ইতিহাস

যোগেশচন্দ্র ঘোষ

যোগেশচন্দ্র ঘোষ (Jogesh Chandra Ghosh) একজন বাঙালি আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ যিনি ব্রিটিশ ভারতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার জনক ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সাধনা ঔষধালয়’-অবিভক্ত ভারতের প্রথম আয়ুর্বেদ ওষুধের দোকান। শুধু মাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন কিংবদন্তি হিসেবেই নয় একজন মহান দেশপ্রেমিক হিসেবেও দেশের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগ অনস্বীকার্য।          

১৮৮৭ সালে অধুনা বাংলাদেশের শরিয়তপুর জেলার গোঁসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে যোগেশ চন্দ্র ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। তাঁর মাতৃ পরিচয় সেভাবে জানা যায় না। পরবর্তীকালে যোগেশচন্দ্র ঘোষের বিবাহ হয়েছিল কিরণবালার সাথে। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে দুই কন্যা ও এক পুত্র। তাঁর এক পুত্র নরেশচন্দ্র ঘোষ পরবর্তীকালে এম.বি.বি.এস ডাক্তার হয়েছিলেন।          

গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হলেও যোগেশচন্দ্রের মেধায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর বাবা তাঁকে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা শহরের জুবিলী স্কুলে দ্রুত ভর্তি করেন। ১৯০২ সালে ১৫ বছর বয়সে জুবিলী স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগেশচন্দ্র ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। স্বদেশীকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি এ সময়ে তিনি আগ্রহী হয়ে পড়লেও সরাসরি কোনো বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা তা জানা যায় নি। ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করে পশ্চিমবঙ্গে এসে কুচবিহার কলেজে ভর্তি হন যোগেশচন্দ্র। ১৯০৬ সালে সেখান থেকে বি.এ পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন তিনি আর সেখানেই শিক্ষাগুরু হিসেবে তাঁর সাথে প্রথম দেখা হয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের। স্বদেশ প্রেম ও কর্মে দেশীয় সম্পদকে ব্যবহার করে নিজেকে নিয়োজিত করতে প্রফুল্লচন্দ্রই উৎসাহিত করেন যোগেশচন্দ্রকে।এরপর ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ড পাড়ি দেন। ইংল্যান্ড থেকে এফ.সি.এস ডিগ্রী পেয়ে যোগেশচন্দ্র এম.সি.এস পড়ার জন্য আমেরিকা চলে যান। সেখানেও সম্মানের সঙ্গে এম.সি.এস ডিগ্রী প্রাপ্ত হন তিনি।

পড়াশোনায় মেধার যে পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন তার ফলে বিদেশে যে কোনো উপযুক্ত চাকরি নিয়ে তাঁর সুখে জীবনযাপনের সুযোগ থাকলেও ১৯০৮ সালে দেশে ফিরেই যোগেশচন্দ্র ঘোষ ভাগলপুর কলেজে একটানা চার বছর রসায়নশাস্ত্র বিভাগে গর্বের সাথে অধ্যাপকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি পুনরায় ঢাকার জগন্নাথ কলেজেই ফিরে এসে সেখানে অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হয়ে নিজ কর্তব্য পালন করেন। ঢাকায় আসার বছর দুই পর ১৯১৪ সালে যোগেশচন্দ্র তৎকালীন বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরির প্রথম কারখানা ‘সাধনা ঔষধালয়’ স্থাপন করেন। শুধু তাই-ই নয়, শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটি’ এবং ‘আমেরিকা কেমিক্যাল সোসাইটি’- র সদস্যপদ গ্রহণ করে আমৃত্যু তিনি সংগঠন দুটির ফেলো ছিলেন।

