সববাংলায়

বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা

অগ্নিযুগের বাংলায় বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জোয়ারে ব্রিটিশদের হত্যার ষড়যন্ত্রই হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের প্রধান হাতিয়ার। অত্যাচারী ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলার গুপ্ত বিপ্লবী সমিতির সদস্যরা। শুধু বাংলা নয় সমগ্র ভারত জুড়ে ইতস্তত গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল এবং একের পর এক বোমা মামলা, ব্রিটিশ হত্যার ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হচ্ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বীরভুম জেলাও এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে বাদ পড়েনি। আর তাই আলিপুর বোমা মামলা, মুজফ্‌ফরপুর বোমা মামলা, মেদিনীপুর বোমা মামলার মতোই ইতিহাসে অন্যতম একটি ঘটনা হল বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা।

১৯৩৪ সালের ১৪ জুলাই সিউড়ি আদালতে শুরু হয়েছিল বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জগদীশ ঘোষ, রজতভূষণ দত্ত, প্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায়, নিত্যগোপাল ভৌমিক, জয়গোপাল চক্রবর্তী প্রমুখ মোট একুশ জন বিপ্লবীকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১ ধারায় অভিযুক্ত করে এই মামলা শুরু হয়। যদিও ব্রিটিশ পুলিশ মোট বিয়াল্লিশ জন বিপ্লবীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল।

বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলার পিছনে বীরভূমের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডই ছিল প্রধান। এই বৈপ্লবিক কার্যকলাপের নেতৃত্বে ছিলেন রজতভূষণ দত্ত, দুকড়িবালা দেবী প্রমুখ। সুভাষচন্দ্র বসুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে যোগ দিয়েছিলেন রজতভূষণ দত্ত, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন বিদেশি মদের দোকানের সামনে পিকেটিং করার অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তারপর ‘যুগান্তর’ গুপ্ত বিপ্লবী দলে যোগ দেন রজতভূষণ দত্ত। এর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে অনুশীলন সমিতি ও আরো অন্যান্য গুপ্ত বিপ্লবী সমিতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে। গান্ধীজি পরিচালিত আইন অমান্য আন্দোলনের জোয়ারে যখন সমগ্র বীরভূম জেলা উত্তাল হয়ে ওঠে, রজতভূষণ দত্তও এই আন্দোলনে যোগ দেন। মেদিনীপুরের কাঁথিতে এই সময় বিভিন্ন বিপ্লবীদের পাঠানোর জন্য সিউড়িতে একটি কেন্দ্র খোলা হয়েছিল এবং সেই সময় ১৪৪ ধারা ভাঙার অপরাধে রজতভূষণ দত্তকে জেলে বন্দি করে ব্রিটিশ পুলিশ। এই জেলের মধ্যেই দ্বারিক রায়, জগদীশ ঘোষ, সমাধিশ রায়, মণিলাল ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে রজতভূষণের এবং এখানেই বীরভূম ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়। জেলের মধ্যেই তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতেন। কারামুক্তি ঘটার পরে বাইরে এসে তাঁরা এক সংগঠিত আন্দোলনের পরিকল্পনা করে জেলা কংগ্রেসের মধ্যে বিবাদের জেরে আমোদপুরের কাছে কুচুইঘাটা গ্রামে রজতভূষণ দত্ত, জগদীশ ঘোষ প্রমুখ বিপ্লবীরা মিলে একত্রে গড়ে তুলেছিলেন ‘বীরভূম জেলা যুব সমিতি’। বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলার পিছনে এই সমিতিরই প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে এই সমিতির উদ্যোগে বীরভূমের বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি, লুঠপাট, অর্থ ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই করা চলতে থাকে। সিউড়ি জেলে বন্দি বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে এই সমিতি। এর জন্য সেলের ডুপ্লিকেট চাবিও বানিয়েছিলেন তাঁরা। এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে বীরভূমের লাভপুর, দুবরাজপুর, সিউড়ি, ময়ূরেশ্বর, হেতমপুর, সুবলপুর প্রভৃতি জায়গায় অর্থ সংগ্রহের জন্য লুঠপাট চালাতে থাকে। এইসব অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রজতভূষণ দত্তই। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন বিপ্লবী হিসেবে জগদীশ ঘোষ গ্রেপ্তার হন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ‘বেঙ্গল ক্রিমিন্যাল ল অ্যামেণ্ডমেন্ট’ ধারায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ পুলিশ সুপার সামসুদ্দোহা পুলিশের আইজির কাছে একটি চিঠিতে বীরভূমের ডাকাতির সঙ্গে বিপ্লবীদের সংযোগ আছে এমন সন্দেহ প্রকাশ করেন। আর এই চিঠির ভিত্তিতেই ব্রিটিশ পুলিশ তৎপর হয়ে বিপ্লবীদের খোঁজা শুরু করে। ১৯৩৩ সালের ১৬ জুন ব্রিটিশ পুলিশ জয়গোপাল চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর সঙ্গে কিছু বৈপ্লবিক ইস্তাহারও পাওয়া যায়। তারপর একে একে গ্রেপ্তার হন নিত্যগোপাল ভৌমিক এবং রজতভূষণ দত্ত সহ আরো বিয়াল্লিশ জন। পুলিশের সন্ধান শুরু হয়েছে দেখে একটি বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকতেন রজতভূষণ, কিন্তু সেই বাড়িতেও পুলিশ ঢুকে পড়লে তিনি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেন। জলের মধ্যেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন বিপ্লবী রজতভূষণ দত্ত। এই সময় পুলিশের তল্লাশিতে একটি চালকল থেকে কিছু অস্ত্রও পাওয়া যায়। তারপরে ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিয়াল্লিশ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে মোট একুশ জনকে অভিযুক্ত করে শুরু হয় বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা।

১৯৩৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলার চূড়ান্ত রায় বেরোয় যাতে প্রভাতকুমার ঘোষ, রজতভূষণ দত্ত, সমাধিশ রায়, হারানচন্দ্র খাঙ্গার প্রমুখদের বিপ্লজ্জনক বিপ্লবী আখ্যা দিয়ে তাঁদের সকলকে আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে রজতভূষণ দত্ত ও প্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায়কে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। আন্দামানের জেলে থাকাকালীন রজতভূষণ দত্তের উপর নির্মম অত্যাচার করে ব্রিটিশ পুলিশ। মোট বারো বছর সেলুলার জেলে বন্দি ছিলেন রজতভূষণ দত্ত।

বীরভূমের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দুকড়িবালা দেবী, ননীবালা দেবী কিংবা আরও অন্যান্য বিপ্লবীদের আন্দোলনের পাশাপাশি এই মামলা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading