কালনার ১০৮ শিবমন্দির

কালনার ১০৮ শিবমন্দির ভ্রমণ

পশ্চিমবঙ্গের নানা স্থানই সুপ্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের কারণে বিখ্যাত। ইতিহাসে এক এক রাজা বা এক এক শাসক তাঁর রাজত্বকালে নিজের কীর্তি স্থাপনের জন্য সমগ্র বাংলা জুড়েই বিভিন্ন স্থানে মন্দির, মসজিদ নির্মাণ করেছেন আর প্রাচীন বাংলার টেরাকোটার মন্দিরের ঐতিহ্য-খ্যাতি ভারত বিখ্যাত। তেমনই পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শন কালনার ১০৮ শিবমন্দির। আজ থেকে দুশো বছর আগে বিশেষ জ্যামিতিক পদ্ধতিতে নির্মিত এই ১০৮ শিবমন্দির আজও বাংলার ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে অক্ষত আছে এবং এটি বাঙালিদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় এক পর্যটনক্ষেত্র। মূলত পূর্ব বর্ধমানের ১০৮ শিবমন্দির আছে দুটি যার মধ্যে অন্যতম হল কালনার ১০৮ শিবমন্দির।

অম্বিকা কালনার রাজবাড়ি মঠের খুব কাছেই অবস্থিত কালনার ১০৮ শিবমন্দির। এই জায়গাটার নাম কালনার ঠাকুরপাড়া।

১৮০৯ সালে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র কালনার ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণ করান। এর আসল নাম ছিল নবকৈলাশ মন্দির। বলা হয় যে বিষ্ণুপুরে এই রাজাদের সম্পত্তি স্থানান্তর এবং দখলিস্বত্ব আরোপ উপলক্ষ্যে এই মন্দির বানানো হয়েছিল।  একসময় বারো জন ব্রাহ্মণ এই মন্দিরে পূজা করতেন। প্রত্যেক ব্রাহ্মণের উপর নয়টি করে শিবের পূজার দায়িত্ব ছিল এবং তাঁদের প্রত্যেককে দক্ষিণা বাবদ বারো আনা দেওয়া হত।

পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জায়গা থেকে ট্রেনে করে অম্বিকা কালনা স্টেশনে আসা যায়। কালনা স্টেশন থেকে এই ১০৮ শিবমন্দির খুব বেশি দূরে নয়। স্টেশনের পাশ থেকে টোটো বা রিক্সা ধরে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় কালনার ১০৮ শিবমন্দিরে। এছাড়া নিজের গাড়ি করে আসতে চাইলে মগরা উড়ালপুল অথবা সপ্তগ্রাম ত্রিবেণী হয়ে কালনা-কাটোয়া রোড ধরে কালনার ১০৮ শিবমন্দিরে আসা যায়।

কালনার ১০৮ শিবমন্দিরের আশেপাশে সেভাবে থাকার জায়গা বিশেষ নেই। অনেকাংশে পর্যটকরা একদিনের ট্যুরেই এই মন্দির ঘুরতে পছন্দ করেন এবং সময়ের হিসেবে একদিনে ঘুরে আসার সবথেকে আদর্শ জায়গাগুলির মধ্যে এটিও অন্যতম।

কালনার ১০৮ শিবমন্দির একেবারে ভিন্ন রীতিতে তৈরি হয়েছে। কালনার নবকৈলাশ মন্দির লম্বা সারির বদলে বৃত্তাকারে সজ্জিত। একমাত্র কালনার ক্ষেত্রেই সাদা ও কালো শিবলিঙ্গ একত্রে দেখতে পাওয়া যায়। এই মন্দিরগুলিও বাংলার প্রাচীন আটচালা রীতিতে তৈরি। কালনা রাজবাড়ির প্রাঙ্গণের প্রধান প্রবেশদ্বারের রাস্তার বিপরীতে দুটি বৃত্তকে কেন্দ্র করে কালনার ১০৮ শিবমন্দির গড়ে উঠেছে। বাইরের বৃত্তে রয়েছে ৭৪টি মন্দির, ভিতরের বৃত্তে রয়েছে ৩৪টি মন্দির। উল্লেখযোগ্যভাবে ভিতরের বৃত্তের সবকটি মন্দিরে সাদা শিবলিঙ্গ থাকলেও বাইরের বৃত্তের মন্দিরগুলিতে একটি মন্দির অন্তর সাদা শিবলিঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। পরিমাপের বিচারে বাইরের বৃত্তের ঘের প্রায় সাতশো ফুট আর ভিতরের বৃত্তের ঘের কমবেশি তিনশো ফুট। কালনার ১০৮ শিবমন্দিরের ভিতরের বৃত্তের মাঝে রয়েছে একটি বিরাট কূপ। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এখানে একটি গর্ত করে তাতে বিশালাকায় কম্পাস বসিয়ে চারদিকে এই বৃত্ত অঙ্কিত হয়েছিল যাতে মন্দিরগুলি স্থাপিত হবে। আবার অনেকের বিশ্বাস মন্দিরের মাঝে এই বিরাটাকায় কূপ নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ পরম শিবের প্রতীক। কেউ কেউ নিছকই মন্দির প্রাঙ্গণে জলের চাহিদা মেটানোর জন্যেই এই কূপ নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করেন। গবেষকদের মতে সাদা রঙ ত্যাগের এবং কালো রঙ ভোগের প্রতীক। ফলে এখানকার সাদা ও কালো রঙের শিবলিঙ্গের সহাবস্থান ত্যাগ ও ভোগের মধ্য থেকে চৈতন্যের জাগরণকে ইঙ্গিত করে। তবে এখানে সর্বমোট ১০৯টি শিবমন্দির রয়েছে। অতিরিক্ত শিবমন্দিরটি জলেশ্বর শিবমন্দির নামে অবস্থিত প্রধান রাস্তার পাশে যা একটি পঞ্চরত্ন মন্দির। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এখানে চারটির বেশি শিবলিঙ্গ দেখা যায় না। প্রথম বৃত্তটির দুটি দরজা – একটি উত্তরে, অন্যটি দক্ষিণে এবং দ্বিতীয় বৃত্তটিরও দুটি দরজা – একটি পূর্বে, অন্যটি পশ্চিমে। পুরাণ অনুসারে শিবের স্ত্রী পার্বতীর পিতৃগৃহ হল হিমালয়ে অর্থাৎ উত্তর দিকে। তাই সেই পৌরাণিক আখ্যানকে মান্যতা দিয়েই এখানকার শিবমন্দিরগুলির মাথায় গৌরীপট্টগুলি উত্তরমুখী। ১৯৬৫ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে এই প্রাচীন মন্দিরগুলির সংস্কার করা হয়।

মন্দির চত্বরে প্রবেশের আগে জুতো খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে আসতে হয়। মন্দিরের ভিতরে যেখানে সেখানে বসা যায় না। ছবি তুলতে চাইলে আগে ছবি তোলার উপরে কোনও নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা তা সংক্রান্ত নির্দেশিকা দেখে নিতে হবে। শিবমন্দির ভ্রমণের পরে চাইলে সাইটসিইং হিসেবে কালনার শিবমন্দিরের বিপরীতে ২৫ চূড়াবিশিষ্ট কৃষ্ণচন্দ্র ও লালজির মন্দির, টেরাকোটার প্রতাপেশ্বর মন্দির এবং রাসমঞ্চ ইত্যাদি ঘুরে আসা যায় একই দিনে। কালনার ১০৮ শিবমন্দির দেখে অদূরেই নবাবহাটে বর্ধমানের শিবমন্দিরটিও দেখে আসা যায়। তবে একদিনে দুটি শিবমন্দির দর্শন করার ইচ্ছা থাকলে আগে নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দির দেখে তারপর আসতে হবে কালনায়।

বছরের যে কোনও সময় কালনার ১০৮ শিবমন্দিরে আসা যায়। তবে মন্দির দর্শনের জন্য নির্দিষ্ট সময়-নির্ঘন্ট রয়েছে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী এই শিবমন্দিরটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা এবং তারপর দুপুর ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্য।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেনকালনার ১০৮ শিবমন্দিরটি দেখতে হলে ট্রেনে করে কাটোয়া স্টেশনে নেমে টোটো ধরে যাওয়া যায়। অন্যথায় নিজের গাড়ি থাকলে মগরা উড়ালপুল বা কালনা-কাটোয়া রোড ধরে কালনার শিবমন্দিরে আসা যায়।
  • কোথায় থাকবেন –   এখানে আশেপাশে কোথাও বিশেষ থাকার জায়গা নেই।
  • কী দেখবেন –  কালনার ঐতিহ্যবাহী ১০৮ শিবমন্দির এখানকার বিশেষ দ্রষ্টব্য। তাছাড়া সাইটসিইং-এর মধ্যে রয়েছে কালনার শিবমন্দিরের বিপরীতে ২৫ চূড়াবিশিষ্ট কৃষ্ণচন্দ্র ও লালজির মন্দির, টেরাকোটার প্রতাপেশ্বর মন্দির এবং রাসমঞ্চ ইত্যাদি।
  • কখন যাবেন –  বছরের যে কোনও সময় আসা গেলেও মন্দির প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা এবং দুপুর ৩টে থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
  • সতর্কতা –  
    • মন্দির প্রাঙ্গণে যথাসম্ভব নীরবতা বজায় রাখাই শ্রেয়।
    • মন্দিরের ভিতরে যেখানে সেখানে বসা উচিত নয়।
    • ছবি তোলার ক্ষেত্রে কোথাও নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নিয়মবিধির বিজ্ঞাপন দেখে নেওয়া দরকার।

আপনার মতামত জানান