সববাংলায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাহিত্যের অঙ্গনে নারীর নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই বহুদিনের। রাসসুন্দরী দাসী থেকে শুরু করে আশাপূর্ণা দেবী, তালিকাটা ছোটো নয় মোটে। সুচিত্রা ভট্টাচার্য (Suchitra Bhattacharya) বাংলা সাহিত্যে নারীর নিজস্ব পরিচয় আদায় করে নেওয়া জেদি লেখিকা। শুধু ‘মেয়ে’ বলেই তিনি ‘মেয়েদের লেখক’ এই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। অবহেলিত নারীর বয়ান যেমন উঠে এসেছে তাঁর লেখায়, তেমনি সমকালীন সমাজ-রাজনীতির ছাপও পড়েছে স্বাভাবিকভাবেই। তাই কোনোভাবেই নিজেকে ‘নারীবাদী’ বলতে না চাওয়া খ্যাতনামা এই সাহিত্যিকের লেখাগুলি আজও বেস্টসেলার।

১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি ভারতে বিহারের ভাগলপুরে মামারবাড়িতে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। যদিও তাঁদের আসল বাড়ি ছিল মূর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। তবে পড়াশোনা ও চাকরিসূত্রে তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কেটেছে কলকাতায়। তাঁর বাবার নাম ধী শঙ্কর ভট্টাচার্য এবং মায়ের নাম প্রীতিলতা ভট্টাচার্য। তাঁর বাবা ছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের বিখ্যাত ফুটবলার এবং একইসঙ্গে কলকাতার জেসপ কারখানার জনসংযোগ আধিকারিক। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের জ্যাঠামশাই করুণা শঙ্কর ভট্টাচার্যও ছিলেন ফুটবলার। মোহনবাগান ফুটবল দল এমনকি ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সুচিত্রা ভট্টাচার্যরা মোট পাঁচ ভাই-বোন ছিলেন – দুই বোন ও তিন ভাই। সুচিত্রা ছিলেন সবার বড়ো। তাঁর বোনের নাম সুমিত্রা ভট্টাচার্য আর ভাইয়েরা হলেন দেবকুমার, আশীষ এবং মিলন। ছোটোবেলায় নাচ শিখতেন তিনি। ‘দক্ষিণী’-তে ওড়িশি নাচের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে পাড়াঘরে কোনো অনুষ্ঠান পড়লেই নাচ শেখানোর দায়িত্ব পড়তো তার উপর। ‘অনামী সংঘ’ নামে পাড়ার বালক-বালিকাদের নিয়ে একটি ক্লাব চালু করেন সুচিত্রা ঐ ছোটো বয়সেই। ছয় বছর বয়সে তপন সিন্‌হা পরিচালিত বিখ্যাত ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্রে ছোট্ট মিনির বন্ধুর চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। তারপর উত্তম-সুচিত্রা জুটির আরেক জনপ্রিয় ছবি ‘হারানো সুর’-এও সীতাহরণ পালার অভিনয়ে ছোটো বয়সের সুচিত্রাকে আমরা দেখতে পাবো। যদিও এই তথ্য জানা যায় তাঁর সহোদরা-কন্যা মহাশ্বেতা ভট্টাচার্যের কাছে। কলকাতায় ঢাকুরিয়া অঞ্চলেই তিনি আমৃত্যু থেকেছেন।

 ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলে তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। সেখানেই স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রথম ছড়া বেরোয় ‘চড়ুই’। তারপর সেখান থেকে রসায়নে অনার্স নিয়ে প্রথমে ভর্তি হন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। কিন্তু কলেজে পড়াকালীন বিবাহ এবং সন্তান হওয়ায় বিরতির ফলে কলেজ ছাড়তে হয়। পরে বাংলা নিয়ে যোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হন সুচিত্রা। সেই কলেজ থেকেই স্নাতক হন তিনি। কলেজে পড়াকালীনই মাতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি কলেজে ক্লাস চলাকালীন ব্যাগ থেকে বই-খাতার সঙ্গে সন্তানের মোজা কিংবা ফিডিং বোতলও বেরিয়ে আসতে দেখেছেন তাঁর সহপাঠিনীরা।

 ছোটোখাটো নানাবিধ বেসরকারি অফিসে চাকরির মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। বিনি কোম্পানির এজেন্টের অফিসে টাইপিস্ট কাম টেলিফোন অপারেটরের চাকরিতে প্রথম যোগ দেন তিনি। সেখান থেকে হোটেল কেনিলওয়ার্থে একই পদের চাকরি এবং পরে সিনক্লেয়ার্স গ্রুপের ‘ফ্রেট অ্যাণ্ড কার্গো কোম্পানি’তে (Fret & Cargo Co.) জুনিয়ার অফিসার পদে বহাল হন। একুশ বছর বয়স থেকে চাকরি করা শুরু তাঁর। কিছুদিন পরে কলকাতা বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি পান তিনি। সেই অফিসেই ‘সাজাহান’ নাটকে গীতা দে-র পরিচালনায় ‘পিয়ারিবাঈ’-এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তারপর ১৯৭৯ সালে ২৬-২৭ বছর বয়সে ডব্লিউ.বি.সি.এস (WBCS) পরীক্ষা দিয়ে প্রথমে ‘কমার্স অ্যাণ্ড ইণ্ডাস্ট্রি’ বিভাগে গেজেটেড অফিসার হিসেবে এবং পরে ‘ওজন ও পরিমাপ’ (Weights and Measures) দপ্তরে চাকরি পান সুচিত্রা। প্রথম পোস্টিং হয় ব্যারাকপুরে। কাঁচরাপাড়া অঞ্চলে তেলের ট্যাঙ্কার বাজেয়াপ্ত করা, জাল বাটখারা-চক্র ধরাইয় গুণ্ডাদের হুমকি এমনকি বে-আইনি লাইসেন্স দিতে না চাওয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্যিক সুচিত্রার নির্ভীক এবং ঋজু চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। এই দপ্তর থেকেই ২০০৪ সালে তিনি স্বেচ্ছা অবসর নেন পূর্ণসময়ের লেখিকা হবেন বলে। সাহিত্যসাধনাই যে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য জীবনের। অবসরের সময় তিনি সহযোগী নিয়ন্ত্রক (Assistant Controller) এর পদে বহাল ছিলেন।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের পরিচিতি তাঁর সাহিত্য রচনার মাধ্যমে। চাকরির অবসরে গল্প লিখতে লিখতেই তাঁর বড়ো হওয়া। তবে আশাপূর্ণা দেবীকে যেমন নিন্দুকেরা কটাক্ষ করতেন ‘কিচেন রাইটার’ বা রান্নাঘরের লেখিকা বলে তেমন দুর্ভাগ্য সুচিত্রার হয়নি। জীবনের প্রথম পর্বে চাকরি, সংসার, সন্তান সামলে সাতাশ বছর বয়সে লেখালিখির দিকে ঝোঁক দেন তিনি। আত্মীয় প্রেমেন মামার প্রবল চাপে প্রথম একটি গল্প লেখেন সুচিত্রা।  ১৯৯২ সালে প্রথম শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় তিনি প্রথম একটি উপন্যাস লেখেন ‘কাচের দেওয়াল’। তারপর থেকেই নিয়মিত লেখালিখি শুরু হয়। লিট্‌ল ম্যাগাজিনে গল্প-উপন্যাস লিখলেও বহুল প্রচারিত এবং বাংলার প্রথম সারির জনপ্রিয় পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশ পেতেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাবের পথ সুগম ও সুদৃঢ় হল। পরের বছর ১৯৯৩-তে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশ পায় ‘আনন্দ’ পাবলিশার্স থেকে। মূলত বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকের শেষ দিক থেকে তিনি ছোটোগল্প এবং আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। সমকালীন সময় সমাজ তাঁর উপন্যাসে-গল্পে ছায়া ফেলে। মধ্যবিত্তদের সম্পর্কের টানাপোড়েন, বদলে যাওয়া নীতিবোধ, নৈতিক অবক্ষয় ছাড়াও নারীর দুঃখ-যন্ত্রণা তাঁর লেখার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র রমাপদ চৌধুরী, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক বিমল কর কিংবা ‘দেশ’ পত্রিকার অফিসে সুনীল গাঙ্গুলির সঙ্গে সুচিত্রার পরিচয় গড়ে ওঠে। দক্ষিণ কলকাতার রাধানাথ মণ্ডলের ‘গল্পচক্র’ আড্ডায় শেখর বসু, রমানাথ রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত প্রমুখদের সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা তৈরি হয়। খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যাবার এক অমোঘ শক্তি ছিল সুচিত্রার। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ‘দেশ’ পত্রিকায় সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘কাছের মানুষ’ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিশেষ স্থান সূচিত হয়ে যায়। নব্বইয়ের দশক থেকে সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘উত্তরপ্রবাহ’ ১৯৭৮ সালে ‘সিনেমাজগত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘যখন যুদ্ধ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশ পেলেও জনপ্রিয় বহুলপ্রচারিত পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘কাঁচের দেওয়াল’। ৬৫ বছরের জীবনে ২০টির বেশি গল্প আর কমবেশি ৫০টির মতো উপন্যাস লিখেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। শেষজীবনে ‘মিতিনমাসি’ নামে একটি গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করে তিনি প্রায় ২০টি গোয়েন্দাকাহিনি লিখেছেন। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘যখন যুদ্ধ’, ‘ভাঙনকাল’, ‘অদ্ভুত আঁধার এক’, ‘দহন’, ‘গভীর অসুখ’, ‘পরবাস’, ‘অলীক সুখ’, ‘জলছবি’, ‘আঁধারবেলা’ ইত্যাদি উপন্যাসে ভোগবাদী সমাজের অবক্ষয়, ছাত্র রাজনীতির কদর্যরূপ, কৃষি শিল্পের বিবাদের ছবি স্পষ্ট। আবার নাগরিক মানুষের দাম্পত্য সমস্যা বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর লেখা ‘কাচের দেওয়াল’, ‘হেমন্তের পাখি’, ‘কাছের মানুষ’, ‘নীলঘূর্ণি’ , ‘সহেলি’, ‘আলোছায়া’, ‘ভাঙা আয়না’, ‘রঙ বদলায়’, ‘শূন্য থেকে শূন্য’, ‘অর্ধেক আকাশ’, ‘ঠিকানা নেই’ ইত্যাদি উপন্যাসে। বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পর্কের নানা জটিলতা কাহিনিগুলিতে দানা বেঁধেছে। একজন নারী হয়ে নারীর অনুভবের মাধ্যমে নারীর পরিসরকে উপন্যাসে ব্যক্ত করেছেন সুচিত্রা। ‘আমি রাইকিশোরী’, ‘দহন’, ‘মন্থন’, ‘শ্যামলী’, ‘রঙিন পৃথিবী’, ‘রূপকথা নয়’, ‘অর্ধেক আকাশ’ ইত্যাদি উপন্যাসে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর শোষণ-বঞ্চনা ও অত্যাচারের পাশাপাশি নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইকেও প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি।

সাহিত্যসাধনার সম্মান হিসেবে আমৃত্যু বহু পুরস্কার পেয়েছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য । ১৯৯৬ সালে ব্যাঙ্গালোরে ‘নঞ্জাগুড়ু থিরুমালাম্বা জাতীয় পুরস্কার’ তাঁর জীবনের প্রথম সম্মান। এছাড়াও ‘ত্রিবৃত্ত পুরস্কার’ (১৯৯৮), ‘সাহিত্যসেতু পুরস্কার’ (১৯৯৯), ‘তারাশংকর পুরস্কার’ (২০০০), ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ (২০০১) কিংবা ২০০৪ সালে ‘শৈলজানন্দ পুরস্কার’ এবং ২০০৯ সালে ‘মতি নন্দী পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। তাঁর ‘দহন’ উপন্যাস অবলম্বনে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ ১৯৯৭ সালে চলচ্চিত্র তৈরি করেন যা জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। একেবারে সম্প্রতি শিবপ্রসাদ মুখার্জি এবং নন্দিতা রায়ের পরিচালনায় পরপর ‘ইচ্ছে’ ‘রামধনু’ ‘অলীক সুখ’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলি সুচিত্রা ভট্টাচার্যের উপন্যাস অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে।

২০১৫ সালের ১২ মে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।

 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র
  1. ‘সুচিত্রা ভট্টাচার্য : কুড়ি একুশ শতকের নারী ঔপন্যাসিক’, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য (সম্পা:), আশাদীপ, ২০১৪, কলকাতা, পৃ ৩১০, ৩১১, ৩২০
  2. ‘বাঙালি মেয়ের ভাবনামূলক গদ্য’, সুতপা ভট্টাচার্য (সম্পা:), সাহিত্য আকাদেমি, ১৯৯৯, দিল্লি, পৃ ১৪৭-১৫৯
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://www.kolkata24x7.com/
  5. https://www.bongodorshon.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading