বিজ্ঞান

মানুষের গলার স্বর আলাদা হয় কীভাবে

আপনার সব বন্ধুদের সঙ্গে তো আপনি প্রায়ই কথা বলেন, নিশ্চয়ই খেয়াল করে দেখেছেন যে সবার গলার স্বর একরকম নয়। এমনকি আপনাকে যদি বলা হয় চোখ বন্ধ করে শুধু শুনে বন্ধুদের চিহ্নিত করতে আপনি হয়তো খুব সহজেই তা করতে পারবেন। সিনেমার পর্দায় অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠ আর আমির খানের কণ্ঠ যে এক নয় কখনোই তা আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আলাদা করে বলার কিছু নেই। নাটকের ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্রের যে কণ্ঠস্বরের প্রকৃতি তা অতিজেশ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উৎপল দত্তের সঙ্গে মেলে না বা অরিজিৎ সিংয়ের গানের গলার সঙ্গে সোনু নিগম বা কুমার শানুর গানের গলা মেলে না এবং ঠিক এই কারণেই তাঁরা একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র। শুধু তাঁরাই নয়, আমরা সকলেই স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের অধিকারী। আমাদের আঙুলের ছাপের মতোই কণ্ঠস্বরও স্বতন্ত্র হয়। মানুষের কারো গলার স্বর অন্য কারো সঙ্গে মেলে না। প্রত্যেক মানুষই আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বরের অধিকারী। ফলে প্রশ্ন আসতেই পারে, মানুষের গলার স্বর আলাদা হয় কীভাবে এবং কেন আলাদা হয়। চলুন তাহলে, আর দেরি কেন, জেনে নিই চট করে এই প্রশ্নের উত্তর।

সাধারণভাবে বলতে গেলে ভোকাল কর্ড এবং ভয়েস বক্সের সাহায্যে মানুষ কথা বলতে পারে যাকে বাংলায় আমরা বাগযন্ত্র বলে চিনি। এই বাগযন্ত্রের মধ্যে মূলত তিনটি অংশ থাকে। একটি ফুসফুস, একটি ভোকাল কর্ড (Vocal Chord) বা ভোকাল ফোল্ড (Vocal Fold) আর একটি হল আর্টিকুলেটর (Articulator)। শব্দ উৎপাদনের সময় ফুসফুস যথাযথ পরিমাণে বাতাস চালনা করে এবং ঐ বাতাস ভোকাল ফোল্ডে অনুরণিত হয়ে আর্টিকুলেটরের মাধ্যমে শব্দ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মুখগহ্বরের সাহায্যে। ঐ ল্যারিংক্সের পেশিগুলিই ঠিক করে কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতা এবং টোন কেমন হবে। ল্যারিংক্সের পেশির দৈর্ঘ্য এবং ভোকাল ফোল্ডের মধ্যেকার টান অনুযায়ী একেক মানুষের গলার স্বরের তীক্ষ্ণতা একেক রকমের হয় এবং গলার স্বরও আলাদা হয়। মানুষের বয়স এবং লিঙ্গ অনুযায়ীও কণ্ঠস্বর বদলে যায়। অনেকেই জানেন পুরুষ ও মহিলা কণ্ঠস্বর আলাদা আলাদা হয়। এর পিছনে একটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রীর মাংসপেশির সংকোচন-প্রসারণের ফলে এদের মধ্যেকার টান নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দ সৃষ্টি হয়। এই কম্পাঙ্কের বিভিন্নতার কারণে তীক্ষ্ণতারও পার্থক্য ঘটে যায়। ফলে মানুষের গলার স্বর একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যায়। নারীর তুলনায় পুরুষদের স্বরতন্ত্রী একটু বেশি মোটা হওয়ার ফলে পুরুষদের ক্ষেত্রে কম্পন একটু কম হয় পরিমাণে। শব্দবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে শব্দের কম্পাঙ্ক কম হলে তার তীক্ষ্ণতাও কম হবে। তাই পুরুষদের কণ্ঠস্বর একটু মোটা, ভারী ও গম্ভীর হয়ে থাকে। উল্টোদিকে নারীর ক্ষেত্রে স্বরতন্ত্রী আকারে ছোটো ও সরু হওয়ায় এতে কম্পনও বেশি হয় বলে তীক্ষ্ণতাও বেশি হয়। একেবারে জীববিজ্ঞানের পরিমাপের ভিত্তিতে দেখলে, পুরুষদের ক্ষেত্রে ভোকাল ফোল্ডের আকার হয় ১৭ মিমি. থেকে ২৫ মিমি আর নারীর ক্ষেত্রে এর আকার হয় ১২.৫ মিমি. থেকে ১৭.৫ মিমি.। এছাড়া পুরুষদের স্বরনালির আকৃতিও অনেক বড়ো হয় যা ভারী স্বর পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ল্যারিংক্সের কর্মক্ষমতা, স্বরতন্ত্রীর পেশির গঠন ইত্যাদি নির্ভর করে পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের উপর। বয়সজনিত ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের ঘনত্বের উপর নির্ভর করে পুরুষদের কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতাও কমে বাড়ে। তবে পুরুষদের মধ্যেও নানা ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের ভিন্নতা দেখা যায়। এর কারণ মূলত ঐ ল্যারিংক্স, ভোকাল কর্ড বা ভোকাল ফোল্ডের গঠন, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কিংবা ভোকাল কর্ডের কোনো ব্যাধি ইত্যাদি। মহিলাদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক এইরকমই। শারীরিক প্রত্যঙ্গের গঠনগত কারণেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরের ভিন্নতা নির্ভর করে। যেমন মানুষের বক্ষপিঞ্জরের গঠন, গলার গঠন, জিভের অবস্থান, অন্যান্য পেশির দৃঢ়তা বা শিথিলতার উপর ভিত্তি করে মানুষের কন্ঠস্বর বদলাতে পারে। এমনকি দেখা গেছে হাড়ের গঠনও মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রভাবিত করতে পারে।  

এখানে আরেকটি ব্যাপার রয়েছে। একই মানুষ বিভিন্ন কণ্ঠস্বরে কথা বলতে পারেন তা আমরা অনেকক্ষেত্রে দেখেছি। বিশেষত যারা অনুকরণ (Mimicry) করেন তাঁদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি একেবারে সুপ্রযোজ্য। সাধারণ মানুষও বেশিরভাগ সময়েই নিয়ন্ত্রিতভাবে নিজের কণ্ঠস্বর বদলাতে পারেন যাকে ‘ভয়েস মড্যুলেশন’ (Voice Modulation) বলা হয়। কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতা এবং ভোকাল ফোল্ডের সংকোচন-প্রসারণ এক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভোকাল ফোল্ডের এই সংকোচন-প্রসারণকে যথাক্রমে অ্যাডাকশান ও অ্যাবডাকশন বলা হয়। এই ভোকাল কর্ডের সংকোচন-প্রসারণ ঘটিয়ে এবং ফুসফুসের মাধ্যমে কম-বেশি বায়ুপ্রবাহ পাঠিয়ে একই ব্যক্তি বিভিন্ন স্বর উৎপাদন করতে পারেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


আশা করি এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেল মানুষের গলার স্বর আলাদা হয় কীভাবে

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য দেখুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন অজানা এই তথ্য