স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস।

১৯১০ সালের ৪ মে সাইপ্রাস দ্বীপের অন্তর্গত পার্বত্য গ্রাম স্ট্যাটোসে স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ফাদার জন এবং মা এলিনি ইলিয়া উভয়েই ছিলেন কৃষক। তাঁদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে স্টাইলিয়ানস ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। স্টাইলিয়ানসের চার ভাইয়ের নাম যথাক্রমে – ক্রিসোটোমোস, দিমিত্রিস, ইলিয়াস এবং ক্যারিথিয়া। পাঁচ বছর বয়সে মাঠে খেলতে গিয়ে পড়ে যাওয়ায় মাথা ফেটে যায় তাঁর এবং সেই দাগ আজীবন তাঁর একটি চিহ্ন হিসেবে রয়ে যায় কপালে। কিশোর বয়স থেকেই পরিবারের জন্য টুকটাক কাজ করতে হতো তাঁকে এবং বাবার সঙ্গে অন্য ভাইদের মতো স্টাইলিয়ানসও ক্তিমায় যেতেন কাজের সূত্রে। সমস্ত গ্রামের চারধারে দৌড়ে বেড়াতে আর খেলাধূলা করতে ভালোবাসতেন কিশোর স্টাইলিয়ানস। পরবর্তীকালে লিমাসোলে চলে যাওয়ার পরে সাঁতারের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। তাঁর বাবার পোষা ছাগল, মুরগি, খরগোশের পরিচর্যা করতেন স্টাইলিয়ানস এবং মাঠে যখন তাঁর ভাইয়েরা কাজ করতো তিনি বাড়ি থেকে দুই-তিন কিমি পথ হেঁটে টিফিন নিয়ে আসতেন। মাত্র দুই বছর বয়সে ঐ গ্রামেরই এক জ্যোতিষী স্টাইলিয়ানসের হাত দেখে তাঁর মাকে বলেছিলেন যে তিনি বড়ো হয়ে অনেক বড়ো কোনো কৃতিত্বের ছাপ রাখবেন পৃথিবীতে।

গ্রামের গ্রামার স্কুলে স্টাইলিয়ানসের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সেই স্কুলে পড়েন তিনি। তারপর আর পড়াশোনা করা হয়নি তাঁর।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


চোদ্দো বছর বয়স থেকেই পরিবারের অন্নসংস্থানের লক্ষ্যে তাঁর বাবা স্টাইলিয়ানসকে লিমাসোলে কাজ করতে পাঠায় আর সেখানেই আঙ্কলস সক্রেটিস ক্যারালাম্বাস বেকারিতে যোগ দিয়ে স্টাইলিয়ানস তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বেকারির সামনে দাঁড়িয়ে হাতে করে কেক বানানোর কাজ বেশিদিন তিনি করতে পারেননি। ১৯২৬ সালের শেষ দিকে বেকারির চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় বাসন পরিস্কার করার কাজে যোগ দেন তিনি। কিন্তু এখানে অর্থের পরিমাণ এতই কম ছিল যে স্টাইলিয়ানস বাধ্য হয়ে কন্টোপোলাস মিনি মার্কেটে ডেলিভারি বয়ের কাজ নেন। এর মাধ্যমেই তাঁর পরিচয় ঘটে ড. শেভারটনের সঙ্গে যিনি একবার অসুস্থ স্টাইলিয়ানসকে পরীক্ষা করে বলেন যে তাঁর কম হৃদস্পন্দনের জন্য তিনি খুব ভালো দীর্ঘ দূরত্ব দৌড়োতে পারবেন। আর তার কথা মতো রাত্রে লিমাসোল সমুদ্রের ধারে তিনি দৌড়োতে শুরু করেন। ড. শেভারটনের বাড়িতেও তিনি বেশ কিছুদিন ছিলেন যার ফলে ইংরেজি ভাষাটিও খুব সহজেই তিনি আয়ত্ত করে ফেলেন। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে লিমাসোলে মিস্টার গ্রিনের বাড়িতে কাজ করার সুবাদে মিস্টার গ্রিন তাঁকে দৌড়ের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন রাত্রিবেলা করে। ঐ বছরই প্যান সাইপ্রিয়ান গেমস এর দিনক্ষণ ঘোষিত হয়। সেই খবর পেয়ে অলিম্পিয়া ক্লাবে গেলে সেখানকার প্রশিক্ষক মি. অ্যাঞ্জেলিনিডস এবং মি. ট্রাভাসের কাছে দিন রাত ধরে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস। আগামী প্যান সাইপ্রিয়ান প্রতিযোগিতায় তিনি অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার মাত্র কুড়ি দিন আগেই পায়ে চোট পান তিনি। হাল ছাড়লেন না কাইরিয়াকাইডস। অলিম্পিয়া ক্লাবের কিছু আভ্যন্তরীণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে মূল খেলায় অংশ নিতে সমর্থ হন তিনি। ফামাগুস্তা নামক জায়গায় অনুষ্ঠিত এই খেলায় পাঁচ হাজার মিটার এবং দশ হাজার মিটার দৌড় যথাক্রমে সতেরো মিনিট আটাশ সেকেণ্ড এবং সাঁইত্রিশ মিনিট ছাব্বিশ সেকেণ্ডে শেষ করে জয়লাভ করেন কাইরিয়াকাইডস। ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রিসে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ এবং প্রি-বলকান দৌড়ে অংশ নিয়ে স্টাইলিয়ানস দশ হাজার মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হন। তাঁর এই রেকর্ড ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট চৌত্রিশ বছর ছয় মাস অন্য কোনো দৌড়বিদ ভাঙতে পারেননি। সেই থেকেই ক্রীড়া জগতে তাঁর নাম পরিচিত হতে শুরু করে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মতে এটাই এখনো পর্যন্ত সবথেকে দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে একজন মানুষের করা সর্বোচ্চ রেকর্ড।

এরপর গ্রিসে ফিরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জার্মানদের আক্রমণের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত গ্রিক রেসিস্ট্যান্স হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। গ্রিসের গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৩৬ সাল নাগাদ তিনি বস্টনে অলিম্পিকে যোগদান করতে আসেন। জানা যায় এই বস্টন ম্যারাথনে যোগদানের জন্য স্টাইলিয়ানসকে এক টিকিট কিনতে তাঁর আসবাব বিক্রি করতে হয়েছিল। জন কেলির সঙ্গে দৌড়োলেও শেষে দু ঘন্টা উনত্রিশ মিনিট সাতাশ সেকেণ্ডে তিনি ম্যারাথন দৌড়টি শেষ করেন যা ১৯৪৬ সালের রেকর্ড ছিল এবং তাঁর নিজের করা পূর্বতন রেকর্ডকেও ভেঙে ফেলেন স্টাইলিয়ানস পনেরো মিনিটের ব্যবধানে। শোনা যায় দৌড় শেষের আগে পাশের গ্যালারি থেকে একজন বৃদ্ধ মানুষ তাঁর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে ওঠেন ‘গ্রিসের জন্য! তোমার সন্তানের জন্য! জিতে যাও’, সেই চিৎকার যেন অনুপ্রেরণা হয়ে দৌড় সবার আগে শেষ করতে সাহায্য করেছিল স্টাইলিয়ানসকে। এই দৌড় আসলে তিনি দৌড়েছিলেন গ্রিসের দুঃস্থ মানুষদের জামা-কাপড়, ওষুধপত্র এবং অ্যাথলিটদের প্রয়োজনীয় খেলার সরঞ্জাম কিনে দেওয়ার জন্য। আর সেই মতো আমেরিকানদের সহায়তায় স্টাইলিয়ানস আমেরিকা থেকে প্রায় পঁচিশ হাজার টন ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জাম এবং নগদ আড়াই লক্ষ ডলার টাকা নিয়ে গ্রিসে ফিরে আসেন। জানা যায় যে দুটি জাহাজে করে এইসব সরঞ্জাম আমেরিকানরা পাঠিয়েছিল আর এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্টাইলিয়ানসকে ‘প্যাকেজ কাইরিয়াকাইডস’ নামে অভিহিত করা হয়। এথেন্সের রাজপথে স্টাইলিয়ানসকে অভ্যর্ত্থনা জানানোর জন্য প্রায় দশ লক্ষ লোক জড়ো হয়েছিল দেশের নানা প্রান্ত থেকে। জিউসের মন্দিরে তাঁকে ঘিরে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য উৎসব। ১৯৪৮ সালের লণ্ডন অলিম্পিকে ম্যারাথন দৌড়ে তিনি অষ্টাদশতম স্থান অধিকার করেন। গ্রিক রেসিস্ট্যান্স হিসেবে নিযুক্ত থাকাকালীন তাঁকে আরো ৪৯ জন সহ জার্মান পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু জবানবন্দি নেওয়ার সময় তাঁর কাছে বার্লিন অলিম্পিকের টিকিট এবং পরিচয়পত্র দেখতে পেয়ে স্টাইলিয়ানসকে মুক্তি দেন তারা। সেসময় গ্রিক রেসিস্ট্যান্সের হাতে অনেকজন জার্মান সৈন্য নিহত হয়েছিল। এর তদন্ত শুরু হলেও স্টাইলিয়ানসের বাড়িতে জার্মান সৈন্যদের তদন্ত করা থেকে বিরত থাকতে বলেন জার্মান পুলিশ অফিসার। স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস ছিলেন প্রথম অ-আমেরিকান যিনি বস্টনের ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন এবং একইসঙ্গে আমেরিকান কমিক বইতে তাঁরই প্রথম ছবি ছাপা হয় ক্রীড়া জগতের খ্যাতনামা ব্যক্তি হিসেবে।

গ্রিসের রাজার পক্ষ থেকে গ্র্যাণ্ড ক্রস অফ দ্য ফিনিক্স সম্মানে ভূষিত হন স্টাইলিয়ানস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন ম্যাসাচুসেটস-এর গভর্নর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক কমিটির সভাপতি এবং অন্যান্য মন্ত্রক থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। বস্টনের ম্যারাথনে জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ম্যারাথনে অংশ নেওয়ায় সেখানকার স্পোর্টস মিউজিয়ামে তাঁকে নিয়ে একটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয় ‘স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস – রানিং ফর ম্যানকাইণ্ড’ নামে। ২০০৪ সালে ‘অ্যাথলেটিক ফেডারেশন অফ হপকিন্টন’ স্টাইলিয়ানসকে পুরস্কৃত করার পরে বস্টন ম্যারাথন শুরুর স্থানে তাঁর একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করে যা ২০০৬ সালে উদ্বোধন করা হয়। এই মূর্তির নাম দেওয়া হয় ‘দ্য স্পিরিট অফ ম্যারাথন’ যার অনুকরণে একই মূর্তি গ্রিসের স্পোর্টস মিউনিসিপ্যালিটির সামনে বসানো হয়েছে। মোট চোদ্দোবার প্যান সাইপ্রিয়ান গেমসে এবং মোট এগারো বার গ্রিসের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে জয়লাভ করেছেন স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডস। বলকান গেমসের মোট ছয়টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ১৯৩৪ সালে জাগ্রিবে তিনি প্রথম স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯৮৭ সালে এথেন্সে স্টাইলিয়ানস কাইরিয়াকাইডসের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য