ভূগোল

ঝাড়গ্রাম জেলা

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মূলত ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল ঝাড়গ্রাম( Jhargram)।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত অন্যতম একটি জেলা হল ঝাড়গ্রাম। এখানকার বনভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই হল এই জেলার বিশেষত্ব। কংসাবতী, সুবর্ণরেখা, দুলুং, তারাফেনি প্রভৃতি নদীর মনোরম সৌন্দর্যের সাথে এখানে মিশে রয়েছে শালবনী, হাতিরি, বেলপাহারীর অপূর্ব বন্য শোভা।

২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমাটিকে নিয়ে এই জেলাটি গঠিত হয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের দ্বাদশতম জেলা, ঝাড়গ্রাম জেলার জেলাসদর হল ঝাড়গ্রাম শহর।

ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি অন্যতম জেলা ঝাড়গ্রামের উত্তরে বাঁকুড়া জেলা, দক্ষিণে ওড়িশা রাজ্য, পূর্বে পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পশ্চিমে ঝাড়খণ্ড রাজ্য ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। 

৩০৩৭ বর্গ কিমি স্থান জুড়ে বিস্তৃত ঝাড়গ্রাম আয়তনের বিচারে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সতেরোতম স্থানে রয়েছে৷ ২০১১ সালের আদমসুমারী অনুসারে ঝাড়গ্রামে প্রায় ১১৩৬৫৪৮ জন মানুষ বসবাস করেন। লোকসংখ্যার বিচারে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ঝাড়গ্রাম বাইশতম স্থানে রয়েছে৷ এই জেলায় মূলত বাংলা ভাষাভাষী(৭৮.২৮%) মানুষ বসবাস করেন। এছাড়া সাঁওতালি (১৮.৯০%), কুরমালী (১.২৫%), মুন্ডারি (১.৪৬%) ও অন্যান্য (০.১১) ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরও এখানে বাস রয়েছে৷

ঝাড়গ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সম্রাট আকবরের হয়ে রাজা মান সিং ১৫৪৭ সালে বাংলা জয় করতে আসেন। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি সর্বেশ্বর সিংকে স্থানীয় শাসকদের পরাজিত করার জন্য নিয়োগ করেন। এই সর্বেশ্বর সিং তাঁর সেনাবাহিনী সহ মল উপজাতিদের শাসককে পরাজিত করে নিজে মল্লদেব নাম গ্রহণ করেন এবং প্রায় ১২০০ বর্গ কিমি বিস্তৃত জঙ্গলখণ্ড অঞ্চলটির শাসনভার গ্রহণ করেন। এই জঙ্গলখণ্ড এলাকাই আজকের ঝাড়গ্রাম বলে মনে করা হয়। সর্বেশ্বর সিং-ই হলেন ঝাড়গ্রাম সাম্রাজ্যের মূল প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজেকে রাজা ঘোষণা করে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানীর নাম ঝাড়গ্রাম ঘোষণা করেন।

বর্তমানে ঝাড়গ্রাম ভ্রমন পিপাসু মানুষদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান৷ জঙ্গল প্রিয় মানুষেরা ভীড় করেন এই শাল মহুয়া ঘেরা জেলায়৷ ইতালীয় ও ইসলামীয় স্থাপত্যশৈলির মিশ্রণে তৈরী ঐতিহ্যমন্ডিত ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ১৯৩১ সালে ৭০ বিঘে জমির উপর ঝাড়গ্রামের শেষ রাজা নরসিংহ মল্লদেব এই রাজবাড়ি তৈরি করেন। এছাড়াও প্রায় চারশো বছরেরও বেশী প্রাচীন কনক দুর্গা মন্দির, ডুলুং নদীর তীরে অবস্থিত চিল্কিগড় রাজবাড়ি, ঝাড়গ্রাম চিড়িয়াখানা, ঘাঘরা জলপ্রপাত ও তারাফেনি বাঁধ এখানকার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র।

ঝাড়গ্রাম উপজাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। চুয়াং, চ্যাং, ছৌ, ড্যাংগ্রে, ঝুমুর, পান্তা, রণপা, সাহারুল লোকনৃত্য যেমন বিখ্যাত তেমনি টুসু পরব, বাহা পারব, করম পূজা, ভাদু উত্সব, বদনা পরব এই জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে। ঝাড়গ্রামের কিছু বিখ্যাত মেলা হল জঙ্গলমহল উৎসব, ঝাড়গ্রাম মেলা ও যুব উৎসব, , শ্রাবনী মেলা, বৈশাখী মেলা, মিলন মেলা ইত্যাদি৷

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন