বিজ্ঞান

সোলার মিনিমাম বা সৌর সর্বনিম্ন বা সূর্যের লকডাউন

লকডাউনের জন্য সারা পৃথিবীতে যেমন অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়েছে ঠিক এই সময়েই সৌরজগতের মধ্যমনি সূর্যেও লকডাউন চলছে। অবাক হবেন না, সূর্যের এই ধরণের লকডাউনকে বিজ্ঞানের ভাষায় সোলার মিনিমাম (solar minimum) বা সৌর সর্বনিম্ন অবস্থা বলা হয়। সূর্যের তাপে পুড়তে ও রোদের ঝলকানি দেখতে অভ্যস্ত আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা সূর্যের এই পরিবর্তন একদম বুঝতে পারেন না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কিন্তু জানেন সূর্যের আবহাওয়া মাঝে মধ্যেই পাল্টায়।

সঠিক ফিল্টারযুক্ত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সূর্যের দিকে তাকালে জ্বলন্ত অগ্নি পিণ্ডের মধ্যে কিছু কালো দাগ দেখা যায়। এগুলোকে সৌরকলঙ্ক বা সানস্পট বলে। এই সৌরকলঙ্কগুলো আসলে অতিরিক্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রযুক্ত এক ঝড় যা কালো দেখায়। এই সানস্পটগুলি সূর্যের সক্রিয়তা, অগ্নিতরঙ্গ (solar flare), করোনাল ভর নির্গমন (coronal mass ejections) ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারণা দেয়। ১৮৩৮ সাল থেকে নিয়মিত সৌর কলঙ্ক সংখ্যা গোণা হয়ে আসছে। সৌর কলঙ্কের সংখ্যা বাড়লে সূর্যের অগ্নিতরঙ্গ বা সান ফ্লেয়ার (sun flare)এর আন্দোলন ও  চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের বিস্ফোরণ বাড়ে ফলে সূর্য থেকে এক্স রশ্মি ও তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। সূর্যে এই রকম বিভিন্ন ফুটন্ত প্লাজমা পদার্থ নিয়ে নানান ক্রিয়াকলাপ চলে। প্রায় এগারো বছর অন্তর সৌরকলঙ্কগুলো মিলিয়ে যায় এবং সেই সময় সূর্য তুলনামূলক অনেকটা শান্ত থাকে।নাসার বিজ্ঞানী ডিন পেসনেল(Dean Pesnell) এর মতে এটাই সোলার মিনিমাম বা সৌর সর্বনিম্ন।এটা একটা সৌরকলঙ্ক-চক্র যা নিয়মিত ভাবে হয়। আর এখন সূর্য যেমন সেই চক্রের সর্বনিম্নে প্রবেশ করেছে একই ভাবে এক সময় তেমন সোলার ম্যক্সিমাম বা সৌর সর্বোচ্চেও পৌঁছায় সূর্য।

২০১৪ সালে সান স্পট সব থেকে বেশি ছিল অর্থাৎ তখন সোলার ম্যাক্সিমাম চলছিল এবং ২০১৯-২০২০ সালে সৌরকলঙ্ক এর সংখ্যা অনেক কমের দিকে। সৌর সর্বনিম্ন অবস্থায় সূর্যের অগ্নিতরঙ্গের লেলিহান শিখা ও সৌরকলঙ্ক সংখ্যায় কমে যাওয়ার অর্থ কিন্তু সূর্যের নিস্তেজ হয়ে যাওয়া নয় বরং সূর্যের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপে কিছু পরিবর্তন ঘটা। এই সময়ে সৌর পৃষ্ঠে কিছু দীর্ঘস্থায়ী করোনাল গর্ত (coronal holes) তৈরী হতে দেখা যায়। করোনাল গর্ত হল সূর্যের আবহমন্ডলে তৈরি হওয়া বেশ বড় আকারের ফাঁক যেখান থেকে চৌম্বক ক্ষেত্রের বাঁধন ছিঁড়ে তীব্র গতিতে সৌরকণাগুলো সূর্যের বাঁধন ছেড়ে পালায়। একে আবার সৌর ঝড়ও বলে।এই করোনাল গর্ত সবসময়ই কম বেশি থাকে কিন্তু সৌর সর্বনিম্ন অবস্থায় এ গর্তগুলো প্রায় ছয় মাস বা তার বেশি স্থায়ী হয়।

সৌর সর্বনিম্নের কু প্রভাব পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের বেশ ভাবাচ্ছে। এই করোনাল গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা তীব্র গতির সৌরস্রোত মহাকাশের আবহাওয়া পাল্টে দিতে পারে যার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে পৃথিবীর উপর। বিশেষত পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে এই সৌরঝড় এলে বায়ুমণ্ডলের ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বক মণ্ডলে তাৎক্ষণিক আলোড়ন তৈরি হয়।একে জিওম্যাগনেটিক স্টর্ম বলে। এছাড়া মেরুজ্যোতি, টেলিযোগাযোগ এবং জাহাজ ও বিমান যাতায়াত ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে আমরা অনেক বেশি ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসের উপর নির্ভরশীল এবং এর ওপর সোলার মিনিমামের প্রভাব পড়ার সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সোলার মিনিমামের সময় পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহগুলির উপরও প্রভাবে পড়ে কারণ এসময় বায়ুমণ্ডলের আচরণ পাল্টে যায়। সাধারণত সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি ও অন্যান্য কসমিক রশ্মি বায়ুমণ্ডলের বহিঃস্তরকেকে ভীষণ উত্তপ্ত করে। ফলে বায়ুমন্ডল প্রসারিত হয় এবং উপগ্রহের চলার পথে বাধার সৃষ্টি করে। এর ফলে এক সময় উপগ্রহগুলি অভিকর্ষজ টানে নিচের দিকে নেমে আসে এবং পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছনোর আগেই বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একই ঘটনা ঘটে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করা মহাজাগতিক বস্তুগুলির ক্ষেত্রেও। এরফলে পৃথিবীর চারিদিকে কৃত্রিম উপগ্রহের কক্ষপথ পরিষ্কার থাকে এবং সক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহের গতিপথে বাধা থাকে না। কিন্তু সৌর সর্বনিম্নের সময় সূর্য থেকে আসা বিভিন্ন  রশ্মির পরিমান কমে যায়। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই বায়ুমণ্ডলের বহিরভাগ উত্তপ্ত কম হয় ফলে বেশ কিছু ডিগ্রি উষ্ণতা কমে যায়। এরফলে বায়ুমণ্ডল একটু শিথিল হয় ও প্রাকৃতিকভাবে উপগ্রহের কক্ষপথ পরিষ্কার হয় না এবং কক্ষপথে মহাকাশের জঞ্জাল জমে যায়। সৌর সর্বনিম্নের সময় সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রও একটু দুর্বল হয়। এর ফলে সূর্য অন্যান্য মহাজাগতিক রশ্মি আটকাতে পারে না। সেগুলো সরাসরি পৃথিবীতে আসে। সূর্য সৌরজগতে যে সুরক্ষা কবচ তৈরী করে রেখেছে সেটা সৌর সর্বনিম্নে বেশ দুর্বল হয়ে যায়। তাই এই সময় যাঁরা মহাকাশযাত্রা করেন তাঁদের শরীরে মারাত্মক কুপ্রভাব ফেলে দূরবর্তী সুপারনোভা ধ্বংস হওয়ার ফলে উৎপন্ন বিভিন্ন মহাজাগিতক রশ্মি।

তবে সোলার মিনিমাম প্রকৃতির নিয়মেই ঘটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। এ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যায় সৌর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পর্যায়ক্রমে  একাধিক বার ঘটেছে। তবে কোন কোন মহল একটা আশঙ্কার কথা শোনাতে ভোলেননি তা হল এবারের সোলার মিনিমাম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে যাকে গ্র্যান্ড সোলার মিনিমাম বলা হয় যা সাধারণত চারশ বছর পরপর হয়। সাধারণ সোলার মিনিমাম ৬ মাস স্থায়ী হলেও এক্ষেত্রে ২০১৯ থেকে শুরু করে ২০২০ তেও কিন্তু সান স্পট এর দেখা মেলেনি। তাই ভবিষ্যৎই বলতে পারবে যে এটা ১১ বছর পরপর ঘটা সৌর চক্রের সাধারণ সৌর সর্বনিম্ন নাকি ৪০০ বছরে একবার আসা গ্র্যান্ড সোলার মিনিমাম!

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।