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করার পর আরো দু’বছর সেই কলেজেরই অধ্যক্ষ হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে বাংলাদেশের বহু হিন্দু পরিবার নিজের বসত ভিটে ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে এলেও যোগেশচন্দ্র নিজের দেশেই থেকে যান। ১৯৪৮ সালে চাকরি ক্ষেত্র থেকে অবসর গ্রহণ করার পর আয়ুর্বেদশাস্ত্র চর্চা তাঁর কাছে আগ্রহ থেকে নেশায় পরিনত হয়। ১৯৬৪ সালে যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শহর হিসেবে ঢাকা শহরের নাম সর্বাগ্রে তখনও দেশে থেকেই নির্দ্বিধায় সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন তিনি। সেই পরিস্থিতিতেই ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সাধনা ঔষধালয়’ গোটা ভারতবর্ষে বিশিষ্ট্য আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়। আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগব্যাধির উপশম নিয়ে যোগেশচন্দ্র ঘোষের লেখা বেশ কিছু বইও আছে যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য — ‘অগ্নিমান্দ্য ও কোষ্ঠবদ্ধতা’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গৃহ-চিকিৎসা’, ‘চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু – কর্ণ – নাসিকা ও মুখরোগ চিকিৎসা’, ‘আমরা কোনপথে’, ‘’আয়ুর্বেদ ইতিহাস’, ‘Whither Bound Are We’ এবং ‘Home Treatment’ ইত্যাদি।         

জীবনের দীর্ঘ ছ’টি বছর আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করে ছিলেন যোগেশচন্দ্র। জনশ্রুতি আছে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘সাধনা ঔষধালয়’- এর ওষুধ সেবন করেছেন। এভাবেই যোগেশচন্দ্রের স্বপ্ন-সাধনা থেকে প্রতিষ্ঠিত প্রথম আয়ুর্বেদ ওষুধ প্রতিষ্ঠানটির খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম অর্জন করে। যোগেশচন্দ্র নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রতি দেশের মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন – “ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে তখন তাহার স্বপ্ন , তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে , তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাঁহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেনো ?”

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর একমাত্র সাধনা স্থল ছিল ‘সাধনা ঔষধালয়’। দেশভাগের পর ‘সাধনা ঔষধালয়’- এর দায়িত্বভারের বেশ কিছুটা গ্রহণ করেছিলেন তাঁর সুযোগ্য এম.বি.বি.এস পুত্র নরেশচন্দ্র ঘোষ।          

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগেশচন্দ্রের অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন ভারতে চলে এলেও যোগেশচন্দ্র তাঁর দুই দারোয়ান সুরুজ মিয়া এবং রামপালের সাথে বাংলাদেশেই রয়ে যান শেষ অবধি। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনা ‘সাধনা ঔষধালয়’ আক্রমণ করলে প্রতি আক্রমণ করেন যোগেশচন্দ্রের বিশ্বস্ত দারোয়ান সুরুজ মিয়া। সামান্য দারোয়ান হলেও অস্ত্রচালনায় তাঁর পারদর্শিতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় দলে ভারী পাকসেনারা। তাঁরা তখনকার মতো বিদায় নিলে যোগেশচন্দ্রের কাছে গিয়ে অনুনয় করে তাঁকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেন দারোয়ান সুরুজ মিয়া। কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অটল যোগেশচন্দ্র ঠিকই করে নিয়েছিলেন মরতে হলে তিনি দেশের মাটিতেই মরবেন।

পরের দিন সকালেই অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকাল সাতটায় পাকসেনাদের তিন গাড়ি ভর্তি পাক সেনা ‘সাধনা ঔষধালয়’- এ প্রবেশ করে সমস্ত নিরাপত্তারক্ষীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে যোগেশচন্দ্রকে নিয়ে যায় ওপরের ঘরে। এদিকে নিচে লাইনে দাঁড়ানো কর্মচারী ও দ্বাররক্ষীরা সেই সুযোগে প্রাণ বাঁচাতে সবাই পালিয়ে যায়। ওপরে তখন পাকসেনারা নির্দয়ভাবে উল্লাসধ্বনী সহযোগে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যোগেশহত্যা লীলায় মেতে উঠেছে। অনেকক্ষণ পর কারখানার কর্মচারীরা ফিরে এসে দেখলো রান্নাঘরের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ। কয়েকটি বুলেট তাঁর পিঠের বামদিকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। পাঁজরে বেয়নেটের আঘাতের কালশিটে দাগ। ঘরের গোটা মেঝেতে রক্তের ধারা অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। তাঁকে হত্যার পর সমস্ত টাকা-পয়সাও লুট করে নিয়ে গেছে পাকসেনারা। উপমহাদেশে আয়ুর্বেদী চিকিৎসার পথিকৃৎ যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল অত্যন্ত নির্মমভাবে পাকসেনাদের হাতে নিহত হন। 

আয়ুর্বেদ চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়।        

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন