বাংলার অধ্যাত্ম-সংস্কৃতির জগতে রামকৃষ্ণ পরমহংস এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর জন্মস্থান হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের কামারপুকুর একটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। রামকৃষ্ণদেবের জন্ম এবং বাল্যকাল কেটেছে এই কামারপুকুরে। ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে রামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুর অত্যন্ত পবিত্র এক তীর্থক্ষেত্র। আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। সপ্তাহান্তের ছুটিতে এমনকি একদিনেই ঘুরে দেখতে পারেন কামারপুকুর। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবেন সহজেই।
কামারপুকুর কোথায়
হুগলি জেলার আরামবাগ সাবডিভিশনের অন্তর্গত গোঘাট-২ সম্প্রদায় উন্নয়ন ব্লকের মধ্যে পড়ে কামারপুকুর গ্রাম। কামারপুকুরের উত্তর দিকে রয়েছে ভুরসুবো গ্রাম যেখানে এককালে মানিক রাজার বাস ছিল, পশ্চিম সীমানায় রয়েছে ভুতির খাল যা পরে গিয়ে মিশেছে আমোদর নদীতে আর কামারপুকুর গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে গড় মান্দারনের জঙ্গল। কামারপুকুর, শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার দূরে, কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং বর্ধমান থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তারকেশ্বরের শিবমন্দির কামারপুকুর থেকে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।
কামারপুকুরের ইতিহাস
কামারপুকুরের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনকে ঘিরে। ১৮৩৬ সালে এই কামারপুকুর গ্রামেই এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্ম হয়। তবে শ্রীরামকৃষ্ণের পৈতৃক ভিটে ছিল কামারপুকুর থেকেই অনতিদূরে দেড়ে গ্রামে। জমিদারদের অত্যাচারে বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি সব হারিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ ওরফে গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় বন্ধু সুখলাল গোস্বামীর আমন্ত্রণে কামারপুকুরে গিয়ে ওঠেন। সুখলাল গোস্বামী তাঁকে যে জমি দিয়েছিলেন সেই জমি লক্ষ্মীজলা নামে পরিচিত হয়। শোনা যায় এই জমিতে এত ধান হত যে অতিথিদের পেট পুরে খাইয়েও ক্ষুদিরামের পরিবারে অভাব ছিল না। কামারপুকুর গ্রামের আদি নাম ছিল সুখলালগঞ্জ। গ্রামের আদি জমিদার সুখলাল গোস্বামীর নামেই এই নাম এবং সুখলালগঞ্জ, মুকুন্দপুর, শ্রীপুর, মধুবাটী ও কামারপুকুর — এই পাঁচটি ছোট গ্রাম ছিল কাছাকাছি। অনেকের মতে, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের ভিক্ষামাতা ধনী কামারিনীর পিতৃকুলের কোন এক ব্যক্তিকে দিয়ে স্থানীয় শাসনকর্তা মানিকরাজা যে পুকুরটি খনন করিয়েছিলেন, তাকে কামারদের পুষ্করিনী নামে অভিহিত করা হত। কামারদের পুকুর থেকেই কামারপুকুর নামটির উদ্ভব ঘটে বলে মনে করা হয়। এই গ্রামেই শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যকাল কেটেছে। গ্রামের পূর্বপাড়ে বুধুই মোড়লের শ্মশান, ভুতির খালের কাছে এসে গদাধর কৈশোরের বহু সময় কাটিয়েছেন। কামারপুকুরের উত্তরে যে ভুরসুবো গ্রাম ছিল, তার রাজা মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের খুব কাছের বন্ধু। তাঁর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই চলে যেতেন বালক গদাধর। এই সবই আজ ইতিহাস, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আজও অক্ষত আছে এই গ্রামে।
কামারপুকুর কীভাবে যাবেন
ট্রেনে করে কামারপুকুর যেতে হলে হাওড়া ট্রেনে করে কামারপুকুরের নিকটবর্তী স্টেশন গোঘাটে নামতে হবে। তারপর টোটো বা মারুতিগাড়ি ভাড়া করে কামারপুকুর যেতে হবে। স্টেশন থেকে শেয়ার গাড়িতে গেলে মাথাপিছু খরচা পড়বে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। অনেকে সকালে কামারপুকুর গিয়ে রাতের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসেন। সকলের সুবিধার্থে হাওড়া এবং গোঘাটের লোকাল ট্রেনের সময়সূচী নিচে দেওয়া হল।
| ট্রেন নাম্বার | ট্রেনের নাম | কোথা থেকে ছাড়বে | কখন ছাড়বে | কোথায় পৌঁছবে | কখন পৌঁছবে |
|---|---|---|---|---|---|
| ৩৭৩৭১ | হাওড়া গোঘাট লোকাল | হাওড়া | ভোর ৪টে ২২ মিনিট | গোঘাট | সকাল ৭টা |
| ৩৭৩৭৩ | হাওড়া গোঘাট লোকাল | হাওড়া | সকাল ৭টা ২৫ মিনিট | গোঘাট | সকাল ১০টা |
| ৩৭৩৭৫ | হাওড়া গোঘাট লোকাল | হাওড়া | সকাল ১০টা ৩৫ মিনিট | গোঘাট | বেলা ১টা |
| ৩৭৩৭২ | গোঘাট হাওড়া লোকাল | গোঘাট | সকাল ৭টা ৩০ মিনিট | হাওড়া | সকাল ১০টা ৪ মিনিট |
| ৩৭৩৭৪ | গোঘাট হাওড়া লোকাল | গোঘাট | বেলা ১টা ১০ মিনিট | হাওড়া | দুপুর ৩টে ৩০ মিনিট |
| ৩৭৩৭৬ | গোঘাট হাওড়া লোকাল | গোঘাট | সন্ধ্যে ৭টা ৫ মিনিট | হাওড়া | রাত ৯টা ২৮ মিনিট |
অনেকে আবার একদিনেই তারকেশ্বর-কামারপুকুর-জয়রামবাটি ঘুরতে যান। সেক্ষেত্রে তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে পাশেই তারকেশ্বর বাসস্ট্যাণ্ড থেকে কামারপুকুরগামী বাসে উঠে পড়া যাবে। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর গামী বাসে করেও কামারপুকুর যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে বাসে গেলে কামারপুকুর পৌঁছাতে ঘন্টা চারেক সময় লাগে। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখা ভাল যে কামারপুকুরগামী বাসগুলো সাধারণত লাক্সারি বাস হয় না, তাই বাসে সফর করলে বড় ব্যাগ নিয়ে গেলে অসুবিধায় পড়তে পারেন। লোকাল ট্রেনের ক্ষেত্রেও একই অসুবিধা। তবে গাড়ি নিয়ে গেলে এই অসুবিধা নেই। কলকাতা থেকে গাড়ি করে যাওয়ার ক্ষেত্রে ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কামারপুকুরে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাগে।
কামারপুকুরে কোথায় থাকবেন
কামারপুকুরে থাকবার সবথেকে ভাল জায়গা কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠ যাত্রীনিবাস। কামারপুকুরে যেহেতু ঠাকুর রামকৃষ্ণের জন্মস্থান দেখতেই লোকে যান, তাই যাত্রীনিবাসে থাকলে ঠাকুরের জন্মস্থানের কাছে থাকতে পেরে মনটাও ভরে যাবে, আবার এখানে থাকলে মঠে ভোরের আরতি দেখতে পাবেন। অন্য কোথাও থাকলে ভোরের আরতি দেখা যায় না। তবে এখানে থাকতে হলে দুই থেকে তিনমাস আগে আশ্রমের আধিকারিকের সাথে ইমেইলের মাধ্যমে এখানে থাকবার অনুমতি নিতে হবে। একই সাথে খেয়াল রাখবেন তিন রাতের বেশি এখানে থাকার অনুমতি পাওয়া যায় না। অন্যান্য সময়ের তুলনায় পুজোর সময় ভিড় অত্যন্ত বেশি থাকে বলে থাকার জায়গা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে পুজোর সময় ঘোরার হলে অবশ্যই অনেক আগে থেকে আশ্রমে কথা বলে রাখাই শ্রেয়। এখানে থাকবার জন্য কোনও নির্ধারিত মূল্য নেই। যাত্রীনিবাস ছেড়ে বেরোনোর সময় দান হিসেবে যে টাকা আপনি দেবেন ওনারা তাই গ্রহণ করবেন। ঘরের ভিতর ছবি তোলা নিষেধ। রামকৃষ্ণ মঠ যাত্রীনিবাস ছাড়াও এখানে প্রচুর লজ আছে। লজগুলো সাধারণত কামারপুকুর পৌঁছেই বুক করতে হয়। তবে লজে যদি থাকতেই হয় তাহলে মঠের কাছে কোনও লজে থাকবেন, তাহলে সুবিধা হবে। যদি নিজে গাড়ি নিয়ে যান, তাহলে আগে থেকে লজের সাথে কথা বলে নেবেন যাতে গাড়ি পার্কিং নিয়ে কোন অসুবিধায় না পড়তে হয়।
কামারপুকুরে কী দেখবেন
কামারপুকুরে যে দ্রষ্টব্য স্থানগুলো রয়েছে, সেগুলো সবকটিই মূলত শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনের কোনও না কোনও অংশের সাথে জড়িয়ে। টোটো করে সেই সব দ্রষ্টব্য স্থানগুলি ঘুরে দেখতে পারেন। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও টোটো করে ঘোরাই সুবিধাজনক কারণ বেশ কিছু জায়গায় গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না।

রামকৃষ্ণ মঠ – কামারপুকুরের প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান হল কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠ। এর ভিতরে রয়েছে রামকৃষ্ণদেবের বাসঘর। এক সময় এই দক্ষিণমুখী মাটির ঘরেই তিনি বাস করতেন। সেই পুরনো দিনের মতো খড়ের চালার মাটির বাড়িদুটি এখনও দেখা যায়। যদিও একে সংরক্ষণের জন্য অনেক সংস্কার করা হয়েছে।বাড়ির দাওয়ায় আগে যে ঢেঁকি আর উনুন ছিল বলে জানা যায়, ঠিক একইরকম প্রতিরূপ গড়ে তোলা হয়েছে এখানে। মূর্তি তৈরি করে রামকৃষ্ণের জন্মের সময়কার ঘটনা দেখানো হয়েছে। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে তিনি মা সারদাকে বলেছিলেন “আমার মৃত্যুর পরে, তুমি কামারপুকুরে থাকবে, সবুজ শাক সবজি চাষ করবে, সহজ সরল ভাবে জীবন যাপন করবে এবং ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে তোমার দিন কাটাবে।”
শ্রীরামকৃষ্ণের বাসঘরের বামদিকে রয়েছে রঘুবীরের মন্দির। শ্রীরামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের তাঁর কুলদেবতা রঘুবীরের মন্দির তৈরি করেছিলেন এখানে। শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির তৈরির সময় এই রঘুবীরের মন্দিরটিও ভেঙে নতুন করে পাকা করা হয়। পুরনো রঘুবীর মন্দিরটি ছিল পূর্বমুখী এবং মাটির ঘরে খড়ের ছাউনি দেওয়া। বর্তমানে রঘুবীরের মন্দিরটি ঐ একই স্থানে তৈরী করা হয়েছে। এখানে রঘুবীরের শিলা, রামেশ্বর শিবলিঙ্গ, শীতলা দেবীর মাটির ঘট ইত্যাদি রয়েছে। বাসঘরের পাশেই দেখা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির। তিনি সেখানে জন্মেছিলেন, সেখানেই তৈরি হয়েছে মন্দিরটি। মন্দিরে রয়েছে ঠাকুরের শ্বেতপাথরের মূর্তি। ঠাকুরের ঘরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে নাটমন্দির। সেখানের পরিবেশ এত সুন্দর ও শান্ত যে বসলে মনে অপার শান্তি আসে।
মঠের মূল গেটে রয়েছে যুগীদের শিবমন্দির। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে এই মন্দিরের সামনেই গদাধরের (শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যকালের নাম) মা চন্দ্রামণি দেবী দেখেছিলেন অলৌকিক উজ্জ্বল এক আলো যা শিবলিঙ্গ থেকে সোজা এসে পড়েছিল তাঁর গর্ভে। তারপরই গদাধরের জন্ম হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। মঠের ভিতরে ছবি তোলা একেবারেই নিষেধ। ধরা পড়লে ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং সেক্ষেত্রে নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশন থেকে আপনাকে ফোন সংগ্রহ করতে হবে।

হালদার পুকুর – মঠের মূল গেটের ঠিক উলটোদিকে রয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি পুকুর। এর নাম হালদার পুকুর। এখানে বালক গদাধর ছোটোবেলায় বাল্যবন্ধুদের নিয়ে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন। পরবর্তীকালে মা সারদাও এখানে স্নান করতেন। তাঁদের স্পর্শে এই পুকুরের জলকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করেন ভক্তেরা। মঠ থেকে বেরিয়ে পুকুরপাড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। এই পুকুর এখনও খুব সুন্দর করে পরিষ্কার রাখা হয়েছে। একে কোনভাবে নোংরা করবেন না।
লক্ষ্মীজলা – হালদার পুকুরের পশ্চিমে অবস্থিত ধানক্ষেতের নাম লক্ষ্মীজলা। নিজের গ্রামে জমিদারদের অত্যাচারে বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি সব হারিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়, বন্ধু সুখলাল গোস্বামীর আমন্ত্রণে কামারপুকুরে এসে ওঠেন। সুখলাল গোস্বামী তাঁকে যে জমি দিয়েছিলেন সেই জমিই লক্ষ্মীজলা নামে পরিচিত হয়। শোনা যায় এই জমিতে এত ধান হত যে অতিথিদের পেট পুরে খাইয়েও ক্ষুদিরামের পরিবারে অভাব ছিল না।
লাহাদের দুর্গামন্দির, পাঠশালা ও বিষ্ণুমন্দির – কামারপুকুরে লাহাবাবুরা ছিলেন গ্রামের জমিদার। সেই বংশেরই একজন জমিদার ধর্মদাস লাহা একটি দুর্গামন্দির তৈরি করেছিলেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত সেই দুর্গামন্দিরে আজও মহাসমারোহে লাহাদের দুর্গাপূজা হয়। বালক গদাধর এখানের মায়ের মূর্তিতে চক্ষুদান করতেন।

দুর্গামন্দিরের সামনের বিশাল নাটমন্দিরে বসত পাঠশালা আর এখানেই পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হয়েছিলেন গদাধর। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পড়তে এবং লিখতে শিখেছিলেন, কিন্তু তারপরই পড়াশোনায় তাঁর আগ্রহ আসত না। তিনি পাঠশালার পড়াশোনার চেয়ে পুরাণের গল্প শুনতে এবং গ্রামের নাটকে অভিনয় করতে বেশি পছন্দ করতেন। পাঠশালায় যখন তাঁর পড়াশোনা করতে ভাল লাগত না, তখন তিনি কাছেই লাহাদের বিষ্ণুমন্দিরে এসে মা কালীর মূর্তি আঁকতেন ও ধ্যান করতেন।
পাঠশালার কাছেই লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দিরটি অবস্থিত। এটি দেখতে দালানের মত। মন্দিরটির সামনের দেয়ালের উপরে এবং দুই পাশে মোট ২০টি পোড়ামাটির মূর্তি রয়েছে। গর্ভগৃহে সিংহাসনে দামোদর শিলা। মন্দিরের বাইরে ধর্মদাস লাহার মূর্তি স্থাপিত আছে। ভেতরে মন্দিরের উলটোদিকে ছাউনি ঘেরা অঞ্চলে গদাধরের ছেলেবেলার বিভিন্ন ঘটনা মূর্তি তৈরি করে দেখানো হয়েছে।

পাইন বাড়ি – কামারপুকুরে গদাধরদের বাড়ির কিছু দূরেই বেনেপাড়ায় ছিল সীতানাথ পাইনের বাড়ি। পাইনদের বাড়িতে গদাধরের নিয়মিত যাতায়াত থাকলেও সেই সময় বাড়ির অভ্যন্তরে বহিরাগত কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে মা কাকিমাদের মুখে রামায়ণ, মহাভারতের গল্প শোনবার জন্য গদাধর বাল্যকালে বিধবা নারীর ছদ্মবেশে সীতানাথ পাইনের বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করতেন এবং মন দিয়ে গল্প শুনতেন।
এই পাইনদের বাড়িতেই শিবরাত্রিতে যাত্রাগানের আয়োজন করা হত। ১৮৪৬ সালের শিবরাত্রির সময়ে যাত্রায় যার শিব সাজবার কথা ছিল সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বালক গদাধরকে শিবের ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হয়। তাঁর সাজে আর ভঙ্গীতে উপস্থিত দর্শকেরা বাকরুদ্ধ হয়ে তাঁকে দেখছিলেন। এরপর গদাধর শিবের ভাবে বিভোর হয়ে পড়েন এবং তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। সেই মঞ্চ আজও আছে এবং তাঁর পাশেই এই কাহিনী একটি বোর্ডে লেখা আছে।
এছাড়াও কামারপুকুরে অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে কামারদের পুকুর, গোপেশ্বর শিব মন্দির, ধনী কামারনীর মন্দির, বুধুই মোড়লের শ্মশান, চিনু শাঁখারীর বাস্তুভিটা ইত্যাদি। কামারপুকুরের সাইটসিইং হিসেবে দেখতে পারেন জয়রামবাটির মাতৃমন্দির, বিশালাক্ষী মায়ের মন্দির, সিংহবাহিনীর মন্দির, মায়ের ঘাট ও আমোদর নদ, গড় মান্দারন, মানিকরাজার ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ, দেরেপুর, ভানুপিসির বাড়ি, শিহড়ে হৃদয়রাম মুখার্জীর বাড়ি ইত্যাদি।
কামারপুকুরে কখন যাবেন
বছরের যে কোনো সময়েই কামারপুকুর যাওয়া যেতে পারে। তবে রামকৃষ্ণ মিশনের মঠে প্রবেশের বিশেষ সময়সূচি রয়েছে। এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মঠ ভোর ৬টা থেকে দুপুর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মঠ খোলা থাকে। গ্রীষ্মকালে খুব গরম থাকে তাই সেই সময় এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
কামারপুকুরে কী খাবেন
কামারপুকুরে গেলে রামকৃষ্ণ মঠের অন্নভোগ খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না করাই ভাল। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া দরকার। প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের অন্নভোগের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে। বেলা সাড়ে ১১টায় খাওয়া শুরু হয়। এছাড়া মঠের বাইরে কিছুদূর এগোলেই বিভিন্ন মিষ্টির দোকান রয়েছে। সেখান থেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সাদা বোঁদে খেয়ে দেখতে পারেন। তবে এই বোঁদে অতিরিক্ত মিষ্টি, কিনে নিয়ে যাওয়ার আগে একটুখানি কিনে স্বাদ নিয়ে দেখতে পারেন।
কামারপুকুরে কী কিনবেন
কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠের ভিতরে রয়েছে পল্লীভবনের স্টল যেখানে গ্রামীণ মহিলাদের হাতে তৈরি শাড়ি, গামছা, ধূপ, শৌখিন জিনিস, আচার, ঘি, মধু ইত্যাদি পাওয়া যায়। কম দামে এখানে ভাল জিনিস পাওয়া যায়। এর পাশেই রয়েছে মঠের নিজস্ব স্টল যেখানে বিভিন্ন বই পাওয়া যায়। তাছাড়াও মঠের বাইরে বেশ কিছু দোকান রয়েছে যেখানে গ্রামের মানুষের হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস কিনতে পাওয়া যায়।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- রামকৃষ্ণ মঠ যাত্রীনিবাসে থাকার জন্য আগে থেকে ইমেইলের মাধ্যমে আশ্রমের মহারাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তবে এখানে আসা উচিত। ইমেইল ছাড়া অন্য কোনভাবেই এখানে বুকিং পাওয়া যায় না।
- আশ্রম ও মঠ প্রাঙ্গণ যাতে কোনভাবে নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
- মন্দিরের মধ্যে ছবি তোলা যায় না, ফলে মন্দিরে ঢোকার সময় ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন মোবাইল ফোন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। ছবি তুললে ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন সংগ্রহ করতে হয়।
- রামকৃষ্ণ মঠ এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভোর ৬টা থেকে দুপুর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
- নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও টোটো করে ঘোরাই সুবিধাজনক কারণ বেশ কিছু জায়গায় গাড়ি প্রবেশ করতে পারবেনা।
- কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি দুই জায়গাতেই প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে।
ট্রিপ টিপস
- কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চল থেকে কামারপুকুর এক দিনে ঘুরে নিতে চাইলে ভোরের বাস বা ট্রেন ধরে সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছে দুপুরের বাসে বা ট্রেনে ফিরে আসতে পারেন। তাহলে হাতে অনেকটা সময় পাওয়া যাবে। তবে দুদিন হাতে সময় নিয়ে বেরোলে প্রতিটি স্থান খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
- রামকৃষ্ণ মঠের ভিতর পল্লীভবনের স্টল থেকে ন্যায্যমূল্যে বিশুদ্ধ ঘি কিনতে পাওয়া যায়।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান