তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar) একজন বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং লেখক। কিছু হিন্দি সিনেমা পরিচালনা করলেও প্রধানত বাংলা সিনেমায় কাজের মাধ্যমেই তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন। বাংলার টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি সকলের প্রিয় ‘তনুদা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তরুণ মজুমদারের সিনেমায় উঠে এসেছে প্রেম, পরিবারিক সম্পর্ক, গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং মধ্যবিত্ত মানুষের পাওয়া না-পাওয়ার নানান গল্প। তাঁর ছবির নির্দিষ্ট কোন শ্রেণিবিভাগ করা না গেলেও সারল্য তাঁর সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি সিনেমাকে পণ্য রূপে না দেখে তাকে দক্ষভাবে বাস্তব জীবনের স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তরুণ মজুমদার নিজের সিনেমায় বহু নবাগত শিল্পীকে সুযোগ দিয়েছেন, যাঁদের অভিনয়শৈলী সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এর পাশাপাশি অনেক শিল্পী তরুণ মজুমদারের সিনেমায় কাজ করে খ্যাতির শীর্ষ স্থান পৌঁছেছেন। তাঁর সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বলা হয়, চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সার্থক ও সংবেদনশীল প্রয়োগ যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে তরুণ মজুমদার অন্যতম। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ১৯৯০ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
তরুণ মজুমদারের জন্ম হয় ১৯৩১ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বগুড়ার এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর বাবা বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। পরিবারে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য ছিল প্রবল। দেশভাগের পর তাঁরা বগুড়া ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে ১৯৬৭ সালে তরুণ মজুমদারের বিবাহ হয়।
তরুণ মজুমদার ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করার পর সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হন। এই কলেজে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী আদর্শে দীক্ষিত হন, সারাজীবনে সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
এক নজরে তরুণ মজুমদারের জীবনী:
- জন্ম: ৮ জানুয়ারি, ১৯৩১
- মৃত্যু: ৪ জুলাই, ২০২২
- কেন বিখ্যাত: তরুণ মজুমদার বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যনির্ভর, মানবিক ও সংবেদনশীল গল্প বলার ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও আবেগকে স্বাভাবিক অভিনয় ও সংলাপে তিনি পর্দায় তুলে ধরেন। চলচ্চিত্র পরিচালনা ছাড়াও লিখেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই।
- পুরস্কার: তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বিএফজেএ,ফিল্মফেয়ার ইত্যাদি নানা পুরস্কার পেয়েছেন। পদ্মশ্রী ও বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারেও সম্মানিত হন তিনি।
‘উত্তরা’ ও ‘মেরিনা’ সিনেমা হলে ছবি দেখতে গিয়েই তরুণ মজুমদারের সিনেমার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ‘মেরিনা’তেই প্রথম তিনি দেবকী বসুর ‘বিদ্যাপতি’ দেখেন এবং প্রমথেশ বড়ুয়ার একাধিক ছবি দেখার সুযোগ পান।
তরুণ মজুমদার তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন টেকনিশিয়ান ও চলচ্চিত্র প্রচারক হিসেবে। এরপর তিনি জনপ্রিয় প্রচারক বাগীশ্বর ঝার সহকারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তারপর তিনি পার্ক সার্কাসের রূপশ্রী স্টুডিওতে কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কানন দেবীর সঙ্গে ‘শ্রীমতি পিকচার্স’-এ মূলত কানন দেবীর সহকারী হিসাবে কাজ করেছিলেন।
বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থায় শিক্ষানবিশ পদে চাকরি সূত্রে দিলীপ মুখার্জি ও শচীন মুখার্জির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। তাঁরা তিনজনে মিলে গড়ে তোলেন ‘যাত্রিক’ পরিচালক গোষ্ঠী। ১৯৫৯ সালে এই পরিচালক গোষ্ঠী প্রথম তৈরি করে সুচিত্রা সেন এবং উত্তম কুমার অভিনীত ‘চাওয়া পাওয়া’ । উত্তম-সুচিত্রা জুটির শেষ পূর্ণাঙ্গ রোম্যান্টিক ছবি এটি। এরপর তরুণ মজুমদার ‘কাঁচের স্বর্গ’ সিনেমায় নিজের সহকর্মী দিলীপ মুখার্জিকে নিয়ে আসেন নায়কের ভূমিকায়। এই ছবি জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি দিলীপ মুখার্জিও নায়ক রূপে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তারপর ‘যাত্রিক’ একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিলেও ‘পলাতক’ চলচ্চিত্রে নায়ক নির্বাচনের সময় ‘যাত্রিক’-এর তিন পরিচালকের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। তরুণ মজুমদার সমস্ত মতবিরোধ অতিক্রম করে ‘পলাতক’ সিনেমার নায়ক করেন অনুপ কুমারকে, যা সকলকে বিস্মিত করে। আসলে সেই যুগে অনুপ কুমারকে কেউ নায়ক বা কোন সিরিয়াস চরিত্রের জন্য ভাবতেই পারত না। এই সিনেমা থেকেই অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের একসঙ্গে কাজ শুরু হয়। ‘পলাতক’ সিনেমার হিন্দি ভার্সন ‘রাহগির’ও পরিচালনা করেছিলেন তরুণ মজুমদার।
‘যাত্রিক’ ভেঙ্গে যাওয়ার পর তরুণ মজুমদার এককভাবে তৈরি করেছিলেন ‘আলোর পিপাসা’ ও ‘একটুকু বাসা’ । তারপর ১৯৬৭ সালে তিনি পরিচালনা করেন অন্যতম সেরা ছবি ‘বালিকা বধূ’ । বিমল করের লেখা গল্পের উপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় মৌসুমী চ্যাটার্জির। মিষ্টি প্রেমের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় হিন্দিতেও পুনর্নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তবে বাংলার মতো হিন্দিতে এই সিনেমা ততটা সাফল্য পায়নি।
১৯৭১ সালে তরুণ মজুমদারের থ্রিলারধর্মী ছবি ‘কুহেলি’ দর্শক মনে ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে এবং সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রে এই ঘরাণার অন্যতম সেরা সিনেমা বলে আজও বিবেচিত হয়। এরপর তিনি পরিচালনা করেন ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ চলচ্চিত্রটি, যা বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছিল। ১৯৭৪ সালে তরুণ মজুমদার ‘ফুলেশ্বরী’ সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন, যার নায়িকা ছিলেন সন্ধ্যা রায়। এরপর ১৯৭৫ সালে তিনি ‘সংসার সীমান্তে’ পরিচালনা করেন। এই সিনেমার প্রধান চরিত্রে ছিলেন সন্ধ্যা রায় ও সৌমিত্র চ্যাটার্জী। ১৯৮০ সালে তিনি পরিচালনা করেন ‘দাদার কীর্তি’। এই ছবিতে তাপস পালের অভিষেক হয়, এছাড়া এই সিনেমায় মহুয়া রায়চৌধুরীকে অন্যতম প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। ছবিটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে এবং সিনেমার তারকারাও খ্যাতি অর্জন করেছিল।
এরপর তরুণ মজুমদার সন্ধ্যা রায়কে নায়িকা করে ‘শহর থেকে দূরে’, ‘মেঘমুক্তি’, ‘খেলার পুতুল’ এবং ‘অমর গীতি’-র মতো বেশ কিছু সিনেমা তৈরি করেছিলেন। তবে শেষ দুটি ছবি বক্স অফিসে বড় ধরনের ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়। আর এই সময় তরুণ মজুমদার ও সন্ধ্যা রায়ের জুটির উপর থেকে দর্শকরা ক্রমে ভরসা হারাতে শুরু করে। এরপর তিনি তাপস পাল এবং দেবশ্রী রায়কে নিয়ে রোমান্টিক সিনেমা ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ তৈরি করেন। এই ছবিটি বেশ ভাল ব্যবসা করেছিল। তারপর ১৯৮৮ সালে তরুণ মজুমদার পরিচালনা করেন ‘আগমন’ এবং ‘পরশমণি’ নামক দুটি সিনেমা । ১৯৯০ সালে তিনি প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী এবং শতাব্দী রায়কে নিয়ে ‘আপন আমার আপন’ ছবি পরিচালনা করেছিলেন। ছবিটি বক্স অফিসে তুমুল সাফল্য পায়। তারপর ২০০৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘আলো’। এই চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের প্রশংসা লাভ করে এবং সেই বছরের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। এরপর ২০০৬ সালে তিনি ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ পরিচালনা করেন। এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে অভিনয় যাত্রা শুরু হয় গৌরব চ্যাটার্জী এবং মেঘা মুখার্জির। তবে এই সিনেমা খুব একটা ভাল সাফল্য পায়নি। ২০০৭ সালে তিনি মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারকে কেন্দ্র করে তৈরি করেন ‘চাঁদের বাড়ি’। তরুণ মজুমদারের সিনেমায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এবং সুর করা গানগুলি এক অনন্য মাত্রা পেয়েছিল।
সিনেমা পরিচালনা ছাড়াও কলকাতার নন্দনের উপদেষ্টা বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি লেখালিখিও করেছেন। তাঁর স্মৃতিকথামূলক বই ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এছাড়া তাঁর লেখা ‘বাতিল চিত্রনাট্য’, ‘নকশি কাঁথা’, ‘শাপলা শালুকের দিনগুলি’, ‘ঘরের বাইরে ঘর’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
তরুণ মজুমদার নিজের পরিচালক জীবনের প্রথমদিকে পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের সাহচর্য। সেই সময় তিনি সত্যজিৎ রায়ের থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা পরামর্শ নিতেন। এছাড়া তরুণ মজুমদারের সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। আর সেই সাহিত্যকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন সিনেমা তৈরি করেছিলেন। তরুণ মজুমদারের ক্যারিয়ারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায়ের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। চলচ্চিত্র পরিচালক হলেও সঙ্গীতে তাঁর খুবই আগ্রহ ছিল, তাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর এক আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তরুণ মজুমদারের সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু ‘পলাতক’ দিয়ে আর শেষ হয় ‘আগমন’ ছবিতে। পাশাপাশি, তরুণ মজুমদারের প্রায় কুড়িটি ছবিতে সন্ধ্যা রায় অভিনয় করেন। তিনি বরাবরই সিনেমায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালবাসতেন। তাই পুরোনো শিল্পীদের পাশাপাশি তিনি অনেক নবাগত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তাঁর চলচ্চিত্রে সুযোগ দেন।
তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় তৈরি বেশ কিছু চলচ্চিত্র জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও নানান পুরস্কার পেয়েছে আর তিনিও সম্মানিত হয়েছেন নানা পুরস্কারে। ১৯৬৩ সালে তরুণ মজুমদার প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘কাঁচের স্বর্গ’ সিনেমার জন্য – যা সেরা বাংলা ফিচার ফিল্ম হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এছাড়াও জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমাগুলি হল ‘নিমন্ত্রণ’ (সেরা বাংলা ফিচার ফিল্ম), ‘গণদেবতা’, ‘আলো’ (সেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র), ‘অরণ্য আমার’ (সেরা বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্র)। এছাড়াও ‘নিমন্ত্রণ’, ‘সংসার সীমান্তে’ ছবির জন্য তিনি সেরা পরিচালক হিসাবে বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছেন। ‘বালিকা বধূ’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘সংসার সীমান্তে’ ‘গণদেবতা’ সিনেমাগুলি সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পেয়েছে। সারাজীবনের কাজের স্বীকৃতিতে বিএফজেএ, কলাকার এবং ফিল্মফেয়ার – এর থেকে যথাক্রমে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০২১ সালে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন। সিনেমা জগতে তরুণ মজুমদারের অবদানকে সম্মান জানিয়ে ভারত সরকার তাঁকে ১৯৯০ সালে মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করে। বর্তমানে জাতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগারে তাঁর বেশ কয়েকটি সিনেমা পুনরুদ্ধার এবং ডিজিটালাইজড করে রাখা হয়েছে।
২০২২ সালের ৪ জুলাই কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তরুণ মজুমদারের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান