বিজ্ঞান

নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনলে আলাদা লাগে কেন

নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনলে আলাদা লাগে কেন

নিজের কণ্ঠস্বরকে ভালোবাসেন না এমন মানুষ খুব কমই আছেন। কণ্ঠস্বর ভাল হলে তা নিয়ে মানুষের একটা সূক্ষ্ম গর্ববোধ থাকেই। কিন্তু যখনই মোবাইল ফোনে বা অন্য কোনও রেকর্ডারে নিজের কথা রেকর্ড করতে যান, পরে সেই রেকর্ডিং-এ নিজেরই কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। অনেক সময়েই রেকর্ডিং-এ নিজের কণ্ঠস্বর মনে হয় একেবারেই পৃথক। কিন্তু এর জন্য মোবাইল বা সেই রেকর্ডারের কোনও ভূমিকা নেই, রেকর্ডারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় না। তাহলে কী এমন রয়েছে যার দরুণ এমন ঘটে? তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনলে আলাদা লাগে কেন (Why Does Own Voice Sound Different on a Recording)।

রেকর্ডিং করার পর শোনার সময় যে কণ্ঠস্বরটি শোনা যায় তা সর্বতোভাবে আপনার নিজেরই কণ্ঠস্বর, এটা প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে। একারণে সমাজে একটি প্রচলিত শব্দবন্ধ রয়েছে ‘কণ্ঠস্বরের দ্বন্দ্ব’ (Voice Confrontation) নামে। আমাদের প্রত্যেকের গলার স্বর আলাদা আলাদা, প্রত্যেকেই আমরা স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের অধিকারী। বিজ্ঞান বলছে, সাধারণভাবে আমরা যখন কথা বলি সেই সময় আমাদের কন্ঠ নিঃসৃত ধ্বনি দুভাবে আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায়। বাইরের কোনও শব্দ বায়ুর মাধ্যমে বাহিত হয়ে আমাদের কানে প্রবেশ করে এবং তারপর কানের পর্দায় গিয়ে আঘাত করে সেই শব্দতরঙ্গ। তারপর কানের ভিতরে ককলিয়া দ্বারা বাহিত হয়ে সেই শ্রুতি-স্পন্দন (Sound Sense) মস্তিষ্কে গিয়ে অনুভূতি জাগায়। তখনই আমরা বুঝতে পারি আসলে সেই শব্দটা ঠিক কিসের। আমাদের বিপরীত দিকে থাকা কোনও ব্যক্তিও ঠিক একইভাবে আমাদের বলা কথাগুলি শুনতে পান। কিন্তু আমরা যখন নিজেদের কথা শুনি, সেই সময় সবার প্রথমে বাতাসের মাধ্যমে সেই শব্দের তরঙ্গ মস্তিষ্কের হাড়ের মধ্যে দিয়ে বাহিত হয়ে ককলিয়ায় পৌঁছায়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই শব্দ সংবহনের পদ্ধতিকে বলা হয় অস্থি সংবহন (Bone Conduction)। কিন্তু যখন আমরা নিজেদের কথা রেকর্ড করি, সেই সময় এই অস্থি সংবহনের বিষয়টি ঘটে না। এখানেই পার্থক্য ঘটে যায়। আমরা কথা বলার সময় ঠিক যতক্ষণ ধরে আমাদের মস্তিষ্কে অস্থি সংবহন ঘটতে থাকে, সেই সময় পর্যন্ত নিজেদের কণ্ঠস্বরকে একটু বেশি গভীর, বেশি ভরাট লাগে শুনতে। কিন্তু আদপেই তেমনটা হয় না। রেকর্ডিং করে যখন আমরা আবার নিজেদের কথাগুলি শুনতে শুরু করি, সেই সময় শুধুমাত্র শব্দ তরঙ্গ কানের পর্দার মধ্যে দিয়ে ককলিয়ায় এবং তারপর মস্তিষ্কে পৌঁছায়। অস্থি সংবহন এই সময় ঘটে না বলেই নিজেদের কণ্ঠস্বরের প্রকৃতি একটু ভিন্ন প্রকৃতির মনে হয়। এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ড. সিল্ক পলম্যানের মতে, রেকর্ড করা আমাদের কণ্ঠস্বর আমাদের ধারণার থেকেও বেশি উচ্চকিত শোনায় কিংবা অনেক বেশি তীক্ষ্ণতার বলে মনে হয়। আমাদের এই কণ্ঠস্বর আমাদের পরিচয়ের একটি অংশ, আমাদের ব্যক্তিত্বের একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু আসলেই এই সমস্যা মানসিক। বিজ্ঞানের সাহায্যে এই ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করা গেলেও আমরা সহজে নিজেরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারব না। নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনলে আলাদা লাগে কেন এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য ২০১৩ সালে একটি সমীক্ষায় কয়েকজন ব্যক্তিকে নিজেদের রেকর্ড করা কণ্ঠস্বরের আকর্ষণীয়তাকে রেটিং দিতে বলা হয়েছিল। এই সময় নির্দিষ্ট কিছু আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বরের নমুনার সঙ্গে তাঁদের নিজেদের কণ্ঠস্বরের নমুনা গোপনে একত্রিত করে যখন তাদের শোনানো হয়, সেই সময় তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের কণ্ঠস্বরকে অনেক বেশি রেটিং দিয়েছিল। কারণ তাঁরা নিজেদের কণ্ঠস্বরকে চিনতেই পারেননি। ১৯৬৬ সালে মনোবিজ্ঞানী ফিল হোলজম্যান এবং ক্লাইড রাউসি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে কণ্ঠস্বরের দ্বন্দ্ব মূলত যে আশানুরূপ কণ্ঠস্বর শুনতে না পারার কারণে হয়, তেমনটা নয়। এর পাশাপাশি রেকর্ডিং-এ নিজের কণ্ঠস্বর শোনার পর যে আকর্ষণীয় অনুভূতি হয় বা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে, সেই কারণটিও এখানে ক্রিয়াশীল হয়। আবার অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে সমস্ত ব্যক্তি নিজের মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য একটি দ্বিতীয় ভাষা শিখেছেন, ১৬ বছর বয়সের পর তাদের আর নিজের মাতৃভাষায় বলা কথা নিজে শুনতে ভালো লাগে না। তবে নানাবিধ পরীক্ষার পরে অধিকাংশ মনোবিজ্ঞানীরাই বলেছেন যে আমরা মূলত নিজেদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে অন্যদের কণ্ঠস্বরের তুলনা করি বলেই নিজেদের স্বর রেকর্ড করার পর আর তা আমাদের ভাল লাগে না আর এই কারণেই নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনলে আলাদা লাগে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়