সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ (Sarvepalli Radhakrishnan) স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর জন্মদিনকে ভারতবর্ষে ‘শিক্ষক দিবস‘ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, পন্ডিত, অধ্যাপক ও রাজনীতিবিদ। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ও যুব সম্প্রদায়কে গড়ে তোলাই তাঁর জীবনে প্রধান লক্ষ্য ছিল।
১৮৮৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তামিলনাডুর তিরুট্টানিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সর্বেপল্লি বীরস্বামী। তিনি স্থানীয় এক জমিদারের অধীনে স্বল্প বেতনের একজন কর্মচারী ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম সর্বেপল্লি সীতা (সীতাম্মা)। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের চতুর্থ সন্তান। শৈশব থেকেই সংসারে অভাব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। রাধাকৃষ্ণণ ১৬ বছর বয়সে দূর সম্পর্কের আত্মীয়া শিবকামুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের পাঁচ কন্যা সন্তান এবং এক পুত্র সন্তান হয়। পুত্রের নাম সর্বপল্লী গোপাল। সর্বপল্লী গোপাল ইতিহাসবিদ হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালের ২৬ নভেম্বর শিবকামুর মৃত্যু হয়।
রাধাকৃষ্ণণ ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। বিভিন্ন বৃত্তি তাঁর শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল। ভেলোরের এক কলের থেকে এফএ (First in Arts) পাশ করার পর মাদ্রাজ খ্রিষ্টান কলেজে ভর্তি হন। স্নাতক স্তরে অঙ্ক নিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও অর্থাভাবের কারণে পড়তে পারেননি। তাঁর এক তুতো-দাদা তখন ওই কলেজ থেকেই দর্শন নিয়ে পাশ করেছেন। তাঁর পুরনো বইগুলি তিনি পেয়েছিলেন। এক প্রকার বাধ্য হয়েই রাধাকৃষ্ণণ কলেজে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে। ১৯০৭ সালে তিনি মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক হন ও পরে ওই কলেজ থেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা’। তিনি মনে করেছিলেন তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ দর্শনের অধ্যাপক বাতিল করে দেবেন। কিন্তু অধ্যাপক অ্যালফ্রেড জর্জ হগ তাঁর প্রবন্ধ পড়ে খুবই খুশি হন। তাঁর ২০ বছর বয়সে এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
এমএ পাশ করে রাধাকৃষ্ণাণ মাদ্রাজ প্রাদেশিক শিক্ষা পরিষেবায় যোগ দিয়ে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯১১ সালে সহকারি অধ্যাপক বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯১৬ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রী কলেজে। ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে রাধাকৃষ্ণাণ মহীশূরের মহারাজার কলেজে যোগ দেন। তিন বছর পর ১৯২১ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঞ্চম জর্জ অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। এই পদটি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মানীয় অধ্যাপকের পদ। এরপর ১৯৩১ সালের ১ মে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে যোগ দেন তিনি।১৯৩৯-৪৮ সাল পর্যন্ত বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। রাধাকৃষ্ণণ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় ধর্ম ও নীতিবিদ্যার স্পাল্ডিং অধ্যাপক পদে নিযুক্ত ছিলেন। একজন ভারতীয় হিসেবেে তিনিই প্রথম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯২৬, ১৯২৯ এবং ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডের ম্যানচেস্টার কলেজের আপটন লেকচারার ছিলেন তিনি। ১৯৩০ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ধর্ম বিভাগে হাস্কেল লেকচারার (Haskell lecturer) পদে নিযুক্ত হন। ১৯৩৯ সালে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৩১ সালে তিনি নাইট (স্যার) উপাধি পান, তবে স্বাধীনতার পর থেকে এই উপাধি ব্যবহার না করে তিনি “ডক্টর” উপাধি ব্যবহার করতে থাকেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাধাকৃষ্ণণের বক্তৃতা প্রশংসিত হয়েছে। তিনি একাধিক দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেন, যা আলোড়ন সৃষ্টি করে পণ্ডিত মহলে। তাঁর ‘অ্যান আইডিয়ালিস্ট ভিউ অব লাইফ’ গ্রন্থটির জন্য তিনি নোবেল প্রাইজের জন্যও বিবেচিত হয়েছিলেন যদিও শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার প্রাপক হিসেবে তাঁর নাম নির্বাচিত হয়নি। ১৯৭৫ সালে ‘প্রগতিতে ধর্মের অবদান’ বিষয়ক রচনার জন্য পেয়েছিলেন ‘টেম্পলটন’ পুরস্কার। বিশ্বের দরবারে তিনি একজন জনপ্রিয় দার্শনিক ও অধ্যাপক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করার সময় তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় লিখতেন। সে সময়েই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ দ্য ফিলোজফি অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর’। ১৯২০ সালে দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘দ্য রেইন অফ রিলিজিয়ন ইন কনটেমপোরারি ফিলোজফি’ (The Reign of Religion in Contemporary Philosophy) প্রকাশিত হয়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।
রাধাকৃষ্ণণ তুলনামূলক ধর্ম ও দর্শনে বিংশ শতাব্দীর ভারতের অন্যতম সেরা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। রাধাকৃষ্ণনের হিন্দু ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এবং ‘আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার’ উপর জোর দেওয়া হিন্দু ধর্মকে পাশ্চাত্যের মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে রাধাকৃষ্ণন ইউনেস্কোতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং পরে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি ভারতের গণপরিষদেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাধাকৃষ্ণান ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হন এবং দশ বছর পর ১৯৬২ সালে ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। ১৯৫৪ সালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয়।
রাধাকৃষ্ণাণের ছবি রাজ্যসভায় সুসজ্জিত আছে। ১৯৩১ সালে তিনি নাইট উপাধি পান। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হন। ১৯৩৮ সালে তিনি ব্রিটিশ অ্যাকাডেমির ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে তিনি জার্মান বুক ট্রেডের শান্তি পুরস্কার পান।
১৯৬৩ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকার দ্বারা ‘অর্ডার অব মেরিট’-এ সম্মানিত হন। ১৯৬৮ তিনি সর্বপ্রথম সাহিত্য অ্যাকাডেমি ফেলোশিপ পান। ১৯৭৫ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেমপ্লটন পুরস্কার (Templeton Prize) পান, কিন্তু সেই সমস্ত অর্থই তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দেন। ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় রাধাকৃষ্ণাণ স্কলারশিপ প্রদান করা শুরু করে, পরবর্তীকালে সেই স্কলারশিপের নামান্তর হয়ে ‘রাধাকৃষ্ণণ সিভেনিং স্কলারশিপ’ (Radhakrishnan Chevening Scholarship) নামে পরিচিত হয়। তিনি ১৬ বার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ১১ বার মনোনীত হন।
নিজের সমস্ত জীবন শিক্ষার জন্য, প্রগতির জন্য, মানবকল্যাণের কাজে নিবেদন করেন রাধাকৃষ্ণাণ। তাই ‘জাতীয় শিক্ষক সংস্থা’ ১৯৬২ সালে তাঁর জন্মদিনটি সারা দেশজুড়ে পালন করার জন্য উদ্যোগী হয়। তিনি তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন। কিন্তু তিনি নিজের জন্মদিন পালনে আপত্তি জানান এবং বলেন তাঁর জন্মদিন উদযাপন করতে হলে, তা শিক্ষক দিবস হিসেবে উদ্যাপিত করা হোক। সে দিন প্রথম জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবেই তাঁর জন্মদিনটি পালন করা হয়। তারপর থেকেই এই দিনটিকে ভারতবর্ষে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। যদিও
ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয় ৫ অক্টোবর। কিন্তু সর্বেপল্লি রাধাকৃষ্ণাণের জন্মদিন হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর দিনটিকে ভারতবর্ষে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এছাড়াও ‘হেল্পএজ ইন্ডিয়া’-র (Helpage India) তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ‘হেল্প এজ ইন্ডিয়া’ অসহায় বয়স্ক মানুষদের জন্য একটি অলাভজনক সংস্থা।
১৯৭৫ সালের ১৭ এপ্রিল ভারতের চেন্নাইয়ে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান