ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উমাবাঈ কুন্দপুর (Umabai Kundapur) এক সংগ্রামী বিপ্লবী নারীর মর্যাদায় আসীন। স্থানীয় মহিলাদের একজোট করে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করেছিলেন তিনি যেগুলি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। যে মহিলারা কোনোদিন বাড়ির বাইরে পা রাখেননি তাদের সংগঠিত করে বৈপ্লবিক সংগ্রামে সামিল করার কৃতিত্ব উমাবাঈ কুন্দপুরের। ‘হিন্দুস্তানি সেবা দল’ নামে একটি নারীবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তিনি এবং একইসঙ্গে তাঁরই নেতৃত্বে তৈরি হয় ‘ভগিনী মণ্ডল’। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে কর্ণাটকের কস্তুরবা ট্রাস্টের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। একাধারে বজ্রকঠিন হৃদয় এবং মানুষের সেবায় দরদী চিত্তের অধিকারী উমাবাঈ কুন্দপুর ভারতের ইতিহাসে আজও স্মরণীয়।
১৮৯২ সালে ম্যাঙ্গালোরে উমাবাঈ কুন্দপুরের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম ভবানী গোলিকেরি। তাঁর বাবার নাম গোলিকেরি কৃষ্ণা রাও এবং মায়ের নাম জুঙ্গাবাঈ। তাঁদের মোট পাঁচটি সন্তানের মধ্যে উমাবাঈই ছিলেন একমাত্র কন্যা। বিংশ শতাব্দীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বম্বে (অধুনা মুম্বাইতে স্বাধীনতা) র আঁচ এসে পড়েছিল। সেই সময় বম্বেও একটি উঠতি বৃহত্তর নগরের রুপ নিচ্ছিল। উমাবাঈ য়ের পরিবার এসে ওঠেন এই মুম্বাইতে। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই উমাবাঈয়ের বিবাহ হয়ে যায় সঞ্জীব রাও কুন্দপুরের সঙ্গে। উমাবাঈয়ের শ্বশুরমশাই নিজেও একজন সংস্কারক ছিলেন যিনি মনেপ্রাণে নারী প্রগতিতে বিশ্বাস করতেন। তাঁরই উৎসাহে ও অনুপ্রেরণায় বিবাহের পরেও উমাবাঈ পড়াশোনা চালিয়ে যান।
বিবাহের পরেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন উমাবাঈ কুন্দপুর। তারপর থেকে শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ের ‘গৌণদেবী মহিলা সমাজ’ নামের একটি সমিতিতে মহিলাদের শিক্ষিত করে তোলার কাজে ব্রতী হন। ১৯২০ সালে লোকমান্য তিলকের মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহকে ঘিরে যে শোকমিছিল বের হয় বম্বে জুড়ে তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল কিশোরী উমাবাঈ কে। প্রায় পাঁচ লক্ষ লোক সেইদিন লোকমান্য তিলকের শেষযাত্রায় সমবেত হয়েছিল। সেকালে জাতীয় কংগ্রেস এবং এর অধীনস্থ সমস্ত রাজনৈতিক সংগঠনগুলির জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ছিল তুঙ্গে। আর এর প্রভাবেই উমাবাঈ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং জাতীয় রাজনীতিতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন। খাদির কাপড়ের প্রচারের জন্য তিনি প্রথমে কাজ করতে শুরু করেন, স্বদেশি আন্দোলন সম্পর্কে নিজেই নাটক লিখে ও অভিনয় করতে শুরু করেন উমাবাঈ । নিজের বুদ্ধিতে মহিলাদের সংগঠিত করে দরজায় দরজায় গিয়ে খাদি বিক্রি করার কাজে ব্রতী হন উমাবাঈ । মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর স্বামী যক্ষ্মা রোগে মারা গেলে তাঁর শ্বশুরমশাই আনন্দ রাও উমাবাঈকে যথাসাধ্য সান্ত্বনা ও মানসিক প্রশান্তি যোগাতে চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা তখন হাবলিতে এসে ওঠেন এবং আনন্দ রাও কর্ণাটক প্রেস চালু করে সংবাদপত্রের কাজ শুরু করেন। সেই প্রেসের পরিসরের মধ্যেই গড়ে ওঠে একটি নারীশিক্ষার স্কুল যার নাম ‘তিলক কন্যা শালা’। এই স্কুলের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকেন উমাবাঈ কুন্দপুর।
১৯২১ সালে ভারতীয় যুবকদের সংগঠিত করতে ড. এন. এস. হার্দিকার তৈরি করেন ‘হিন্দুস্তানি সেবাদল’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ে ভারতে এসে হার্দিকার বুঝতে পেরেছিলেন তিলক-পরবর্তী ভারতে জাতীয় সচেতনতা তৈরি করতে বেশ কিছু দল গঠন প্রয়োজন। ‘হিন্দুস্তানি সেবা দল’-এর মূল কর্মকেন্দ্র হয়ে ওঠে হাবলি-ধারওয়াড়। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত এবং মহারাষ্ট্র থেকে বহু তরুণ-তরুণী এই দলে যোগ দিতে শুরু করেন। ড্রিল, ক্যাম্প করা, বিভিন্ন ব্যায়াম কৌশল, জিমন্যাস্টিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সেলাই করা এবং নানাবিধ স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করানো হত এই দলে। জওহরলাল নেহরু হাবলিতে এসে এই সংগঠনের কাজ পরিদর্শন করেছেন। উমাবাঈ কুন্দপুরকে হিন্দুস্তানি সেবা দলের নারীবাহিনীর নেতৃত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯২৪ সালে বেলগাঁওতে যে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভা বসে, সেখানে গান্ধীজি প্রথমবার সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা হয়। উমাবাঈ এবং হার্দিকার উভয়ের পক্ষেই জাতীয় একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা দুঃসাধ্য ছিল। এই ঘটনা উপলক্ষে উমাবাঈ দেড়শো জন মহিলা স্বেচ্ছাসেবী নিযুক্ত করেন এবং তাঁদের নিয়ে সমগ্র রাজ্য ঘুরতে থাকেন। এই কাজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরে মহারাষ্ট্রের বিধবা মহিলারাও স্বেচ্ছাসেবকের কাজে যোগ দিতে উৎসুক হয়ে ওঠেন। ১৯৫২ সালে কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় এই দলে যোগ দেন উমাবাঈ য়ের অধীনে। ১৯৩২ সালে চার মাসের জন্য কারাবরণ করতে হয় উমাবাঈকে এবং সেই সময় ইয়েরাওয়াড়াতে তিনি বন্দি ছিলেন। এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে তাঁর শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর খবর পান তিনি। সেই একই জেলে বন্দি ছিলেন সরোজিনী নাইডু যিনি উমাবাঈ কে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দেন এবং বাইরে চোখে পড়ার মতো কাজ না করে আড়ালে থেকে কাজ চালিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। সেই মত জেলে থাকাকালীনই আড়ালে থেকে দলের কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন উমাবাঈ । জেল থেকে ছাড়া পেয়ে উমাবাঈ লক্ষ্য করেন শ্বশুরমশাইয়ের কর্ণাটক প্রেস এবং প্রেসের এলাকার মধ্যে স্থাপিত ‘তিলক কন্যা শালা’ স্কুলটিও ব্রিটিশ সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। উমাবাঈ যে ‘ভগিনী মণ্ডল’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন সেটিকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু উমাবাঈ এতে দমে যাননি। তাঁর ছোট্ট বাড়িটিই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে অনেকেই ব্রিটিশ পুলিশের চক্ষুশূল হয়েছিলেন এবং পুলিশ তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজছিল। ফলে তাঁদেরকে বহু ঝুঁকি নিয়েই উমাবাঈ আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই সময় লবণ সত্যাগ্রহ কিংবা করমুক্তি আন্দোলন কোনোটাই সেভাবে প্রসারিত হতে পারেনি। বহু মানুষকে নির্বিচারের গ্রেপ্তার করে জেলবন্দি করা হচ্ছিল তখন, মহিলারাও এই তালিকা থেকে বাদ থাকেননি। সেইসব মহিলাদের যখন জেল থেকে ছাড়া হয়, তখন তাঁরা একেবারে কপর্দকশূন্য। হাবলির টাঙ্গাওয়ালারা তাঁদের একত্রে নিয়ে আসে উমাবাঈ য়ের কাছে। উমাবাঈ তাঁদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য টাকা এবং যথাযথ খাবারের বন্দোবস্ত করে দেন।
১৯৩৪ সালে বিহার ভূমিকম্প দুর্গতদের সেবায় অগ্রণী হয়ে ওঠেন উমাবাঈ কুন্দপুর। সেকালে পর্দাপ্রথা ছেড়ে এত সক্রিয়ভাবে কোন মহিলাই দেশসেবার কাজে ব্রতী হতেন না। উমাবাঈ এবং তাঁর স্বেচ্ছাসেবকের দল সারা দিন-রাত বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে কাজ করে যেতেন। এই সময়েই বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ, আচার্য কৃপালিনী এবং আরো অন্যান্য দেশসেবকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে উমাবাঈ য়ের। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন তাঁর জীবনে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা এনে দেয়। ব্রিটিশদের রোষে গা ঢাকা দিয়ে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী উমাবাঈয়ের বাড়িতে এসে উঠেছিলেন খাদ্য ও আশ্রয়ের ভরসায়। সকলকেই তিনি সাহায্য করতেন এবং আড়ালে থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৪৬ সালে মহাত্মা গান্ধী কস্তুরবা ট্রাস্টের কর্ণাটক শাখার প্রধান হিসেবে উমাবাঈ কে নিযুক্ত করেন। স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির, শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্রাম সেবিকাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামীন উন্নয়নের নানাবিধ কাজে এগিয়ে আসত এই ট্রাস্ট। যদিও সেই সময় সরকারি তরফে এক টাকাও সাহায্য পাওয়া যেত না এইসব কাজে। তাই উমাবাঈ ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করেছেন – কিশোরী বিধবা, অবিবাহিত অনাথ এবং অভাগিনী মহিলারাও এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। বিভিন্ন হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ পেয়ে অল্প দিনের মধ্যেই তারা স্বনির্ভর হয়ে ওঠেন। কর্ণাটকের ঘরে ঘরে উমাবাঈ কুন্দপুরের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি চাইলেই সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক উঁচু পদে বসতে পারতেন, কিন্তু তার বদলে সামান্য একজন কর্মী হিসেবেই নিজের জীবন বেছে নেন উমাবাঈ । সামনের সারির স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যে ‘তাম্রপত্র পুরস্কার’ দেওয়া হয়, তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন উমাবাঈ । তাঁর মৃত শ্বশুরমশাইয়ের নামে একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন উমাবাঈ যার নাম ‘আনন্দ স্মৃতি’ । সেই ছোট্ট বাড়িতেই আমৃত্যু দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি।
পরবর্তীকালে ড. এন.এস.হার্দিকার কর্ণাটকের এই মহান নারীকে সম্মানিত করেছিলেন। রাজনীতিই হোক বা সমাজ সংস্কার কিংবা শিক্ষা, সব ক্ষেত্রেই বহু নেতা-নেত্রী স্বেচ্ছাসেবকের কাজে এসেছিলেন এবং কালক্রমে কাজ থেকে অন্তর্হিত হয়েছেন। কিন্তু উমাবাঈ কুন্দপুর নিরলসভাবে আমৃত্যু কোনো পদাধিকার ছাড়াই ভারতের নারীজাতির উন্নয়নে এবং সামগ্রিক সমাজ-সংস্কারে ব্রতী থেকেছেন।
১৯৯২ সালে একশো বছর বয়সে উমাবাঈ কুন্দপুর এর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান