আমরা সবাই কম-বেশি গ্রহণ (eclipse)-এর সাথে ছোটবেলা থেকেই পরিচিত, সে সূর্যগ্রহণ (solar eclipse)- ই হোক বা চন্দ্রগ্রহণ (lunar eclipse)। কতই না মনগড়া রাহু-কেতুর গল্প শুনেছি সেই ছোটবেলা থেকে। কিন্তু এখন ওইসব কাল্পনিক গল্প আর টেকে না, সেসবই এখন কুসংস্কার হিসেবে ধরা হয়। আজ আমরা আট থেকে আশি সবাই জানি যে সূর্যগ্রহণ হয় অমাবস্যার দিনে, যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে এসে সূর্যকে ঢেকে দেয়; আবার চন্দ্রগ্রহণ হয় পূর্ণিমার দিনে যখন আমাদের পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপরে পড়ে ফলে চাঁদকে দেখা যায় না। এখানে আমরা পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের একটি বিশেষ ঘটনা অর্থাৎ পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লাল দেখায় কেন সেই বিষয়ে আলোচনা করব।
প্রথমেই জেনে রাখা ভাল যে চন্দ্রগ্রহণ দু-ধরণের হয় – আংশিক বা খন্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ও পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। নাম থেকেই বোঝা যায়, আংশিক গ্রহণের সময় চাঁদের কিছু অংশ দেখা যায় বাকি অংশে ছায়া পড়ায় দেখা যায় না। পূর্ণগ্রাস গ্রহণের ক্ষেত্রে চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার প্রচ্ছায়া (umbra) অংশে পুরোপুরি ঢেকে যায় (চিত্র ১)। মজার কথা হল, পূর্ণগ্রাস গ্রহণ বললেও যে সময় পূর্ণগ্রাস গ্রহণ ঘটে সেই সময় চাঁদ আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায় না বরং সম্পূর্ণ গোল চাঁদকেই দেখায় – শুধু কিছুটা ম্লান ও লাল রঙের দেখায় চাঁদকে। তাই এই প্রশ্নটা মাথায় আসাই স্বাভাবিক যে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লাল দেখায় কেন?

আমরা অনেকেই দেখেছি যে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লাল দেখায়। যাকে বলে লাল চাঁদ বা রক্ত চন্দ্র (blood moon)। ব্লাড মুন এর খবর আমরা প্রায়ই পড়ে থাকি বিভিন্ন সংবাদপত্রে। আচ্ছা, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লাল দেখায় কেন? এটা কি কেবল দৃষ্টিভ্রম নাকি এর কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। তা নিয়েই এখন আলোচনা হবে। আগেই জানানো হয়েছে যে, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে ঢেকে দেয়। যেখান থেকে চন্দ্রগ্রহণটি দেখা যাচ্ছে সেখানকার মানুষ ওইসময় চাঁদকে দেখতে পাচ্ছে না ঠিক কথা কিন্তু চাঁদ তো পুরোপুরি অদৃশ্য হয় না, কেন না চাঁদকে ঢাকছে যে পৃথিবী তাকে ঘিরে রয়েছে বায়ুর স্তর যাকে বলা হয় বায়ুমণ্ডল (atmosphere)। আর পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্যের আলো চাঁদে সরাসরি না পড়লেও পৃথিবীতে বা বলা ভালো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তো পড়ছে। আর আমরা তো জানি যে সূর্যের সাদা আলো আসলে সাদা নয় বরং তা সাতটি রঙের সংমিশ্রণ। এই সাতটি রঙের মধ্যে নীল রঙের আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম আর তাই সেটি বেশিদূর না গিয়ে বায়ুমণ্ডলেই বেশি বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে, আর বাকি রংগুলি ফিল্টার হয়ে যায়। আর এই বেশি বিচ্ছুরণ (scattering)-এর ফলে নীল রং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই, রঙেদের মধ্যে নীল রঙের এই ছড়িয়ে পড়ার ফলে মেঘমুক্ত দিনে আমরা দিনের আকাশকে নীল দেখি। আবার, ওই সাতটি রঙের আরেক প্রান্তে কমলা ও লাল রঙের আলোকরশ্মি রয়েছে যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি আর তাই তারা বায়ুমণ্ডলে কম বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে। আর এই কম বিচ্ছুরণের ফলে তারা কম ছড়িয়ে পড়ে। তাহলে এই দুই বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলোকরশ্মির হয় কি? বায়ুমণ্ডলে এদের প্রতিসরণ (refraction) হয়। আর এই প্রতিসরণের ফলে তারা কিছুটা বেঁকে চাঁদের উপরে গিয়ে পড়ে। আর তাই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে কিছুটা লালচে দেখায়।
তবে বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত বাতাসের ধূলিকণার ওপরে নির্ভর করে চাঁদকে কতটা গাঢ় লাল দেখাবে। এ প্রসঙ্গে অনেকের মত যে, যেহেতু সাদা চাঁদের এই লাল হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নির্ভর করে বাতাসে অবস্থিত ধূলিকণা এবং আলোক বিচ্ছুরণের উপর তাই বলা যায় যে, আমাদের আবহাওয়া যতটা দূষিত হবে, ততটাই গাঢ় লাল চাঁদ আমরা দেখতে পাব। আর তাই দূষণের মাত্রার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে চাঁদকে কতটা লাল দেখাবে। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিককালে একটু সংযোজিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, অতিরিক্ত দূষিত বায়ু বা বায়ুতে ভাসমান বালুকণা সূর্যের আলোকে শুষে নেয় এবং বিচ্ছুরিত করে এবং এর ফলে চাঁদের উপর যে পরিমাণ লাল/কমলা তরঙ্গের আলো পৌঁছাবার কথা তা পৌঁছাবে না। এর ফলে চাঁদকে কিছুটা ফ্যাকাশে বা ম্লান দেখাবে। পরিশেষে বলা যায় যে, আমাদের পৃথিবীর যদি বায়ুমণ্ডল না থাকত তবে কিন্তু পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লালচে নয় বরং ঘন কালো দেখাতো।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান