মূলত মেরু অঞ্চলে রাতের আকাশে রঙবেরঙের প্রাকৃতিক আলোর যে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দেখা যায় তা মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভা বা অরোরা (Aurora) নামে পরিচিত। উত্তর মেরুতে একে অরোরা বোরিয়ালিস (aurora borealis) এবং দক্ষিণ মেরুতে অরোরা অস্ট্রালিস (aurora australis) বলা হয়। মেরুপ্রভার এই মনোরম দৃশ্য দেখার থেকে আমরা বঞ্চিত, যদি একান্তই অরোরা দেখতে হয় তাহলে আমাদের যেতে হবে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত দেশগুলিতে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে অরোরা মেরু অঞ্চলেই দেখা যায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আমাদেরকে জানতে হবে অরোরা তৈরি হয় কীভাবে?
সাম্প্রতিক পোস্ট
অরোরা তৈরি হয় কীভাবে?
সূর্য থেকে প্রতি মুহূর্তে সৌর বায়ুর (Solar Wind) মাধ্যমে অসংখ্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কণা নির্গত হচ্ছে। এই কণাগুলি মহাকাশ পেরিয়ে এসে পৃথিবীতে প্রবেশ করে। উচ্চ ক্ষমতা সম্পণ্ণ কণাগুলির এই বিকিরণ জীবজগতের পক্ষে বেশ ক্ষতিকর। তবে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র জীবজগতকে এই বিকিরণ থেকে রক্ষা করে ফলে এই সমস্ত কণা পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে জমা হয়।
আসলে পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটি বড় কাল্পনিক চুম্বক রয়েছে যার দক্ষিণ মেরু পৃথিবীর উত্তর মেরুর কাছে ও উত্তর মেরু পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর কাছে অবস্থান করছে। পৃথিবীর এই কাল্পনিক চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা (Magnetic lines) সাধারণ দন্ড চুম্বকের মতোই এক মেরু থেকে অন্য মেরুর দিকে বিস্তৃত হয়ে দুই মেরুতে মিলিত হয়। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রটি নিরক্ষীয় এলাকায় সর্বাধিক স্ফীত এবং মেরু অঞ্চলে একত্রিত হয়। চৌম্বক ক্ষেত্রের এই বলরেখাগুলিই সূর্য থেকে আসা উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আয়নিত কণাগুলিকে মেরু অঞ্চলের দিকে নিয়ে যায়। ফলে কণাগুলি উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে। নিচের ছবিটি দেখলে এই বিষয়টি সহজেই বোঝা যাবে।
বায়ুমন্ডলে প্রবেশের পর এই কণাগুলির সঙ্গে বাতাসের বিভিন্ন গ্যাসীয় কণার সঙ্গে সংঘর্ষ হয় ও গ্যাসীয় কণাগুলি উত্তেজিত হয় ও ইলেকট্রন কণাগুলি উচ্চ কক্ষপথে চলে যায়। পরে যখন আবার কণাগুলি স্থিতাবস্থা লাভ করার সময় ইলেকট্রনগুলি উচ্চ কক্ষপথ থেকে নিম্নকক্ষ পথে নেমে আসে এবং সেই সময় যে শক্তি (ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক তরঙ্গ) ছাড়ে তাই নানা বর্ণের আলো হিসেবে দেখে যায়। যেমন অক্সিজেনের ক্ষেত্রে এই আলোর রং হয় সবুজ বা লাল আলো, নাইট্রোজেনের ক্ষেত্রে নীল বা বেগুনী আলো।

অরোরা মেরু অঞ্চলেই দেখা যায় কেন?
এবার আসা যাক মূল প্রশ্নে। অরোরা তৈরি হওয়ার পদ্ধতির মধ্যেই রয়েছে এর উত্তর। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অরোরা দুই মেরুতে তৈরি হওয়ার পিছনে দায়ী। কারণ নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে যত দূরে যাওয়া যায় ততই চৌম্বক ক্ষেত্রের বিস্তার কমে আসে। চৌম্বক ক্ষেত্রটি আসলে বর্মের মতো শক্তিশালী কণাগুলি থেকে পৃথীবীকে রক্ষা করে ও সেগুলিকে দুই মেরুর দিকে কেন্দ্রীভূত করে।
তবে সূর্য থেকে করোনাল মাস ইজেকশনের ফলে প্রচুর পরিমাণে কণা নির্গত হলে ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি হয়। এই ঝড়ের প্রভাবে এই ধরণের শক্তিশালী কণা প্রচুর পরিমানে তীব্র গতিতে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে আঘাত করে, তখন কখনও কখনও অন্যান্য অংশেও অরোরার আলো দেখতে পাওয়া যেতে পারে। যেমন, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের লাদাখ অঞ্চল থেকেও অরোরা দেখা গেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সৌরচক্রের বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে সৌর ঝড়ের হার বাড়ে বা কমে, সূর্যের ভিতরে এই ধরণের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে পড়ুন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান