ঋতু পরিবর্তনের সময় অনেকক্ষেত্রেই ঠাণ্ডা লেগে যায় আমাদের। সর্দি-কাশি শুরু হয়ে যায় আর এই সর্দি-কাশির মাত্রা খুব বেড়ে গেলে গলায় ব্যথা দেখা দেয়। অনেক সময় ব্যথার কারণে আমরা কথা বলতেও পারি না ঠিকঠাকভাবে। কথা বলতে, ঢোক গিলতে বা কোনো কিছু খেতে খুবই অসুবিধে হয়। গলার ভিতরে কোথায় একটা ব্যথা লাগে। তাছাড়া একটা ধরা ধরা ভাব মনে হয়। আগেকার দিনের মা-দিদিমারা আমাদের তখন বলেন দুধে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে খেতে বা গার্গল করতে। কিন্তু এ সমস্যার শেষ হয় না। একবার কমলেও পরে আবার দেখা দেয়। তাই প্রত্যেকেরই জানা উচিত ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যথা হয় কেন ।
একেবারে সরলভাবে বললে, ঠাণ্ডা লাগলে জীবাণু সংক্রমণের কারণেই গলা ব্যথা হয়। গলা ব্যথার পাশাপাশি বাইরে দিকে গলা আর চোয়ালের সন্ধিস্থলের অংশটায় হাত দিলে ফোলা ফোলা লাগে। ডাক্তারের কাছে গেলে তিনিও ওই অংশটা আঙুল দিয়ে আলতো করে টিপে বুঝে নেন। তারপরে হয়তো তিনি বলেন, টনসিল ফুলেছে। তারপর কয়েকটা ওষুধ লিখে কিছু পরামর্শ দেন। এখন বুঝতে হবে, ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যথা হয় কেন ? সাধারণভাবে গলা ব্যথা তিনটি প্রকারের হতে পারে –
১) ফ্যারিঞ্জাইটিস (Faringitis), ২) টনসিলাইটিস (Tonsilitis)এবং ৩) ল্যারিঞ্জাইটিস (Laryngitis)
মুখগহ্বরের ঠিক ভিতর দিকে ব্যথা হলে তাকে ফ্যারিঞ্জাইটিস বলা হয়, মুখের পিছন দিকে টনসিল গ্রন্থি ফুলে লাল হয়ে উঠলেও ব্যথা হতে পারে একে টনসিলাইটিস বলে। সবশেষে বাগযন্ত্রের যে ভয়েস বক্স বা ল্যারিংক্সের ফুলে ওঠা বা প্রদাহ তাকে ল্যারিঞ্জাইটিস বলে। ঠাণ্ডা লেগে, ফ্লু বা ভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণেই নব্বই শতাংশ মানুষের গলা ব্যথা হয়ে থাকে। তাছাড়া গ্রুপ এ স্ট্রেপ্টোকক্কাস (Streptocauccas sp.) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণেও টনসিল ফুলে গিয়ে গলা ব্যথা হতে পারে। ঠাণ্ডা লাগলে টনসিলের সংক্রমণ বাড়ে। এই টনসিল আমাদের শরীরের একটি গ্রন্থি বিশেষ যার চারটি অংশ রয়েছে – লিঙ্গুয়াল (lingual), প্যালাটাইন (Palatine), টিউবাল (Tubal) ও অ্যাডিনয়েড (Adenoid)। এই চারটি অংশের মধ্যে যে কোনো একটিতে প্রদাহ হতে পারে যার ফলে গলা ব্যথা হতে পারে। এই টনসিল গ্রন্থি আমাদের মুখগহ্বর থেকে রোগ-জীবাণু শরীরের ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। তাই জীবাণু সংক্রমণ ঘটলে এই গ্রন্থিই সবার আগে আক্রান্ত হয়। ব্যাকটেরিয়ার কারণে টনসিল ফুলে গলা ব্যথা হলে তাকে চিকিৎসার পরিভাষায় ‘স্ট্রেপ থ্রোট’ (Strep Throat) বলা হয়।
এর ফলে মুখের ভিতরে নরম তালুতে ব্যথা হয়, মুখের ভিতরে পিছন দিকে টনসিল ফুলে ওঠে, এপিগ্লটিস অংশে প্রদাহ হওয়ার কারণে খাবার গিলতে বা ঢোক গিলতে অসুবিধে হয়। গলার স্বর ভেঙে যায় অনেকসময়। গলার ভিতরটা শুকিয়ে যায় মাঝে মাঝেই, কথা বলতে অসুবিধে হয়। এর সঙ্গে নাক দিয়ে অনেক সময় পাতলা জলের মতো সর্দি বেরোতে পারে। চোখে লাল ভাব কিংবা মাঝে মাঝেই হাঁচিও দেখা দিতে পারে।
ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যথা হলে তার প্রতিকারের জন্য প্রথমেই জীবাণু সংক্রমণের কথা ভেবে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। একেবারে প্রাথমিকভাবে উষ্ণ গরম জল দিয়ে গার্গল করার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। তার সঙ্গে মধু, আদা, তুলসী পাতা দিয়ে চা খেলেও উপকার পাওয়া যায়। অনেক সময় গলা ব্যথার সঙ্গে জ্বর-জ্বরভাব দেখা যায়। সেক্ষেত্রে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। তাতেও যদি তিন-চার দিন পরে না কমে, তখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া উচিত। গলার প্রদাহ বা ব্যথা কমানোর জন্য চিকিৎসকেরা ‘নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ’ (Non-Steroidal Anti Inflamatory Drug) জাতীয় ওষুধ খেতে বলেন। কিছুদিন কথা বলা কম করতে হয় এই ব্যথার থেকে মুক্তি পেতে আর ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সেটা সর্বাগ্রে ত্যাগ করা উচিত। ধূমপানের অভ্যাস গলা ব্যথাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে গলা ব্যথা বেশ কয়েকদিন থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কিছু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার দরকার পড়ে। যেমন – সোয়্যাব টেস্ট বা থ্রোট কালচার। এক্ষেত্রে গলার ভিতরের অংশের একটি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস ও তার প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান