বিশ্ব হাঁপানি দিবস

বিশ্ব হাঁপানি দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। সমগ্র বিশ্বে পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল বিশ্ব হাঁপানি দিবস (World Asthma Day)।

প্রতি বছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার সমগ্র বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় বিশ্ব হাঁপানি দিবস। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে অ্যাজমা বা হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার প্রতি যত্নবান হওয়া এবং হাঁপানি রোগ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়।

১৯৯৮ সালে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা (Global Initiative for Asthma)-র উদ্যোগে প্রথম বিশ্ব হাঁপানি দিবস উদ্‌যাপিত হয়। বর্তমানেও এই সংস্থার উদ্যোগে ও পরিচালনাতেই বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে এই দিনটি পালন করা হয়। প্রথম বিশ্ব হাঁপানি সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল স্পেনের বার্সেলোনায়। যত দিন যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে বায়ুদূষণের মাত্রাও বাড়ছে, জীবনযাত্রার ধরনে অবনতি ঘটছে। ফলে দূষিত পরিবেশে ধুলো-ধোঁয়া, এমনকি বিভিন্ন প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদানের কারণেই এই হাঁপানি রোগ দেখা দেয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই রোগের সম্পূর্ণ প্রতিকারের পথ আবিষ্কার করতে পারেননি চিকিৎসকেরা। ফলে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে সচেতনতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নানাবিধ বিধি-নিষেধ সম্পর্কে অবগত করার জন্য এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়।

হাঁপানি বা অ্যাজমা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ যার প্রধান লক্ষণ হল শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট, নিশ্বাসের সময় সাঁ-সাঁ শব্দ হওয়া, এমনকি শ্বাসনালীর প্রদাহও এর লক্ষণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাঁপানি আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, সারা দিন জুড়ে ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। এমনকি এই রোগের বাড়াবাড়িতে কাজেও ব্যাঘাত ঘটে মানুষের। অত্যন্ত মারাত্মক আকার নিলে হাঁপানি মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। ফলে হাঁপানি প্রতিরোধে ও নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন। এই হাঁপানির কারণে শ্বাসনালী এতটাই সংকীর্ণ হয়ে যায় যে নিশ্বাস ও প্রশ্বাসের সময় শ্বাসবায়ুর গতি অনেক কমে যায়, বায়ু চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হয়। শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েরই এই অসংক্রামক হাঁপানি দেখা দিতে পারে। ফুসফুসের ছোট শ্বাসনালীগুলির প্রদাহ ও সংকীর্ণতার কারণে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, এমনকি অনেক সময় মারাত্মক কাশিও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৬ সালে সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৩৪ কোটি মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রায় ৪ লক্ষ ১৭ হাজার ৯১৮ জন মানুষ হাঁপানির কারণে মারা গিয়েছিলেন। এর পরে ২০১৯ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমগ্র বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ সেই সময় হাঁপানিতে আক্রান্ত ছিলেন এবং হাঁপানির কারণে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৪ লক্ষ ৬১ হাজার মানুষের। বর্তমানে চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই সংখ্যাটা ক্রমহ্রাসমান। সাধারণভাবে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারেই হাঁপানির কারণে মৃত্যুহার বেশি দেখা যায় যার একমাত্র কারণ চিকিৎসা পরিষেবার অভাব। হাঁপানি একেবারেই একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ, কিন্তু সঠিক সচেতনতা এবং সাবধানতা অবলম্বন করলে ‘অ্যাজমা-অ্যাটাক’ (Asthma Attack) থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। হাঁপানি সম্পর্কিত বেশ কিছু ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে রয়েছে। যেমন –

  • অনেকেই ভাবেন হাঁপানি কেবলমাত্র শিশুদের দেখা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগ প্রশমিত হয়ে যায়।
  • হাঁপানি হল সংক্রামক ব্যাধি
  • হাঁপানি আক্রান্ত ব্যক্তিদের কখনই ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা উচিত নয়।
  • উচ্চ মাত্রার স্টেরয়েডের সাহায্যেই কেবলমাত্র হাঁপানি নিরাময় সম্ভব।

কিন্তু এক্ষেত্রে আসল সত্য হল –

  • যে কোনও বয়সেই হাঁপানি দেখা দিতে পারে।
  • হাঁপানি বা অ্যাজমা কখনই সংক্রামক নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে অনেকসময়ই অ্যালার্জির কারণেও অ্যাজমা দেখা দিতে পারে।
  • হাঁপানি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে, তবে শরীরচর্চা এমনকি দুর্ধর্ষ ক্রীড়ায় অংশ নেওয়াও খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়।
  • খুবই কম মাত্রার স্টেরয়েড জাতীয় ইনহেলারের সাহায্যে এই হাঁপানি রোগ নিরাময় করা সম্ভব।

সাধারণভাবে অ্যালার্জি, তামাকের ধোঁয়া, রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থের কারণে হাঁপানি দেখা যায়। ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার পরে পশম, রেণু, ধুলো বা সিগারেটের ধোঁয়া কিংবা পরিবেশ দূষণজনিত কারণে হাঁপানি অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বাড়তে পারে। হাঁপানির সঙ্গে সঙ্গে জিইআরডি (GERD, Gastro-isophegal Reflux Disease) এবং রাইনুসাইনাইটিস (Rinusinitis) ইত্যাদি রোগের উপসর্গও দেখা দিতে পারে। ফলে বিশ্ব জুড়ে এই হাঁপানি রোগের প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্ব হাঁপানি দিবস পালন শুরু হয়েছিল।

এই বিশেষ দিনে প্রায় প্রতিটি দেশেই স্বাস্থ্য বিভাগের পেশাদারেরা, শিক্ষাবিদ এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে হাঁপানি প্রতিরোধে শপথ গ্রহণ করেন। হাঁপানির প্রতিকার সংক্রান্ত নিত্য নতুন উপায় জনগণকে অবগত করানো, হাঁপানি রোগের লক্ষণ নির্ণয় সম্পর্কেও নতুন তথ্য জানানোর জন্য এই দিনটি পালিত হয়। শিশু-কিশোরদের এই বিষয়ে সচেতন করে তুলতে স্কুলে স্কুলে সেমিনার বা আলোচনা সভাও আয়োজিত হয়ে থাকে এই দিনে। এমনকি বহু জায়গায় হাঁপানি আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোনও একজন পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের কৌশল তাঁদেরকে বোঝান হয়।

২০১৭ সালে এই দিনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মুক্ত বায়ু মুক্ত শ্বাস’ (Better Air Better Breath)। ২০১৮ সালে ‘তাড়াতাড়িও নয়, দেরিও নয়। এটাই সময় শ্বাসনালীর ব্যাধি নিরাময় করার’ (Never too Early, Never too Late. It’s Always the Right Time to Address Airway Diseases)। ‘হাঁপানির জন্য স্টপ’ (STOP for Asthma) এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০১৯ সালে সমগ্র বিশ্ব পালিত হয়েছিল বিশ্ব হাঁপানি দিবস। এক্ষেত্রে এই ‘STOP’ কথার এক সামগ্রিক অর্থ ছিল। S অর্থাৎ Symptom Evaluation বা রোগ লক্ষণ নির্ণয়, T অর্থাৎ Test Response বা প্রতিক্রিয়া যাচাই করা, O অর্থাৎ Observe and Asses বা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ এবং সবশেষে P-এর অর্থ হল Proceed to Adjust Treatment বা চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে এই দিনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘হাঁপানিতে যথেষ্ট মৃত্যু’ (Enough Asthma Deaths)। ২০২১ সালে বিশ্ব হাঁপানি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘হাঁপানি সংক্রান্ত সমস্ত ভ্রান্তি দূর করা’ (Uncovering Asthma Misconceptions)। ২০২২ সালের বিশ্ব হাঁপানি দিবসের প্রতিপাদ্য – ‘হাঁপানি চিকিৎসায় ফাঁক পূরণ করা’ (Closing Gaps in Asthma Care) ।

আপনার মতামত জানান