ইতিহাস

নিমাই ঘোষ

বিংশশতাব্দীর ভারতবর্ষে যে ক’জন ফটোগ্রাফার বা আলোকচিত্রশিল্পী তাঁদের শিল্পকে রসোত্তীর্ণ হতে সাহায্য করেছেন, নিমাই ঘোষ (Nemai Ghosh) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ক্যামেরা হাতে তুলে নেওয়ার আগে নিমাই ঘোষ ছিলেন একজন একনিষ্ঠ নাট্যকর্মী যাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের হাতে। নিমাই ঘোষ এমন একজন আলোকচিত্রী যাঁর গোটা জীবনের সাধনা ছিল বিশ্ববরেণ্য চিত্রনির্দেশক সত্যজিৎ রায়ের জীবনকে ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা, শুধু এইটুকু বললেই তাঁর পুরো পরিচয় পাওয়া যাবেনা, নিমাই ঘোষের ক্যামেরায় ধরা দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু গুনী শিল্পী, অভিনেতা, পরিচালক, ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ। পৃথিবীর নানা রঙের মানুষজন তাঁর ক্যামেরার সাদাকালো ছবিতে সাগ্রহে ধরা দিয়েছেন।

১৯৩৪ সালের ৮ মে কলকাতায় নিমাই ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শ্রী সতীশ চন্দ্র ঘোষ এবং মায়ের নাম শ্রীমতী আশালতা ঘোষ। তাঁর বাবা পেশায় হাইকোর্টের পেশকার ছিলেন। আট ভাইবোনের মধ্যে বয়সে সবার বড় ছিলেন নিমাই ঘোষ। নিমাই ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী শিবানী ঘোষের তিন সন্তান। শান্তনু, সাত্যকি এবং শর্মিষ্ঠা। মাত্র ৪২ বছর বয়সে জ্যেষ্ঠপুত্র শান্তনুর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর কন্যা শর্মিষ্ঠা এই শহরেই বাস করেন ও পুত্র সাত্যকি, বাবার দেখানো পথে পা রেখে একজন প্রতিষ্ঠিত আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। উত্তর কলকাতার অখিল মিস্ত্রী লেনে জন্মগ্রহণ করলেও কিছুদিনের মধ্যেই নিমাই ঘোষ সপরিবারে চলে আসেন ভবানিপুরে নিজেদের বাড়িতে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা থেকে তারা চলে যেতে বাধ্য হন মেদিনীপুরের ঘাটাল সাব ডিভিশনে তাঁদের দেশের বাড়িতে।

মেদিনীপুরের গ্রামের পাঠশালায় শালপাতায় বাঁশের কলম দিয়ে তাঁর শিক্ষাপর্ব শুরু হয়। তাঁর কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতায় ফিরে এসে প্রথাগত শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে যোগ দেন সাউথ সুবারবান স্কুলে এবং তারপরে চারুচন্দ্র কলেজে স্নাতকস্তরের পড়াশুনোর জন্য। এই সময়েই গান-বাজনা, নাটকের নেশা চাপে তাঁর মাথায়। মাঝেমাঝেই চলে যেতেন আইপিটিএ-তে সলীল চৌধুরীর গানের মহড়া শোনার জন্য। এই সময় কলেজে সবাই মিলে অভিনয় করলেন, “বৈকুণ্ঠের খাতা”। সেই নাটক দেখতে এসে অভিনেতা রবি ঘোষ প্রস্তাব দেন উৎপল দত্তের নাট্যদল লিটল থিয়েটার গ্রুপে যোগ দেওয়ার। বাবার কাছে অনুমতি চাইতে গেলে তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান, কারণ লিটল থিয়েটার গ্রুপ তখন শেক্সপিয়ারের নাটক করে বেশ নাম করেছে। সবাই মিলে হৈহৈ করে একের পর এক নাটক করতে লাগলেন। এরই মধ্যে বিশ্ব বিখ্যাত মূকাভিনয় শিল্পী মারসেল মারশ এলে কলকাতায় উৎপল দত্তের উদ্যোগে মারসেলের অভিনয় দেখার সুযোগ পান নিমাই ঘোষ।

লিটল থিয়েটার গ্রুপে ৫-৬ বছর কাজ করার পর ১৯৬৩-৬৪ সাল নাগাদ নতুন দল তৈরি হয় ‘চলাচল’ নামে যেখানে সহশিল্পী ছিলেন রবি ঘোষ। চলাচল-এর প্রযোজনা ‘ঠগ’- এ নিমাই ঘোষ মুখ্য ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন। নাট্যাভিনেতা নিমাই থেকে আলোকচিত্রী নিমাইয়ে রূপান্তর বেশখানিকটা নাটকীয়ভাবেই বলা যায়। নিমাই ঘোষের এক বন্ধু একদিন তাঁর বাড়িতে হাজির হলেন একটা ক্যামেরা হাতে নিয়ে। ক্যামেরাটি তাঁর বন্ধুর আত্মীয়ের ট্যাক্সিতে কোনও যাত্রী ফেলে গেছেন। ক্যানন এর একটি ফিক্সড লেন্স ক্যামেরা, যেটা দিয়ে তাঁর বন্ধু নিমাই ঘোষের কাছ থেকে নেওয়া একটি পুরনো ধার শোধ করতে চান। সেই সময়ে নিমাই ঘোষের বাড়িতে উপস্থিত আরেক বন্ধু পরামর্শ দিলেন ক্যামেরাটি নিয়ে নেওয়ার জন্য, তিনি কিছু কাটপিস ফিল্ম জোগাড় করে দেবেন, যা দিয়ে দিব্যি ক্যামেরায় হাত পাকাতে পারেন তিনি। সেই ক্যামেরা আর কাটপিস ফিল্ম সম্বল করে নিমাই ঘোষ উঠে পড়ে লাগলেন ফটোগ্রাফি শিখতে।

এই সময়ে সহশিল্পী রবি ঘোষ ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’ নামে একটি নতুন ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ায় নিমাইঘোষেদের নাট্যমহড়ায় মাঝেমধ্যেই বাধা পড়ছিল। এই মোক্ষম সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে নিমাই ঘোষ তাঁর ক্যামেরা সহ পৌঁছে গেলেন রামপুরহাটে, আরও সহজ করে বললে, ভূতের রাজার বাগানে। অভিনেতাদের প্রস্তুতিপর্ব, শশব্যস্ত একটা গোটা ফিল্ম ইউনিট আর নিজের সৃষ্টিকে রূপায়িত করার কাজে নিমগ্ন সেই ছবির পরিচালক, শ্রী সত্যজিৎ রায়ের ছবি ক্যামেরাবন্দি করে কলকাতায় ফিরলেন নিমাই ঘোষ। হাজির হলেন রেনেসাঁ স্টুডিওর বি কে সান্যালের কাছে। তিনি শুধু যে ছবিগুলি ডেভেলপ এবং প্রিন্ট করেই দিলেন তা নয় পেটে ঘুষি মেরে নিমাই ঘোষকে বলে ছিলেন, “ লেগে থাক। তোমার হবে”। বন্ধুবর বংশী চন্দ্রগুপ্তর পরামর্শে আর অনেকটা সাহসে ভর করে নিমাই ঘোষ হাজির হলেন নিউ থিয়েটারস স্টুডিওতে। নিমাই ঘোষের তোলা ছবি দেখে উল্লসিত সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, “আপনি তো আমার অ্যাঙ্গেল মেরে দিয়েছেন মশাই”।

সত্যজিৎ রায়ের মাধ্যমেই নিমাই ঘোষের আলাপ হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী হেনরি কারটিয়ের ব্রেঁস’র। তাঁর সাথে বহুদিন ধরে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিমাই ঘোষের সাথে দেখা করতে এবং তাঁর ছবি দেখতে রাজি হন পারিসে। ১৯৮৭ সালে নিমাই ঘোষ প্যারিস যান। ব্রেঁস তাঁর ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে পরিচিত প্রকাশকের মাধ্যমে সেই ছবির সংকলন বই হিসেবে প্রকাশ করতে সাহায্য করেন, আর সেই বইয়ের জন্য লিখে দেন একটি অনবদ্য ফরওয়ার্ড বা প্রাককথন। সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন লন্ডনে, নিমাই ঘোষের সাফল্যের খবর পেয়েই ফোন করেন কলকাতায়। আর সেই খবর পেয়ে উচ্ছসিত স্বয়ং সত্যজিৎ নিমাই ঘোষের বাড়িতে ফোনে করে জানান, “নিমাই বিশ্বজয় করেছে”।

সত্যজিত রায় ছাড়াও মৃণাল সেন (কলকাতা ৭১, ইন্টার্ভিউ), ঋত্বিক ঘটক (যুক্তি তক্ক ও গপ্পো), গৌতম ঘোষ (পার, অন্তর্জলি যাত্রা, পদ্মা নদীর মাঝি)এবং আরও অনেক বিখ্যাত নির্দেশকের ছবিতে কাজ করেছেন নিমাই ঘোষ বহু বছর ধরে। রঙ্গমঞ্চ ছিল তাঁর বড় প্রিয় জায়গা। অভিনেতা হিসেবে না পারলেও চিত্রগ্রাহক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সযত্নে ফ্রেমবন্দী করেছেন ভারতীয় রঙ্গমঞ্চের কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তকে। শুধুমাত্র এই কাজের জন্যেই আগামী বেশ কয়েক প্রজন্ম মনে রেখে দেবে নিমাই ঘোষকে।

কখনও প্রাণের শহর কলকাতা হয়ে উঠেছে তাঁর ছবির বিষয়, কখনও গোটা দেশের শিল্পী-ভাস্করদের কর্মকাণ্ড আবার কখনও কচ্ছের রান, বাস্তার, ওড়িশা বা অরুনাচলের মতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসীদের জীবনযাত্রা। তাঁর অস্ত্র একটাই, তাৎক্ষনিক খণ্ডচিত্র বা ক্যানডিড ফটোগ্রাফি, যাতে কৃত্রিম আলোর ঝলকানি নেই, ডিজিটাল ফরম্যাটের কারুকাজ নেই। যন্ত্রের দাসত্ব করার কোনও ইচ্ছে ছিলোনা তাঁর। এই মুন্সিয়ানাই তাঁকে করেছে স্বতন্ত্র, শেষ বয়েসে মিকেলাঞ্জেলো আন্তনিওনি’র মতো প্রবাদপ্রতিম নির্দেশক ডেকে নিয়ে গেছেন রোমে তাঁর শিল্পকলার ছবি তোলার জন্য। ২০০৭ সালে নিমাই ঘোষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ২০১০ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মান।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ ৮৬ বছর বয়েসে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যু হয় নিমাই ঘোষের।      

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।