একটাই উৎসব দীপাবলি – কিন্তু তারই কত বৈচিত্র্য, কত রকম রীতি-নীতি। বাঙালিদের কাছে পাঁচ দিনের উৎসব দীপাবলির প্রধান আকর্ষণ কালীপূজা আর ভাইফোঁটা। আবার অন্যদিকে অবাঙালিরাও এই দীপাবলিকে ‘দিওয়ালি’ হিসেবে পালন করে যা শুরু হয় ধনতেরাস পালনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ভারতের বাইরে মূলত নেপালে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দীপাবলির এই পাঁচ দিন পালন করে থাকেন ‘ তিহার উৎসব ’ (Tihar Festival)হিসেবে। তবে নেপালের পাশাপাশি সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দার্জিলিং, কালিম্পং প্রভৃতি অঞ্চলেও এই তিহার উৎসব খুবই জনপ্রিয়।
নেপালের হিন্দুদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ও বৃহত্তম এই তিহার উৎসব মূলত কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পূর্ণিমা তিথির দুই দিন আগে শুরু হয় এবং এই পূর্ণিমার দুই দিন পরে শেষ হয়। মোট পাঁচ দিন ধরে চলে তিহার উৎসব।
তিহার উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেপালি হিন্দুদের এক ভিন্নতর পৌরাণিক আখ্যান এবং কিছুটা জনশ্রুতিও। এই উৎসবের পাঁচ দিনে চারটি আলাদা আলাদা প্রাণীর উদ্দেশ্যে পুজো করা হয়। কাক, কুকুর, গরু, ষাঁড় এই চারটি প্রাণীকে যথাক্রমে তিহার উৎসবের প্রথম চার দিন পুজো করা হয়। হিন্দুধর্মে কাককে যমরাজের দূত হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এবং মানুষ বিশ্বাস করেন যে কাকের ডাকের সঙ্গে শোক ও হতাশার বার্তা মিশে থাকে। দ্বিতীয়ত কুকুরকেও হিন্দু ধর্মে যমরাজের দূত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে কুকুরের বিশ্বস্ততা আর মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য সামাজিকভাবেও কুকুর মানুষের কাছে বড় প্রিয়। মহাভারতে দেখা যায়, মহাপ্রস্থানের সময় পাণ্ডবেরা যখন স্বর্গলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, সেই সময় একমাত্র যুধিষ্ঠিরকেই শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছিল একটি কুকুর। তাঁর চার ভাই এবং দ্রৌপদীও অনেক আগেই অবসন্ন হয়ে যাত্রাভঙ্গ করেছিলেন। স্বর্গের প্রধান দ্বারে যুধিষ্ঠির যখন সেই কুকুরটিকে ছাড়া ভিতরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেন, সেই সময় কুকুরবেশী যম স্বরূপে অবতীর্ণ হন। ফলে সেই মহাভারতেও মানুষ ও কুকুরের একটি অচ্ছেদ্য সখ্যতার বন্ধনের ছবি পাওয়া যায়। আবার পুরাণে বলা আছে, শিবের আরেক রুদ্র রূপ ভৈরবের বাহন হল এই কুকুর এবং মৃত্যুর দেবতা যমের সঙ্গে থাকে দুটি কুকুর যাদের প্রত্যেকের চারটি করে চোখ রয়েছে হিন্দু বিশ্বাসে যারা হল নরকের প্রবেশদ্বারের রক্ষক। গরু সেই প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দুদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গরুর কাছ থেকে মানুষ নানাভাবে উপকৃত হয়েছে বলে অনেক জায়গায় গরুকে গো-মাতা হিসেবেও পূজা করা হয়। নেপালিরা এই বিশ্বাস থেকেই গরুকেও এই তিহার উৎসবে পূজা করে থাকেন। গরুর দুধ, দুগ্ধজাত ছানা ও ঘি মানুষের খাদ্যের অঙ্গ আর তাছাড়া গরুর মল অর্থাৎ গোবর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গোমূত্রকে পবিত্র বলে মনে করেন হিন্দুরা। ষাঁড় মূলত কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, ফলে মানবজীবনে তারও কিছু ভূমিকা আছে। সবশেষে তিহার উৎসবের শেষ দিনে যে ‘ভাই টিকা’-র সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে তার পৌরাণিক আখ্যানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ‘ভাই টিকা’-র সঙ্গে ভাইফোঁটার কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। নেপালি হিন্দুদের জনশ্রুতিতে রয়েছে যে কিরাত রাজা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন যম তাঁর প্রাণ নিতে দরজায় এসে দাঁড়ান। রাজার বোন তাঁকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেন যতক্ষণ না তিনি ভাইয়ের জন্য পূজা সমাপ্ত করে তাঁর কপালে টিকা পরিয়ে দিচ্ছেন। যম কিছুতেই অপেক্ষা করতে চান না এবং তিনি কিরাতের দেহ টেনে নিয়ে যেতে গেলে রাজার বোন বাধা দেন। অনেক বাকবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর পূজা সমাপ্ত হয়। এরপর যমকে তিনি বলেন যে ভাইয়ের কপালে পরানো পঞ্চরঙের টিকা শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত যম কিছুতেই তাঁর ভাইকে নিয়ে যেতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত কিরাত রাজার বোন যমকে এও বলেন যে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাঁর ভাইয়ের চারপাশে কাটা বৃত্তাকার গণ্ডিটি শুকিয়ে যায়, ততক্ষণ যমকে অপেক্ষা করতে হবে। যম এতে রাজি হন। কিন্তু কিরাতের বুদ্ধিমান বোন তাঁর ভাইয়ের চারপাশে জলের বদলে তেল দিয়ে সাতটি বৃত্তাকার গণ্ডি কেটেছিলেন যার ফলে তেল কখনোই শুকোয় না আর তাঁর ভাইও বেঁচে থাকেন। আরেকটি শর্ত দিয়েছিলেন কিরাতের বোন। যমকে তিনি জানান যে ভাইয়ের গলায় যে ফুলের মালা তিনি পরিয়েছেন তা যতক্ষণ না শুকিয়ে ম্লান হচ্ছে, ততক্ষণ যম তাঁর ভাইয়ের প্রাণ নিতে পারবেন না। এর ফলে যমরাজ জানান একমাত্র কিরাতের বোন যদি বৃদ্ধ হয়ে কিরাতের আগে মারা যায়, তবেই তিনি কিরাতের প্রাণ নেবেন। এর থেকেই এই ‘ভাই টিকা’র উৎপত্তি। মূলত গোর্খা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পৌরাণিক আখ্যানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
পাঁচ দিন ধরে তিহার উৎসব চলে যার প্রথম দিনের নাম – ‘কাক তিহার’। এই দিনে কাককে শস্যবীজ, দানা, মিষ্টি ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়। কাককে খাবার দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ ভাবেন আগামী বছরের হতাশা, শোক-দুঃখ থেকে মুক্তি পাবেন তারা। দ্বিতীয় দিনটি পালিত হয় ‘কুকুর তিহার’ হিসেবে। নেওয়ার বৌদ্ধদের মধ্যে এই উৎসব ‘খিচা পূজা’ নামে খ্যাত। এই দিনে পোষা বা রাস্তার সমস্ত কুকুরকে পুজো করে, খাবার খাইয়ে কপালে পরিয়ে দেওয়া হয় মঙ্গল টিকা। অনেকক্ষেত্রে ফুলের মালাও পরানো হয় কুকুরদের। পুজো আর মহাভোজের মধ্য দিয়ে কুকুর তিহার পালন করেন নেপালি হিন্দুরা। তিহার উৎসবের তৃতীয় দিনের নাম ‘গাই উৎসব ও লক্ষ্মীপূজা’। এই দিনে গরুকে ফুলের মালা ও টিকা পরিয়ে পূজা করা হয় এবং তাঁকেও দেবতা হিসেবে নৈবেদ্য অর্পণ করা হয়। এই দিনে সন্ধ্যেবেলা দেবী লক্ষ্মীর পুজা করে থাকেন নেপালি হিন্দুরা। ফলে তাঁদের কাছে তিহারের তৃতীয় দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনে বাড়ি-ঘর ভালোভাবে পরিস্কার করে প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তোলেন তারা। সমৃদ্ধি, ধনলাভ এবং সুখ-শান্তির কামনায় দেবী লক্ষ্মী পূজিতা হন। পূজা শেষে তরুণী-কিশোরীরা পাড়ায় পাড়ায় গান গাইতে বেরোন। এই ঐতিহ্যবাহী লোকাচারটির নাম ‘ভাইলো’। এই গান গাওয়ার পরিবর্তে তাঁদের সামান্য কিছু টাকা, নারকেল ও খাবার দেওয়া হয়। চতুর্থ দিনটি ‘গোবর্ধন পূজা ও মহাপূজা’। পবিত্র গোবর্ধন পর্বতের উদ্দেশ্যে বৈষ্ণব হিন্দুরা গোবর্ধন পূজা করে থাকেন নেপালে এবং এই গোবর্ধন পর্বতের প্রতীক হিসেবে এক তাল গোবরকে পূজা করা হয়। নেপালের সম্ভাব বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন হিসেবে এই দিনেই নেওয়ারদের মধ্যে মহাপূজার রীতি লক্ষ করা যায়। নিজের আত্মার শুদ্ধি করা হয় এই পূজার মাধ্যমে। আর সবশেষে ভাইফোঁটার দিনে দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদাকে মঙ্গলটিকা পরিয়ে দেন। এই দিনে বোনেরা বা দিদিরা প্রচলিত লৌকিক প্রথা মেনে আখরোট ভাঙে যা আসলে কাল্পনিক যুদ্ধে যমের মাথা ভাঙার প্রতীক। ভাইয়েরা দিদির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। উভয়ের মধ্যে মিষ্টি বিনিময় চলে। দিদিরা ভাইয়দেরকে ফল ও অন্যান্য প্যাকেটবন্দি খাবার উপহার দিয়ে থাকেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান