সববাংলায়

তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের সেই ব্যক্তি

বিভাগঃ , ,

চিনের রাজধানী বেজিংয়ে সেসময় চলছিল গণতন্ত্রপন্থীদের বিরাট আন্দোলন। সময়টা ১৯৮৯ সালের জুন মাস। বেজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কোয়ার – এ চিনের তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রতিবাদে গণতন্ত্রকামী বহু মানুষ সামিল হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। ৪ জুন চিনা সেনা বাহিনীর চরম আক্রমণে এবং গুলিবর্ষণে তিয়েনআনমেন স্কোয়ার -এ নিহত হয় অনেকে। আর ঠিক তার পরদিনই তিয়েনআনমেন স্কোয়ার -এ এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ট্যাঙ্কের সারির সামনে। টাইমস পত্রিকা তাঁকে চেনালো ‘এক অজ্ঞাত প্রতিবাদী’ হিসেবে। আজ পর্যন্ত সেই আগন্তুকের পরিচয় স্পষ্ট করে জানা যায়নি। আর এই ঘটনাই ফ্রেমবন্দি করে পুলিৎজার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন চিত্রগ্রাহক জেফ ওয়েডিনার। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি? কেনই বা তাঁর আবির্ভাব তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের রক্তাক্ত ভূমিতে?

১৯৮৯ সাল। ১৮ এপ্রিল প্রাক্তন কমিউনিস্ট নেতা হু ইয়াওবাং-এর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে একটা চাপা অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন হু। শোকার্ত ছাত্র-ছাত্রীরা তাই মিছিল করে তিয়েনআনমেন স্কোয়ার -এ এসে ধীরে ধীরে জমায়েত হচ্ছিল গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দাবিতে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরো শত লোক এসে জড়ো হন সেখানে। ঐ স্থানেই চারদিন ধরে পরিশ্রম করে একটি তেত্রিশ ফুট উঁচু ‘গণতন্ত্রের দেবী’র প্রতীকী মূর্তি স্থাপন করেন তাঁরা। তৎকালীন স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে চিনের বেজিং রাজ্যের তিয়েনআনমেন স্কোয়ার -এ সমবেত হয়েছিলেন অগণিত মানুষ যাঁদের বেশিরভাগই ছাত্র-ছাত্রী। গণতন্ত্রকামী এই প্রতিবাদী সমাবেশে ১৯৮৯ সালের ৪ জুন চিনের সরকার সেনা বাহিনীর সহায়তায় রাত্রি ১টার সময় যথেচ্ছাচারে গুলিবর্ষণ করে। নিহত হয় অনেক তরুণ সবুজ প্রাণ। ঠিক কতজন মারা গিয়েছিলেন সেদিন সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি চিন সরকার। প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সমগ্র বেজিং জুড়ে অশান্ত আবহাওয়া তৈরি হয়। প্রতিবাদীরা সংশয়ের মুখে পড়ে, তাঁদের আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরেরদিনই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা।

১৯৮৯ সালের ৫ জুন তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের পথ দিয়ে সারি বেঁধে ফিরছিল চিনের পুলিশ-ট্যাঙ্কগুলি। হঠাৎই এক আগন্তুক দু হাতে দুটো বাজার করার থলি নিয়ে ট্যাঙ্কগুলির পথ রোধ করে এসে দাঁড়ায়। প্রথম ট্যাঙ্কটি তাঁকে দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যায় এবং তাঁর মতোই পিছনের ট্যাঙ্কগুলিও একইভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই আগন্তুকের পরনে ছিল সাদা জামা আর কালো প্যান্ট। ট্যাঙ্কগুলিকে উদ্দেশ্য করে ডান হাত উঁচু করে তুলে থামার নির্দেশ দেন সেই আগন্তুক। প্রথম ট্যাঙ্কটি দাঁড়ানো মাত্র সেই আগন্তুক সামনের দিক দিয়ে ট্যাঙ্কের উপরে উঠে চালকের সঙ্গে কথা বলেন এবং বেশ কিছুক্ষণ ঐ ট্যাঙ্কের উপরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর নেমে এসে ফের পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকেন আগন্তুক – জনশ্রুতিতে যিনি হয়ে উঠেছিলেন অজ্ঞাত প্রতিবাদী ‘ট্যাঙ্কম্যান’ (tank man) । ট্যাঙ্কগুলি তাঁকে পাশ কাটিয়ে অন্যদিক দিয়ে যেতে চাইলেও সেই ব্যক্তি নানাভাবে তাদের পথ আটকাতে থাকেন। এরপর এক সরকারি কর্মকর্তা এসে ট্যাঙ্কগুলির পথ থেকে জোর করে সরিয়ে নিয়ে যান সেই ব্যক্তিকে। এরপর যথারীতি ট্যাঙ্কগুলি নিজের নিজের পথে সারি বেঁধে এগিয়ে যায়। ওই আগন্তুক ট্যাঙ্কম্যানের সেদিনের প্রকাশ্য অবাধ্যতা তিয়েনআমেন স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীদের উপর চিন সরকারের দমন-পীড়নকে রুখে দিয়েছিল সেইদিন। কিন্তু কে এই ট্যাঙ্কম্যান? তাঁর প্রকৃত পরিচয় কী? কেউই আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে জানতে পারেনি কে ছিলেন এই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে এক্সপ্রেস’ একটি প্রতিবেদনে জানায় যে সেই ট্যাঙ্কম্যান এক উনিশ বছর বয়সী ছাত্র ওয়াং ওয়েলিং যাঁকে চিনা পুলিশ সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার করেছিল আগে। যদিও চিনা সরকার এই তথ্য মানতে অস্বীকার করেন। সবথেকে বড়ো কথা তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের সেই আগন্তুক ব্যক্তির পরিচয়ের থেকে বড়ো হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। আগন্তুককে ভুলে গেলেও তাঁর প্রতিবাদকে কখনোই ভুলতে পারবে না বেজিংবাসীরা। সমস্ত ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডে সেদিন তাঁকে ট্যাঙ্কম্যান বলে আখ্যা দেওয়া হয়। বিখ্যাত টাইম পত্রিকা তাঁদের বিচারে শতাব্দীর সেরা একশোটি ছবি যা পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিল সেই তালিকায় এই ছবিটিকে অন্তর্ভুক্ত করে।

তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের সেই ব্যক্তি » সববাংলায়

বেজিং হোটেলের ছয় তলার বারান্দা থেকে সেদিন মোট পাঁচজন চিত্রগ্রাহক সেই ট্যাঙ্কম্যানের ছবি তুলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ‘টাইম’ এবং ‘লাইফ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সবথেকে পরিচিত ছবিটি তুলেছিলেন স্টুয়ার্ট ফ্রাঙ্কলিন। একটা চায়ের বাক্সে ছবির ফিল্ম লুকিয়ে রেখে তাঁর এক ছাত্রের সাহায্যে সেই ছবি তিনি বাইরে পাঠিয়েছিলেন। চার্লি কোল নামে আরেক চিত্রগ্রাহক একই জায়গা থেকে অকুস্থলের ছবি তোলেন, কিন্তু তাঁর ঘরে চিনা সেনার তদন্ত শুরু হলে বাথরুমের মধ্যে তিনি বাধ্য হয়ে ফিল্মের রোলটি লুকিয়ে রাখেন। সেনারা তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে এই মর্মে যে মার্শাল আইন বলবৎ হওয়ার পর ছবি তোলা কারাবাসের সমতুল দণ্ডনীয়। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে অব্যবহৃত ফিল্মের একটি রোল সেদিন চার্লি কোল পুলিশের সামনে নষ্ট করেছিলেন। কিন্তু আসল ছবিটি গোপনে তিনি ‘নিউজউইক’ সংবাদমাধ্যমের দপ্তরে পাঠালে সেই ছবিটি ‘১৯৯০ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফোটো অফ দ্য ইয়ার’-এর সম্মান পায় এবং ২০০৩ সালে ‘লাইফ’ পত্রিকার ‘১০০ ছবি যা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে’ তালিকার অন্তর্ভূক্ত হয়। তবে সবথেকে বিখ্যাত হয়েছিল ট্যাঙ্কম্যানের যে ছবিটি তা ছিল জেফ্‌ ওয়াইডেনারের তোলা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর পক্ষ থেকে জেফ্‌ ওয়াইডেনার অসুস্থ শরীরে পরপর অনেকগুলি ছবি তুলেছিলেন। তাঁর তোলা ছবি সেইসময় সমস্ত ইউরোপীয় সংবাদপত্রের সামনের পাতায় ছাপা হয়েছিল। সেই ছবির কারণে পুলিৎজার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জয় করতে পারেননি ওয়াইডেনার। কিন্তু তারপরেও জেফ্‌ ওয়াইডেনারের তোলা সেই ট্যাঙ্কম্যানের ছবি বিশ্বের অন্যতম সেরা ছবির মর্যাদা পেয়েছে। চিন সরকারের কড়া নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে পৌঁছালো সেই ছবি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কাছে? ওয়াইডেনার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তাঁর এক ছাত্র মার্টসেন নিজের অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে নিয়েছিল সেই ফিল্মের রোল এবং ঐভাবেই বেজিং হোটেল থেকে বেরিয়ে মার্টসেন সেই ছবি পাঠিয়ে দিয়েছিল বিশ্বের নানা সংবাদমাধ্যমে।

শুধু এখানেই থেমে থাকেনি চিনের স্বৈরতন্ত্রী কমিউনিস্ট সরকার। ইন্টারনেট এবং সংবাদপত্রে সমস্ত ছবির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চিন সরকার। আন্তর্জাতিক স্তরে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরী হয়। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে ‘কল অফ ডিউটি : ব্ল্যাক অপস কোল্ড ওয়ার’ ভিডিও গেমের ট্রেলারে ট্যাঙ্কম্যানের একটি ছোট্ট ফুটেজ থাকায় তা ইন্টারনেটে দেখানোর সময় ঐ অংশটি কালো করে দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৪ জুন তিয়েনআনমেন স্কোয়ার হত্যাকাণ্ডের বত্রিশ বছর পূর্তিতে ইন্টারনেটে বহু সার্চ অপশন জমা হয় ট্যাঙ্কম্যানের ছবি নিয়ে। কিন্তু মাইক্রোসফট বিঞ্জ সেইসমস্ত ছবি প্রত্যাহার করে নেয়, ফলে ট্যাঙ্কম্যানের ছবি পাওয়া যায় নি সেদিন। প্রায় একঘন্টা পরে চিন বাদে বিশ্বের অন্য সমস্ত দেশে শুধু ট্যাঙ্কের ছবিগুলি ছাড়া হয় ইন্টারনেটে। ফলে বোঝাই যায় চিন সরকারের দমননীতি কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল।

চিন সরকারের দমন-পীড়নের এক প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো এই ট্যাঙ্কম্যানের ছবিটি


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।