সববাংলায়

জাকির হুসেন

বিভাগঃ , ,

জাকির হুসেন ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের জগতে তবলাবাদক হিসাবে একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল তবলা বাদক হিসেবে বিখ্যাত নন, একাধারে সংগীত প্রযোজক, সুরকার, এবং চলচ্চিত্র সংগীতকার হিসেবেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

১৯৫১ সালের ৯ মার্চ ভারতের মুম্বই শহরের মাহিম অঞ্চলে জাকির হুসেনের জন্ম হয়। জাকির হুসেনের বাবা ছিলেন কিংবদন্তি তবলা বাদক আল্লারাখা।মায়ের নাম বাভি বেগম। জাকির হুসেন ছিলেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান৷ তাঁরা সব মিলিয়ে সাত ভাই বোন ছিলেন। জাকির হুসেনের পারিবারিক পদবী হল কুরেশি। কিন্তু জন্মের পর তাঁর পদবী হুসেন রাখা হয়।

প্রথাগত শিক্ষা জীবনের শুরুতেই জাকির ভর্তি হন মুম্বাইয়ের মাহিমের সেন্ট মাইকেল হাই স্কুলে। এরপর তিনি পড়াশোনা করেন মুম্বাইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। বর্তমানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে জাকির যুক্ত রয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এছাড়াও তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওল্ড ডমিনিয়ন ফেলো’ এবং সেখানে ২০০৫-২০০৬ সাল অবধি পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত ছিলেন।

একেবারে শিশু বয়সেই বাবা আল্লারাখার কাছে তবলায় হাতেখড়ি হয় জাকির হুসেনের। মাত্র তিন বছর বয়সে পাখওয়াজ দিয়ে শুরু হয় বাবার কাছে তবলার তালিম। এই সময় প্রতিদিন রাত তিনটের সময় বাবা আল্লারাখা শিশু জাকিরকে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে তবলার শিক্ষা দিতেন। সকাল ছ’টা পর্যন্ত চলত সুর ও সংগীতের রাগের সঙ্গে তবলার তালিম। পিতা আল্লারাখা ছিলেন ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের তবলা বাদ্যযন্ত্রের পাঞ্জাব ভাজ ঘরানার একজন প্রথিতযশা শিল্পী। মাত্র সাত বছর বয়সে শিশু প্রতিভা হিসেবে প্রথম কনসার্টে যোগ দেন জাকির। এরপর ১৯৭০ সালে তিনি আমেরিকায় পাড়ি দেন কিংবদন্তী সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করার জন্য। আমেরিকার সফর শেষকালীন পণ্ডিত রবিশঙ্কর জাকির হুসেনকে উপদেশ দেন জাকির যেন আমেরিকাতেই থেকে যান এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে তবলার অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। জাকির ভেবেছিলেন এখানেই তিনি তাঁর পি.এইচ.ডি ডিগ্রি সম্পূর্ণ করবেন। কিন্তু শেষ অবধি এই ইচ্ছে আর পূরণ করতে পারেননি ওস্তাদ আলি আকবর খানের সাথে তবলা সঙ্গতের সুযোগে সাড়া দেওয়ার ফলে। বলা যেতে পারে এখান থেকেই জাকিরের আন্তর্জাতিক তবলা কেরিয়ারের প্রথম অধ্যায় শুরু হয় এবং এক বছরে প্রায় দেড়শো কনসার্ট করেন তিনি ওস্তাদ আলি আকবর খানের সাথে।

এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ভারতের সমস্ত খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্র শিল্পীদের সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেছেন জাকির। এইসব শিল্পীদের মধ্যে যেমন আছেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ বিলায়ত খান, ওস্তাদ আলি আকবর খান, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, তেমনি আছেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, পণ্ডিত ভিজি যোগ, পণ্ডিত ভীমসেন যোশি, পণ্ডিত যশরাজ প্রমুখরা। একই সঙ্গে চলতে থাকে তাঁর একক তবলা পরিবেশন। কখনও ভারতে, কখনও এশিয়া মহাদেশ জুড়ে আবার কখনও গোটা বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের দরবারে। মাঝে ১৯৭৩ সালে জাকির হুসেইন জর্জ হ্যারিসনের ‘লিভিং ইন দ্যা মেটিরিয়াল ওয়ার্ল্ড’ অ্যালবামে অংশগ্রহণ করেন যা তাঁর জন্য নিয়ে আসে এক বিরাট স্বীকৃতি৷ এছাড়াও দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতিমান সংগীত শিল্পীদের সঙ্গে তিনি তবলা পরিবেশন করেন যাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জন ম্যাকলাফলিন, মিকি হার্ট, বিল ল্যাসওয়েল, ভ্যান মরিসন, জো হেন্ডারসন প্রমুখরা।   

জাকির হুসেন বিবাহ করেন কত্থক নৃত্যশিল্পী এবং নৃত্যশিক্ষিকা অ্যান্টোনিয়া মিনেকোলা-কে। বর্তমানে তিনিই হলেন জাকির হুসেনের ম্যানেজার। এই বিখ্যাত দম্পতির বর্তমানে দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। তাঁদের দুই কন্যার নাম অনিতা কুরেশি এবং ইসাবেলা কুরেশি। জাকির হুসেন ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে আমেরিকার সান ফ্রান্সিকো শহরেও বসবাস করছেন। 

জাকির হুসেন ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোমেন্ট রেকর্ড’ সংস্থা যার মাধ্যম দিয়ে ভারতীয় সংগীতানুরাগীদের তিনি পরপর উপহার দিয়ে যাচ্ছেন ভারতের ধ্রুপদী সংগীতের শ্রেষ্ঠ সংগীতের সাথে সমকালীন বিশ্বসংগীতের নানান সম্ভার৷ 

চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর সংগীত রচনা করেছেন তিনি৷ এছাড়াও নানান চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জাকির হুসেন৷ তিনি ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রী লাভ করেন। ১৯৯০ সালে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান। ২০০২ সালে ভারতে সব চেয়ে কম বয়সী বাদ্যযন্ত্র শিল্পী হিসাবে পদ্ম ভূষণ উপাধি পেয়েছেন। একান্নতম গ্র্যামি পুরস্কার পান ২০০৯ সালে। ২০১৯ সালে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি থেকে একাডেমি ফেলো পুরস্কার পান। এছাড়াও আরো বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন জাকির হুসেন৷  

বর্তমানে জাকির হুসেন প্রতিনিয়ত বিশ্ব সংগীতে নিজের তবলার বোল ছড়িয়ে দিচ্ছেন নানানভাবে। কখনও একক পরিবেশনে, আবার কখনও সঙ্গতে। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।