প্রাচীন রোমান সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় নাম ভার্জিল (Virgil)। রোমানরা আজও সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে ভার্জিলকে তাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলে। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ধরা হয় মহাকাব্য ঈনিড কে।
৭০ খ্রিস্টপূর্বে ১৫ অক্টোবর ইতালির মানতুয়ার কাছাকাছি আন্দেজ নামক স্থানে ভার্জিলের জন্ম হয় । তাঁর সম্পূর্ণ নাম পাবলিয়াস ভার্জিলিয়াস মারো। ইংরেজি ভাষায় ভার্জিলিয়াস শব্দটিকে ‘ভার্জিল’ লেখা হয়। সেই থেকেই তাঁর পরিচয় হয় ভার্জিল নামে। আজ তিনি সে নামেই বিশ্বজুড়ে খ্যাত।
তাঁর বাবা ছিলেন একজন কৃষক। গ্রাম্য পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে সরল গ্রাম্য জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। দেশকেও তিনি ভালবেসেছিলেন অকৃত্রিমভাবে। পরবর্তীকালে তাঁর গোটা কাব্যধারায় দেশ ও দেশের গৌরবগাথা যে গভীর ও ব্যাপকভাবে উপস্থাপিত হয় তার মূলে ছিল তাঁর জন্মস্থানের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা।
ভার্জিলের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়সে ইতালির মিলান প্রদেশের ক্রেমোনা শহরে। এরপর উচ্চ-শিক্ষা লাভ করেন তিনি রোম থেকে। ভার্জিল তাঁর শিক্ষাজীবনেই প্রাচীন রোমের এবং গ্রিক ভাষার বিভিন্ন বই পড়ে কাব্য, দর্শন এবং ইতিহাসশাস্ত্রের ওপর অর্জন করেন প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। এ সময় তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে একজন ছিলেন ইপিকুরাসীয় মতবাদে বিশ্বাসী সিরো। ভার্জিল তাঁর শিক্ষক সিরো লিখিত প্রাচীন গ্রিক দর্শনের বইগুলি থেকে তাঁর কাব্যসাহিত্যের ওপর প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন, যার প্রভাব পড়েছিল তাঁর প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলির ওপর।
ভার্জিল ছিলেন মূলত একজন কবি। দেশাত্মবোধক কবিতার জন্যই তিনি সেসময় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর অমর ও কালজয়ী রচনা ঈনিড (Aeneid) মহাকাব্যে রোম সাম্রাজ্যের অতীতের গৌরবময় দিনের কাহিনী তিনি বর্ণনা করেছেন। বিধৃত সেই সময়ের কথা, যখন রোম সাম্রাজ্যের জয় জয়কার ছিল সারা ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে। রোমের বীর সেনাপতিরা অভিযান চালাতেন দেশ থেকে দেশান্তরে। একটির পর একটি রাজ্য জয় করতেন। সেই গৌরবময় দিনের কথা কবি।
জাতির সামনে অতীত গৌরবগাথাকে উপস্থাপন করে তিনি দেশবাসীর মনে দেশ প্রেমে জাগ্রত করার চেষ্টা করে গেছেন। ভার্জিল ব্যাক্তিগতভাবে একেবারেই রাজনীতিসচেতন ছিলেন না। তিনি জীবনে কখনও রাজনৈতিক বা সামরিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হননি সচেতনভাবেই। ব্যক্তি হিসেবে তিনি একান্তই নিরীহ ও ভীষন লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। এছাড়া শারীরিকভাবেও তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও শীর্ণকায় মানুষ। কাব্য এবং কবিতাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। ধীরে ধীরে তার কাব্যপ্রতিভাই তাঁকে
গোটা রোম সাম্রাজ্যের সর্বত্র পরিচিত করে তোলে। দেশের বহু গণ্যমান্য মানুষ তাঁর বন্ধু হয়ে ওঠেন। তাঁর নাম ও খ্যাতি দেশের সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। ভার্জিলের জন্ম হয়েছিল গ্রামে। তাই গ্রাম্য শিল্পসাহিত্যের একটা প্রভাব তাঁর ওপরেও
ভার্জিল রচিত বিখ্যাত তিনটি কাব্যগ্রন্থের একটি হল একোলোগীউস (Ecologues)। এই কাব্যগ্রন্থটির সন্ধান পাওয়া গেছে ভার্জিলের মৃত্যুর পর। এটির রচনাকাল সম্ভবত ৪২ থেকে ৩৭ খ্রিষ্টপূর্বের মধ্যে। একোলোগীউস গ্রন্থটির অনেকগুলি কবিতা গ্রিক কবি থিওক্রিটস-এর কাব্যের অনুসরণে লিখিত হয়েছে। মোট দশটি গ্রাম্যগাথার সংকলন ছিল এই কাব্যগ্রন্থটি।
ভার্জিলের পরবর্তী কাব্য জর্জিস (Georgies)-এ কবিতার বিষয়বস্তু হয়েছে দেশের গৃহযুদ্ধের। ৩৬ থেকে ২১ খ্রিস্টপূর্ব সময় পরিসরে যখন কাব্যটি রচিত হয়, তখন ইতালীয় গৃহযুদ্ধ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ কাব্যে তারই প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত। ভার্জিল তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন রোমসম্রাট অগাস্টাস সিজারকে।
ভার্জিলের ঈনিড মহাকাব্যের কাহিনীর বিষয়বস্তু ছিল হোমার রচিত ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্য। ভার্জিল তাঁর কাব্যে অগাস্টাস সিজারকে সেই অতীত বীরত্বের সার্থক উত্তরসূরি বলে কল্পনা করেছিলেন। তিনি মনে করলেন, ট্রোজান যুদ্ধের পর রোমের যে গৌরব হারিয়ে গিয়েছিল, অগাস্টাস সিজারের হাত দিয়ে আবার তা ফিরে আসবে। এই মহাকাব্যটি রচনা করতেই কেটে গিয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ এগারোটি বছর। কিন্তু তিনি খুশি হতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত। তাঁর মনে হয়েছিল কিছু অংশ এখনও বেশ দুর্বল। তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণভাবে বলা হয়নি। তাই তিনি ভাবলেন, কাব্যটির দুর্বল অংশগুলি আবার লিখে সংশোধন করে তারপর এর প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন, তার আগে নয়। এই ভেবে তিনি রোম ছেড়ে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু সমুদ্রযাত্রা করাকালীন প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ব্রান্ডিসিয়াম নামক বন্দরে ১৯ খ্রিস্টপূর্বের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
ভার্জিল তাঁর শেষ কাজ ঈনিড সংশোধন করে যেতে পারেননি। মৃত্যুর আগে তাই তিনি তাঁর অসমাপ্ত কাব্য ঈনিডের পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলার জন্য আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। রোম সম্রাট অগাস্টাস সিজারের হস্তক্ষেপের কারণে তাঁর এই অন্তিম ইচ্ছা পালিত হয়নি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to হোমার | সববাংলায়Cancel reply