বিজ্ঞান

সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে তুলনামূলকভাবে বড় হয় কেন

দীঘা, পুরী কিংবা গোয়া – সমুদ্রের টানে বার বার ছুটে যায় সাত থেকে সত্তর সকলেই। গঙ্গাসাগরের পুণ্যস্নান বা সমুদ্রের তীরে জলকেলী – সব ক্ষেত্রেই ঢেউ না থাকলে আনন্দ পাওয়া যায় না। আবার লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে তুলনামূলকভাবে বড় হয় যেন হঠাৎই উচ্চতা বাড়িয়ে আছড়ে পড়ে। এখানে আমরা জেনে নেবো ঢেউ তৈরির কারণ ও ঢেউয়ের বড়ো কিংবা ছোট হওয়ার পিছনের বিজ্ঞান এবং অতি অবশ্যই সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে তুলনামূলকভাবে বড় হয় কেন।

সমুদ্র কখনও পুরোপুরি শান্ত থাকে না। এটা ঠিক যে তীরে দাঁড়িয়ে দেখলে বা নৌকা কিংবা জাহাজে চড়লে বেশি ঢেউ দেখা যায় কিন্ত এই ঢেউ আসলে শক্তিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সঞ্চালিত করে, জলকে নয়। ঢেউ মূলত বায়ুপ্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয়। এছাড়া কোরিওলিস বল, সমুদ্র জলের ঘনত্বের পার্থক্য ও সমুদ্রের আকারের তফাৎ ইত্যাদি কারণেও ঢেউ ও স্রোতের সৃষ্টি হয়। বায়ু ও সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশের জলের মধ্যে ঘর্ষণের জন্যও উপরীপৃষ্ঠ ঢেউ (surface wave) তৈরি হয়। চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ বলের জন্য সমুদ্র ও নদীতে জলস্ফীতি ঘটে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন ঝড়-ঝঞ্ঝা ও সুনামি ইত্যাদি সমুদ্রে ভয়ঙ্কর ও শক্তিশালী ঢেউ তৈরি করে। সমুদ্রের ঢেউ কত বেগে ও কী আকারে তীরে আছড়ে পড়বে তা নির্ভর করে মূলত সমুদ্রতলের আকার ও উপকূলের ভূমির প্রকৃতি এবং জলের গভীরতার উপর। ঢেউ যখন তীরের দিকে এগিয়ে যায় এর বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে ও উপকূলের মাটির সঙ্গে সংঘাত ঘটায়। ঢেউগুলো বয়ে আনা শক্তি এই সংঘাতের ফলে ওই অঞ্চলের জলে সঞ্চালিত করে। এর ফলে একটা স্রোতের (longshore current) সৃষ্টি হয়। এই স্রোত তীরের সমান্তরালে কাজ করে। ঢেউ এর বেগের মান ও কত কোণে উপকূলে আছড়ে পড়ছে তার উপর নির্ভর করে এই স্রোতের বৈশিষ্ট্য। এই কোণের মান কম হলে অর্থাৎ সূক্ষকোণ হলে অর্থাৎ খাড়াই উপকূলের ক্ষেত্রে স্রোত তুলনামূলক বড়ো হবে। অন্যদিকে কোণের মান বড়ো হলে অর্থাৎ ঢালু উপকূলের ক্ষেত্রে স্রোতও তুলনামূলক কম হবে।

সমুদ্রের ঢেউএ তো গেল ঢেউ তৈরির কারণ, বিভিন্ন উপকূলে ঢেউ এর আকার কেমন হবে তার ব্যাখ্যা। এবার আসা যাক, সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে তুলনামূলকভাবে বড় হয় কেন সেই প্রসঙ্গে। সমুদ্রের উপরিতলের ঢেউ বায়ু প্রবাহের ফলে তৈরি হয়। আর এও বলা হয়েছে ঢেউ এর মাধ্যমে শক্তির স্থানান্তর হয় জলের নয়। আসলে জলের কণা গুলি সাধারণত একই জায়গায় বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে। উপকুলভাগে ঢেউ এর প্রকৃতি তার তলদেশ এর নির্ভর করে একথাও আগেই বলা হয়েছে। যখন ঢেউ উপকুলের কাছাকাছি পৌঁছায় তখন ঢেউ এর মূল (wave base) ভূমি স্পর্শ করে। তলদেশ ভূমি স্পর্শ করার ফলে ঘর্ষণের জন্য ক্রমশ গতি হারায় ফলে পিছনের ঢেউ তার কাছাকাছি চলে আসে। ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wave length) কমতে থাকে। কিন্তু ঢেউ সেই একই পরিমাণ শক্তি বহন করে ফলে তা বজায় রাখতে ঢেউ এর উচ্চতা বাড়তে থাকে। এটাই হল উপকূলের ঢেউ এর উচ্চতা বৃদ্ধির মূল কারণ।

এরপর, এই ভাবে যেতে যেতে একটা সময় ঢেউ এর উচ্চতা ঢেউ এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ১/৭ (সাত ভাগের এক ভাগ) ভাগকে ছাড়িয়ে গেলে ঢেউ এর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং ঢেউ ভেঙ্গে (breaker) যায়। সাধারণত ঢেউগুলি ভেঙ্গে গিয়ে সামনের দিকে বাঁক খেয়ে পড়ে কারণ নিচের দিকের জল ঘর্ষণের কারণে উপরের জলের থেকে ধীরে চলতে থাকে এবং যখন ঢেউ ভেঙ্গে যায় এর উপরিভাগে জল থাকলেও নীচে কোন জল থাকে না তাকে ধরে রাখার জন্য।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন