সববাংলায়

সাঁতার

সাঁতার সারা বিশ্বে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা হিসেবে পরিচিত। প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার খেলা দুই জনের মধ্যে যেমন অনুষ্ঠিত হতে পারে, আবার দলগতভাবেও হতে পারে। কখনও সুইমিং পুলে এটি অনুষ্ঠিত হয় কখনও বা আবার সমুদ্র বা হ্রদেও আয়োজিত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাঁতার খেলা বেশ জনপ্রিয়। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী যেসব দেশগুলিতে সাঁতার খেলার চল সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে প্রথমে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। 

সাঁতার খেলার উৎপত্তির ইতিহাস প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলা যায়  প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই  সাঁতারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় দশ হাজার বছর আগের প্রস্তর যুগের চিত্রগুলি থেকে সাঁতারের প্রাচীনত্বের প্রমাণ মেলে। ইলিয়াড ওডিসির মত প্রাচীন মহাকাব্যে যেমন সাঁতারের উল্লেখ রয়েছে তেমন বাইবেল ও কোরানেও সাঁতারের প্রসঙ্গ দেখা যায়। সাঁতার সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থটি সম্ভবত একজন সুইস-জার্মান অধ্যাপক নিকোলাস উইনম্যান ১৫৩৮ সালে লিখেছিলেন। 

আধুনিক যুগে ইংল্যান্ডে ১৮৩০-এর দশকে সাঁতার একটি প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনমূলক খেলা হিসাবে শুরু হয়। ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বের প্রথম ইনডোর সুইমিং পুল সেন্ট জর্জস্ বাথ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৩৭ সাল নাগাদ ন্যাশনাল সুইমিং সোসাইটি লন্ডনের আশেপাশে নির্মিত ছয়টি কৃত্রিম সুইমিং পুলে নিয়মিত সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এরপর সময়ের সাথে সাথে জার্মানি, ফ্রান্স, হাঙ্গেরী প্রভৃতি দেশে সুইমিং ফেডারেশন গড়ে ওঠে। ১৮৯৬ সালে গ্রীসের এথেন্সে আয়োজিত প্রথম আধুনিক অলিম্পিক গেমসে পুরুষদের সাঁতারকে অন্যতম একটি ইভেন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯০২ সালে অস্ট্রেলিয়ান রিচমন্ড ক্যাভিল প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বে ফ্রিস্টাইল সাঁতার চালু করেছিলেন। ১৯১২ সালের অলিম্পিকে মহিলাদের সাঁতারকে একটি ইভেন্ট হিসেবে সর্বপ্রথম অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।

প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত – ১. ফ্রিস্টাইল ২. ব্যাকস্ট্রোক ৩. ব্রেস্টস্ট্রোক ৪.বাটারফ্লাই।  ফ্রিস্টাইলে সাঁতারুদের পুলের পাশ থেকে (স্টার্টিং ব্লক থেকে) সাঁতার শুরু করতে হয়। প্রতিটি টার্ন শেষ করে সাঁতারুকে একপ্রান্তের দেওয়ালের কিছু অংশ স্পর্শ করে আসতে হয়। এই দেওয়াল স্পর্শের নিয়মটি সব ধরনের সাঁতারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ফ্রিস্টাইলে সাঁতারু ব্যাকস্ট্রোক, ব্রেস্টস্ট্রোক এবং বাটারফ্লাই ছাড়া অন্য যেকোন প্রকারে সাঁতার কাটতে পারে। আবার ব্যাকস্ট্রোকের ক্ষেত্রে জলেই শুরু করতে হয় সাঁতার কাটা। এই ব্যাকস্ট্রোক শুরুর পরে এবং একটি পরিক্রমা শেষে পুনরায় ফিরে আসার সময় প্রথম ১৫ মিটার সম্পূর্ণ জলের নীচে ডুবে সাঁতার দেন সাঁতারুরা। এই রেস শেষ হলে সাঁতারুকে দেওয়ালের দিকে পিছন করে দেয়াল স্পর্শ করতে হবে পিঠ দিয়ে, বা এক হাত দিয়েও করা যায়। রিলে রেসের ক্ষেত্রে যতক্ষণ না দলের একজন সাঁতারু পুলের শেষপ্রান্ত স্পর্শ করবে, ততক্ষণ দলের অন্য সাঁতারুটি জলে নামতে পারবে না। আবার ব্রেস্টস্ট্রোকের ক্ষেত্রে একজন সাঁতারুকে সবসময় বুকের ওপরেই ভর দিয়ে সাঁতার কাটতে হয়।  সে কখনই পিঠকে ভিত্তি করতে পারবে না। এই সাঁতারে দুই হাতের নড়াচড়া একযোগে এবং একই আনুভূমিক সমতলে হতে হয়। ব্রেস্টস্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্ট্রোকের একটা সময় পরে হাতগুলি ভিতরের দিকে যাওয়ার আগে মাথা দিয়েে অবশ্যই জলের পৃষ্ঠতল ভাঙতে হয় । প্রতিটি টার্ন এবং রেসের শেষে দুই  হাত দিয়ে একই সাথে জলের স্তরে উপরে বা নীচে স্পর্শ করতে হয়। বাটারফ্লাই স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও প্রতিটি টার্নের শুরুর ১৫ মিটার ডুব সাঁতারের অনুমোদন রয়েছে। দুটি হাতকে জলের ওপরে একত্রে এগিয়ে নিয়ে আসতে এবং একত্রে পিছিয়ে নিয়ে যেতে হয় সমগ্র রেস জুড়ে। বাটারফ্লাই রেস শেষ করার সময় উভয় হাত একই সময়ে জলস্তর স্পর্শ করতে হয়।

এক লেনের সাঁতারু অন্যায়ভাবে অন্য লেনের সাঁতারুকে বাধা দিলে অন্যায়কারীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। রিলে রেসের ক্ষেত্রে দলের একজন টার্ন সম্পূর্ণ করার আগেই অপরজন রেসের জন্য জলে নেমে পড়লে সেই দলকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। দৌড় প্রতিযোগিতার মতোই যে সাঁতারু প্রথম ফিনিশিং ব্লক স্পর্শ করবে সেই জয়ী বলে ঘোষিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল সুইমিং ফেডারেশন বা ফিনা (FINA, French: Fédération internationale de natation) সাঁতারের এই সমস্ত নিয়মের নির্ধারক।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আদর্শ সুইমিং পুলের আকার ও আয়তন হয় যথাক্রমে দৈর্ঘ্যে পঞ্চাশ মিটার এবং প্রস্থে পঁচিশ মিটার। পুলের গভীরতা ন্যূনতম দুই মিটার হতে হয়। এই পুলে আড়াই মিটার দূরত্বে মোট দশটি লেন থাকে যেগুলি ক্রমানুসারে শূন্য থেকে নয় অবধি চিহ্নিত করা থাকে।   

পুরুষ সাঁতারুরা ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত ফুল-বডি স্যুট পরতেন কিন্তু কম্পিটিশন স্যুটে এখন ইঞ্জিনিয়ারড ফ্যাব্রিক এবং ডিজাইন অন্তর্ভুক্ত যাতে জলে সাঁতারুদের ক্লান্তি কম হয়। আগে স্টার্টিং ব্লক ছোট, সরু এবং সোজা হত কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেগুলিকে বড় এবং প্রশস্ত করা হয়েছে এবং আজকাল ব্লকের মেঝের অংশটি সুইমিং পুলের দিকে কোণ করে তৈরি করা হয়। এছাড়াও সাঁতারের কৌশলের ক্ষেত্রেও নানারকম পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ব্রেস্টস্ট্রোকারদের তাদের গতি বাড়ানোর জন্য একটি বাটারফ্লাই কিকের অনুমতি দেওয়া হয়। এই পরিবর্তন ডিসেম্বর ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়। এছাড়াও কৌশলগত আরও নানা পরিবর্তন এসেছে সাঁতারে।

নব্বইয়ের দশক থেকে সাঁতার প্রতিযোগিতার সব থেকে বড় পরিবর্তন হল জলের নিচে ডলফিন কিক মারার অনুমতি প্রদান। প্রতিযোগিতা শুরু হওয়া মাত্র এবং সাঁতারের সমস্ত রকম স্টাইলে মোচড় মারার শেষে গতি বাড়াতে এই বিশেষ কিক ব্যবহৃত হয়। এটি সফলভাবে প্রথমবার ব্যবহার করেন ডেভিড বার্কফ ১৯৮৮ সালের অলিম্পিকে ।

ফিনা সম্প্রতি রূপান্তরকামী সাঁতারুদের জন্য একটি নতুন নিয়ম গ্রহণ করেছে। ফিনা শুধুমাত্র বারো বছর বয়সের আগে রাপান্তরিত সাঁতারুদেরই  মহিলাদের ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করার জন্য অনুমতি দেয়৷ 

সারা বিশ্বব্যাপী সাঁতার খেলার বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ বিশেষ সময়ে। অলিম্পিক গেমস তো রয়েছেই, তাছাড়াও সাঁতারের দুনিয়ার সবথেকে উল্লেখযোগ্য আরেকটি প্রতিযোগিতা হল ফিনা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ বা ওয়ার্ল্ড অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়াও আরও কয়েকটি প্রতিযোগিতার নাম হল : ওয়ার্ল্ড ওপেন ওয়াটার চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড জুনিয়র ওপেন ওয়াটার সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড মাস্টারস চ্যাম্পিয়নশিপ, ম্যারাথন সুইম ওয়ার্ল্ড সিরিজ, চ্যাম্পিয়নস সুইম সিরিজ, ফ্রেঞ্চ এলিট ওপেন সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি।

মাইকেল ফেল্প্সকে সাঁতারু হিসেবে সর্বকালের সর্বাধিক সফল অলিম্পিয়ান বিবেচনা করা হয়। তাঁর অর্জিত মোট ২৮টি অলিম্পিক পদকের মধ্যে ২৩টি স্বর্ণপদক। এছাড়াও নাম করতে হয় সাঁতারু মার্ক স্পিতজের। তাঁর সংগ্রহে নয়টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক রয়েছে। ক্যালেব ড্রেসেল হলেন আরও একজন কিংবদন্তি সাঁতারু যাঁর সংগ্রহে মোট ছয়টি বিশ্বরেকর্ড রয়েছে৷ মহিলাদের সাঁতারে যাঁর সর্বাধিক ব্যক্তিগত বিশ্বরেকর্ড রয়েছে তিনি হলেন সুইডিশ সাঁতারু সারাহ সজোস্ট্রোম। এছাড়াও মহিলাদের মধ্যে কাটিনকা হোসজু খুবই পরিচিত, তিনি তিনবার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। মহিলা সাঁতারু কেটি লেডেকির নামও করতে হয় এখানে, যিনি উনিশটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ স্বর্ণপদক সহ সাতটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতেছিলেন ।

ভারতবর্ষও সাঁতারে পিছিয়ে নেই। ভারতীয় সাঁতারু রিচা মিশ্র পাঁচটি ব্যক্তিগত জাতীয় রেকর্ডের অধিকারী যা যেকোনো ভারতীয় সাঁতারুদের মধ্যেই সর্বাধিক। এছাড়াও পুরুষ সাঁতারুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন –  সজন প্রকাশ, শ্রীহরি নটরাজের মতো ব্যক্তিত্ব। প্রকাশ এবং নটরাজ উভয়েই টোকিও অলিম্পিকের জন্য সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন যা আগে কোন ভারতীয় সাঁতারু অর্জন করতে পারেননি। আবার, এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদক জয়ী সন্দীপ সেজওয়াল ভারতের সেরা ব্রেস্ট্রোকার। বাঙালি সাঁতারুদের মধ্যে  উল্লেখযোগ্য একটি নাম –   মিহির সেন।  ভারতের প্রথম সাঁতারু হিসেবে ১৯৫৮ সালে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম সাঁতারু যিনি এক ক্যালেন্ডার বর্ষে পাঁচটি মহাদেশের সকল মহাসাগরে সাঁতার কাটার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। বাঙালি মহিলা সাঁতারুদের মধ্যে আরতি সাহা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আরতি ছিলেন এশিয়ার প্রথম মহিলা যিনি সাঁতরে ইংলিশ চ্যানেল পার করেছিলেন। অবিভক্ত ভারতের এবং প্রথম এশীয় হিসেবে ব্রজেন দাস ছয় বার ইংলিশ চ্যানেল পার করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। একজন কৃতী বাঙালি সাঁতারু হিসেবে বুলা চৌধুরীর নাম এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading