বিজ্ঞান

গান শুনলে আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে যাই কেন

আমরা অনেকেই নানা সময় নানারকম গান শুনে থাকি। সিনেমা দেখার সময় সিনেমার বিশেষ বিশেষ মুহূর্তকে আরো মধুর করে তুলতে সিনেমায় নেপথ্যে গান ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন মেজাজের গান বিভিন্ন সময় আমাদের মনকে অন্যরকম অনুভূতি এনে দেয়। কোনো একটা সিনেমার প্রেমের দৃশ্যে প্রেমের গান, কষ্টের দৃশ্যে আবহের শোকের কোনো গান বাজলে আমরা নিজেদের অজান্তেই মুহূর্তের মধ্যে আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। গান শোনার সঙ্গে আমাদের আবেগের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বর্তমানকালে বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতা, মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মিউজিক থেরাপির ব্যবহারও বাড়ছে। চিকিৎসকদের একাংশ মনে করেন সত্যই গান আমাদের মানসিক স্থিতি ও ভারসাম্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বিশেষ উপায়ে। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? গান শুনলে আমরা সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে যাই কেন? এই সকল প্রশ্নের উত্তর জেনে নিই চলুন।

সাধারণ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক যেমন ভাষার সমস্ত সংকেত বুঝতে পারে বা বিশ্লেষণ করতে পারে, ঠিক তেমনই কোনো গানের মধ্যেকার নিহিত সংকেতও বিশ্লেষণ করতে পারে। গানও একপ্রকার ভাষাভঙ্গি। গানের ভাষা বোঝার কাজ করে মস্তিষ্ক নিজেই। সাধারণত যে কোনো রকম শব্দ বা ধ্বনির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মস্তিষ্কে বিশেষ বিশেষ সংবেদন তৈরি হয়। সেই রকমভাবেই গান শোনার সময়েও বিশেষ বিশেষ মেজাজের গান আমাদের মস্তিষ্কে বিশেষ রকমের সংবেদন তৈরি করে। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে নির্দিষ্ট ছন্দে ও গতিতে তরঙ্গায়িত করে। কখনও তা ধীর গতির আবার কখনো তা দ্রুত আর স্নায়ুকোষের এই আন্দোলিত হওয়ার হারের উপরেই আমাদের মেজাজ নির্ভর করে। এখন গানের মধ্যেকার বিশেষ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ তার মতো করেই আমাদের স্নায়ুকোষগুলিকে আন্দোলিত করে বলে গানের মেজাজের সঙ্গে আমাদের মেজাজও খানিক মিলে যায়। গবেষকরা কয়েকজন মানুষকে গান শুনিয়ে তাদের মস্তিষ্কের ডিফিউশন টেন্সর ইমেজিং এম আর আই (Diffusion Tensor Imaging MRI) পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, যে সকল মানুষের ব্রেন ফাইবার (Brain Fibre) পরিমাণে বেশি এবং গভীর তারাই গান শুনে বেশি আবেগপ্রবণ বা কল্পনাপ্রবণ হয়ে পড়েন। এই ব্রেন ফাইবার আসলে আমাদের মস্তিষ্কে বিভিন্ন শ্রুত শব্দ আর মানসিক আবেগের মধ্যে একটা সংযোগসেতু তৈরি করে। তাই ব্রেন ফাইবার সংখ্যায় বাড়লে বা তার গভীরতা বাড়লে মানুষের আবেগও বেশি হয়।

এক্ষেত্রে আরো একটা ব্যাপার দেখা গেছে। অনেক সময় গান শুনে আমরা শিহরিত হই, আমাদের রোমকূপ খাড়া হয়ে যায়। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষা বলা হয় ‘ফ্রিসো’ (Frischo)। ‘ফ্রিসো’ কথাটা একটা ফরাসি শব্দ যার অর্থ শিহরণ। চেনা কোনো গানের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে পারে। এর থেকেও বোঝা যায় আমাদের মানসিক আবেগের সঙ্গে গানের সূক্ষ্ম যোগাযোগ রয়েছে। তবে গান শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার ব্যাপারটা একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেকরকম হয়। গানের কথা, সুর, শব্দতরঙ্গ সবই আমাদের অডিটরি কর্টেক্সের (Auditory Cortex) মাধ্যমে গৃহীত হয়। তারপর মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের (Frontal Lobe) সাহায্যে তার বিশ্লেষণ ও অনুধাবন চলে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ হয়। যদি আমাদের মানসিক আবেগ কোনো ভবিতব্য ঘটনা বা মুহূর্ত সম্পর্কে আন্দাজ করে এবং তা সঠিক হয় তখন ডোপামিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। নিউক্লিয়াস অ্যাকুইম্বেন্সে (Nucleous Accuimbence) এই ডোপামিন গিয়ে পোঁছায় যা স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে দেয়। আর এই ধরনের নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণের ফলেই আমাদের আবেগ পরিবর্তিত হয়।

গান শুনে আবেগের বহিঃপ্রকাশ যদিও বিজ্ঞানীদের ভাষায় চারটি শর্তের উপরে নির্ভর করে –

১) গঠনগত বৈশিষ্ট্য, ২) উপস্থাপন বৈশিষ্ট্য, ৩) শ্রোতার বৈশিষ্ট্য, ৪) প্রাসঙ্গিক বৈশিষ্ট্য এবং ৫) অতি-সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য

গানের সুরের ওঠা-নামা, তীক্ষ্ণতা, কম্পাঙ্ক, তাল ও লয় এবং গাম্ভীর্য সবই মানসিক আবেগের উপর প্রভাব ফেলে। একেক সুর-তাল-লয়ের গান শুনে আমাদের মনে একেক রকমের আবেগ তৈরি হয়। যে গান গাইছে অর্থাৎ গায়ক বা গায়িকার গায়নরীতিও আমাদের আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে। যিনি গান শুনছেন তার রুচি, বয়স, লিঙ্গ ইত্যাদির উপরেও এই আবেগ নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া বিশেষ কোনো মুহূর্তে কোনো বিশেষ মেজাজের গান আমাদের খুব ভালো লাগে। বিচ্ছেদের পরে বা কোনো দুঃখজনক পরিস্থিতিতে আমরা শোকের গান, দুঃখের গান শুনতে খুব ভালোবাসি। আমাদের মনে আনন্দের রেশ থাকলে কোনো আনন্দের গান সেই মানসিক আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম। এটাই প্রাসঙ্গিক বৈশিষ্ট্য আর অতি-সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য বলতে গানের কথা-সুরের বাইরেও একটা ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ কাজ করে যা গানের পরিবেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে আমাদের মনে একটা আলাদা রকমের ভালোলাগা তৈরি করে। এই কারণেই বর্তমানে মিউজিক থেরাপি বা মিউজিক সাইকোলজি নিয়ে একটা আলাদা চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছে যা ভবিষ্যতে মানসিক আবেগের উপর গানের প্রভাবকে আরো বেশি গভীরভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন