সববাংলায়

গোলকোন্ডা দুর্গ

হায়দ্রাবাদের ইতিহাস, রাজনীতি এবং বাণিজ্যের কথা বলতে গেলে গোলকোন্ডা দুর্গের নাম অবশ্যই উঠে আসে। বিশাল প্রাচীর, পাহাড়ের উপর গড়ে ওঠা বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মধ্যযুগীয় রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ – সব মিলিয়ে এই দুর্গ দাক্ষিণাত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্য। আজকের দিনে এটি হায়দ্রাবাদের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হলেও একসময় এই দুর্গ ছিল শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। এখানেই গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত হীরার বাণিজ্যকেন্দ্র, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের বহু মূল্যবান রত্নের ইতিহাস।ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে এই অঞ্চলের হীরার খনিগুলো একসময় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ খনি হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই কারণেই গোলকোন্ডা শুধু একটি দুর্গ নয়, বরং মধ্যযুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এই দুর্গ ঘুরে দেখলে শুধু স্থাপত্য নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসেরও পরিচয় পাওয়া যায়।

গোলকোন্ডা দুর্গ কোথায়

গোলকোন্ডা দুর্গ ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। শহরের কেন্দ্রীয় অংশ থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রানাইট পাহাড়ের উপর এই দুর্গটি গড়ে উঠেছে। প্রশাসনিকভাবে এটি হায়দ্রাবাদ জেলার অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমানে এটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ দপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ।

হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনা চারমিনার থেকে এই দুর্গের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। শহরের প্রধান রেলস্টেশন সেকেন্দরাবাদ জংশন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং হায়দ্রাবাদ ডেকান (নামপল্লি) স্টেশন থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার। রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গোলকোন্ডা দুর্গের দূরত্ব আনুমানিক ৩০ কিলোমিটার। দুর্গের কাছেই অবস্থিত কুতুব শাহী সমাধিক্ষেত্র, যা একই ঐতিহাসিক পরিসরের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

গোলকোন্ডা দুর্গের ইতিহাস

গোলকোন্ডা দুর্গের ইতিহাস প্রায় অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ঐতিহাসিকভাবে দুর্গটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ হয় কাকতীয় রাজবংশের আমলে। তৎকালীন সময় এই অঞ্চলকে বলা হতো “গোল্লা কন্ডা”, যার অর্থ ছিল “পালকদের পাহাড়”। প্রথমদিকে এটি ছিল একটি মাটির তৈরি দুর্গ, যা মূলত পাহাড়ের উপর একটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

চতুর্দশ শতকে দাক্ষিণাত্যে বাহমনি সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে এবং গোলকোন্ডা দুর্গ তাদের অধীনে আসে। এই সময় দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয় এবং পাথরের প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়। বাহমনি শাসনের সময় থেকেই গোলকোন্ডা অঞ্চলের হীরার খনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

গোলকোন্ডা দুর্গের প্রকৃত বিকাশ ঘটে কুতুব শাহী রাজাদের আমলে। ষোড়শ শতাব্দীতে সুলতান কুলি কুতুব শাহ বাহমনি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গোলকোন্ডাকে নিজের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কয়েক দশকের মধ্যে দুর্গটি বিশাল পাথরের প্রাচীর, রাজপ্রাসাদ, মসজিদ, জলাধার এবং প্রতিরক্ষা টাওয়ার দিয়ে সজ্জিত হয়ে ওঠে। কুতুব শাহী শাসনের সময় গোলকোন্ডা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি রাজ্য। এখানকার হীরার খনিগুলো থেকে বহু বিখ্যাত হীরা পাওয়া যায়। কোহিনূর, হোপ ডায়মন্ড এবং দরিয়া-ই-নূরসহ অনেক ঐতিহাসিক হীরার সঙ্গে গোলকোন্ডার নাম জড়িয়ে আছে।

১৭শ শতকের শেষ দিকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে গোলকোন্ডা আক্রমণ করেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ১৬৮৭ সালে গোলকোন্ডা দুর্গ মুঘলদের হাতে দখল হয়। এর পর থেকেই দুর্গের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

গোলকোন্ডা দুর্গ কীভাবে যাবেন

গোলকোন্ডা দুর্গে যেতে হলে প্রথমে হায়দ্রাবাদ শহরে পৌঁছতে হবে। ভারতের বিভিন্ন বড় শহর থেকে ট্রেন ও বিমানে হায়দ্রাবাদে আসা যায়। হায়দ্রাবাদ ডেকান বা সেকেন্দরাবাদ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে ট্যাক্সি, অটো বা অ্যাপ-ক্যাব নিয়ে সহজেই গোলকোন্ডা দুর্গে পৌঁছানো যায়। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও বাস পরিষেবা পাওয়া যায়।

গোলকোন্ডা দুর্গে কোথায় থাকবেন

গোলকোন্ডা দুর্গের আশেপাশে কিছু হোটেল থাকলেও অধিকাংশ ট্যুরিস্ট হায়দ্রাবাদ শহরের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করেন। বানজারা হিলস, জুবিলি হিলস এবং হিমায়তনগর এলাকায় বিভিন্ন বাজেটের হোটেল পাওয়া যায়। সেখান থেকে গাড়িতে সহজেই গোলকোন্ডা দুর্গে যাওয়া যায়।

গোলকোন্ডা দুর্গে কী দেখবেন

ফতেহ দরওয়াজা

দুর্গের প্রধান প্রবেশপথগুলোর মধ্যে ফতেহ দরওয়াজা সবচেয়ে বিখ্যাত। বিশাল কাঠের দরজা এবং লোহার কাঁটা লাগানো এই দরজাটি শত্রুদের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এখানেই গোলকোন্ডার বিখ্যাত শব্দ প্রতিফলন ব্যবস্থার উদাহরণ দেখা যায়। প্রবেশদ্বারের কাছে হাততালি দিলে সেই শব্দ দুর্গের অনেক উঁচু অংশ পর্যন্ত শোনা যায়।

দুর্গের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

গোলকোন্ডা দুর্গের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর জটিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দুর্গটি কয়েকটি স্তরে ভাগ করা ছিল এবং প্রতিটি স্তরে আলাদা প্রাচীর ও প্রহরী টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে শত্রুপক্ষকে দুর্গের কেন্দ্রীয় অংশে পৌঁছতে একাধিক স্তর অতিক্রম করতে হতো।

রাজপ্রাসাদ ও দরবার হল

দুর্গের উপরের অংশে রাজপ্রাসাদ এবং দরবার হলের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়। এখানেই কুতুব শাহী রাজারা রাজকার্য পরিচালনা করতেন। প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে ছিল সভাকক্ষ, আবাসিক কক্ষ এবং প্রশাসনিক কক্ষ।

জলাধার ও পানির ব্যবস্থা

গোলকোন্ডা দুর্গে পানির ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। পাহাড়ের উপর অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এখানে জটিল জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো। এই ব্যবস্থা মধ্যযুগীয় প্রকৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা

দুর্গের ভেতরে কয়েকটি মসজিদও রয়েছে, যেগুলো কুতুব শাহী আমলে নির্মিত হয়েছিল। এগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং সেই সময়ের স্থাপত্যশৈলীরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

দুর্গের উপরের দৃশ্য

দুর্গের সর্বোচ্চ অংশে পৌঁছালে হায়দ্রাবাদ শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় এই দৃশ্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

গোলকোন্ডা দুর্গে কখন যাবেন

গোলকোন্ডা দুর্গ সারা বছরই ট্যুরিস্টদের জন্য খোলা থাকে। তবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। এই সময়ে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে শীতল থাকে এবং দুর্গের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখাও সহজ হয়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • দুর্গটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত, তাই অনেকটা পথ হেঁটে উঠতে হয়।
  • আরামদায়ক জুতো পরা ভালো।
  • গরমের সময় গেলে জল সঙ্গে রাখা উচিত।
  • পুরো দুর্গ ঘুরে দেখতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
  • সন্ধ্যার সময় এখানে আলো ও শব্দের বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যা অনেক ট্যুরিস্টের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

ট্রিপ টিপস

  • আগে থেকে টিকিট কেটে রাখুন তাহলে লাইনে দাঁড়াতে হবে না

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://en.wikipedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading