সববাংলায়

বিশ্বকাপ ট্রফির অজানা কাহিনী

ফিফা বিশ্বকাপ সমগ্র বিশ্বজুড়ে ফুটবল খেলার একটি আন্তর্জাতিক জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা। সেই ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি চার বছর অন্তর এই প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ফিফা-র অন্তর্ভুক্ত একেকটি পৃথক দেশে একেকবার এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা মানেই পুরস্কার তো থাকবেই। ফিফা-র বিজয়ী দেশকে সেই শুরুর দিন থেকেই দেওয়া হয়ে আসছে একটি ট্রফি। আর এই ট্রফির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এক বিরাট ইতিহাস। আজকে যে ট্রফিটি আমরা দেখতে পাই, সেটা কিন্তু প্রথমে ছিল না। এমনকি ফিফার যে আসল ট্রফি তা কখনই বিজয়ী দলকে দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় মূল ট্রফির রেপ্লিকা। আবার এই ট্রফিটিই নাকি কয়েকবার চুরিও হয়ে যায়। এমন অদ্ভুত আর আশ্চর্য সব তথ্য জড়িয়ে আছে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফিকে ঘিরে। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক বিশ্বকাপ ট্রফির অজানা কাহিনী (Hidden Facts of FIFA World Cup Trophy)।

১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপজয়ী দেশকে যে ট্রফিটি দেওয়া হত, তার নাম ছিল ‘জুলে-রিমে কাপ’। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের নামানুসারে এই ট্রফির নামকরণ করা হয়েছিল। যদিও এই ট্রফিটির আসল নাম ছিল ‘ভিক্টরি’ (Victory)। ১৯৪৬ সালে ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের (Jules Rimet) নামানুসারে এর নাম পরিবর্তন করা হয়। জুলে রিমেই বিশ্বকাপের প্রথম প্রতিযোগিতাটি আয়োজন করেছিলেন উরুগুয়েতে। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফলেউর-এর দ্বারা এই জুলে রিমে কাপটি নির্মিত হয়েছিল যা মূলত গ্রিক পুরাণের বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’র আদলে তৈরি করা হয়েছিল। সোনার প্রলেপ দেওয়া রূপোর তৈরি সমগ্র ট্রফিটির ওজন ছিল ৩.৮ কেজি এবং এর উচ্চতা ছিল ৩৫ সেমি.। এই ট্রফির দেবী মূর্তির হাতেই একটি আট-কোণা বিশিষ্ট কাপ দেখা যেত আর ‘লাপিস লাজুলি’ (Lapis Lazuli) নামে একটি মূল্যবান পাথরের তৈরি কাপের ভিতের নিচের দিকে ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলির নাম ক্রমান্বয়ে খোদাই করা হয়েছিল। কাপটির ভিতের চারদিকেই সোনার পাত লাগানো ছিল। সেই সময় নিয়ম ছিল যে দেশ পরপর তিনবার বিশ্বকাপ জয় করতে পারবে, সেই দেশই একমাত্র আসল বিশ্বকাপ ট্রফিটি সারাজীবনের জন্য নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ১৯৩০ সালের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছিল উরুগুয়েতে আর তাই রোমানিয়া, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের জাতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে জুলে রিমে ইতালীয় যাত্রীবাহী জাহাজ ‘কন্তে ভার্দে’তে চড়ে ট্রফিটিকে উরুগুয়েতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই প্রতিযোগিতায় উরুগুয়ে জয়ী হওয়ায় সেবারে ট্রফিটি সেখানেই থেকে যায়। ১৯৩৪ সালে আবার ইতালি এই ট্রফি জয় করে ইউরোপে নিয়ে আসে এবং ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিল ট্রফিটি।

শোনা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসিরা যাতে এই ট্রফি বাজেয়াপ্ত না করতে পারে, সেই জন্য ডা. অটোরিনো বারাসি নামে জনৈক ইতালীয় ক্রীড়া কর্মকর্তা রোমের একটি ব্যাঙ্কের ভল্ট থেকে ট্রফিটি সরিয়ে নিজের বিছানার তলায় একটি জুতোর বাক্সে লুকিয়ে রাখেন যতক্ষণ না যুদ্ধ থামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৫০ সালে পুনরায় ব্রাজিলের এই কাপ জয় করা পর্যন্ত বারাসির বিছানার নিচে সযত্নে জুতোর বাক্সের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফিটি লুকোনো ছিল। ১৯৫৪ সালে পুরনো জুলে রিমে কাপটির ভিত পাল্টানো হয় এবং আরও বিজয়ীদের নাম খোদাই করার জন্য এর উচ্চতা বাড়ানো হয়।

বিশ্বযুদ্ধের সময় জুলে রিমে ট্রফিটি অক্ষত থাকলেও চুরির হাত থেকে একে দ্বিতীয়বার আর রক্ষা করা যায়নি। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের আগে এটি আরেকবার চুরি হয় এবং তারপর এর কোনও হদিশই পাওয়া যায় না। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক চার মাস আগে ওয়েস্টমিনস্টারের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে একটি প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ হঠাৎ করেই ঐ প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি অদৃশ্য হয়ে যায়। ঐ প্রদর্শনীতে অনেক দুর্লভ ডাকটিকিট ছিল যার মূল্য সেই সময়েই ছিল প্রায় ৩০ লক্ষ পাউন্ড। কিন্তু ট্রফি যে নিয়েছে, সে এইসবে হাত পর্যন্ত দেয়নি। অদ্ভুতভাবে সেই সময় ট্রফির মূল্য ছিল মাত্র ৩০ হাজার পাউন্ড। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। এরপরেই ঠিক যে সময় ট্রফিটি সন্ধানের চেষ্টা চালাচ্ছিল পুলিশ ও প্রশাসন, ফুটবল আসোসিয়েশন এবং লন্ডন ক্লাব চেলসির চেয়ারম্যান জো মিয়ার্স ‘জ্যাকসন’ নামে এক আগন্তুকের কাছ থেকে একটি চিঠি পান যেখানে সেই আগন্তুক ট্রফিটি ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করেন এবং চেলসির হোম স্টেডিয়াম স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের সামনেই এই হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করা হয়। পুরো ঘটনাটা একটা ক্রাইম থ্রিলার গল্পকেও হার মানাবে। জাল টাকার নোট এবং বাতিল কাগজ জ্যাকসনকে দেওয়ার পরে মিয়ার্সের সহকারীর ছদ্ম-পরিচয়ে একজন গোপন গোয়েন্দা জ্যাকসনকে ট্রফির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। জ্যাকসন ঘটনার আঁচ পেয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাড়া পাননি তিনি। পুলিশের হাতে অবশেষে গ্রেপ্তার হন জ্যাকসন। জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যায় তাঁর আসল নাম এডওয়ার্ড বেসলি এবং পুলিশের খাতায় আগেই কয়েকবার তার নাম উঠেছে চুরির দায়ে। ধরা পরার পর তিনি বলেন যে তিনি নাকি নিজে এই ট্রফিটি চুরি করেননি, ‘দ্য পোল’ নামে আরেক আগন্তুক ব্যক্তির মধ্যস্থতা করেছেন মাত্র। যাইহোক বেসলির দু বছরের কারাদণ্ড হয় ঠিকই, কিন্তু সেই ট্রফিটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঘটে যায় এক আশ্চর্য সমাপতন! দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা জনৈক বার্জ-চালক ডেভিড করবেট তাঁর পোষ্য কুকুর ‘পিকলস’কে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। ট্রফি চুরির পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। কুকুরটিকে নিয়ে একটি টেলিফোন বুথে ফোন করার জন্য ডেভিড যখন থামেন, তখনই এক প্রতিবেশির গাড়ির নিচ থেকে শুঁকে শুঁকে পিকলস একটি কাগজে মোড়া জিনিস বের করে। প্রথমে বোমা সন্দেহে আতঙ্কিত হলেও পরে সেই কাগজের মোড়ক থেকেই উদ্ধার হয় হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি। দুর্ভাগ্যের বিষয় স্থানীয় থানায় ডেভিড করবেট যখন সেই ট্রফিটি জমা দিতে যান, সেখানে ট্রফি চুরির সন্দেহে তাঁকে থানায় আটকে রাখা হয়। যদিও পরে তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। এরপর থেকেই ডেভিড করবেট এবং তার কুকুর পিকলস অত্যন্ত জনপ্রিয় তারকা হয়ে ওঠেন।

১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মত ব্রাজিল বিশ্বকাপে জয়ী হলে জুলে রিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। তবে এই আসল ট্রফিটিও ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন-এর সদর দপ্তর থেকে দ্বিতীয়বার চুরি হয়ে যায়। ফলে তার পরের বছর সিবিএফ একটি রেপ্লিকা ট্রফি কমিশন করে এবং ১৯৬৬ সালে প্রথমবার চুরির পরে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নির্মিত আরেকটি রেপ্লিকা ১৯৯৭ সালের একটি নিলামে ফিফা কিনে নেয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এই ট্রফির রেপ্লিকা কমিশন তৈরি করলে জনৈক ব্রিটিশ আলঙ্কারিক জর্জ বার্ড মূল ট্রফির একটি ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা নির্মাণ করে দেন। প্রথম সেই আবেল লাফলিউর তৈরি ট্রফিটির কেবলমাত্র ভিতটুকুই আজও অক্ষত রয়ে গেছে যেটি পরে খুলে নিয়ে বেশি উচ্চতার ভিত বসানো হয়েছিল। ২০১৫ সালে জুরিখে ফিফার সদর দপ্তরে এই ভিতের টুকরোটি জনসমক্ষে আসে।

তবে ১৯৭৪ সাল থেকে জুলে রিমে ট্রফির বদলে বিশ্বকাপজয়ী দেশকে একটি নতুন ট্রফি দেওয়া হতে থাকে যাকে বলা হয় ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। সাতটি দেশ থেকে ভাস্করেরা মোট ৫৩টি নমুনা পাঠিয়েছিলেন এই বিশ্বকাপ ট্রফির চূড়ান্ত মডেলের জন্য। তবে সবশেষে ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগাই এই ট্রফিটি তৈরি করার অনুমতি পান। বর্তমানে ফিফা ট্রফিটি ৩৬.৫ সেমি লম্বা, ৬.১৭৫ কেজি ওজনের ১৮ ক্যারাট সোনা দিয়ে তৈরি। এর ভিতটি ১৩ সেমি ব্যাসার্ধের বৃত্তাকার পাতের উপর বসানো যার মধ্যে দ্বিস্তরীয় ম্যালসাইট রয়েছে। এই ট্রফিটি কিন্তু ভিতর থেকে ফাঁপা এবং এর ভিতের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপ কথাটি খোদিত আছে দেখা যায় আর এর মধ্যেই উল্লম্বভাবে বিজয়ী দেশের নামও খোদিত থাকতে দেখা যায়। ২০১৪ সালের পরে এটির আকার আরও বদলে যায় কিছুটা। তবে জুলে রিমে ট্রফির মতো এই নতুন ট্রফিটি কোনও দেশই স্থায়ীভাবে নিয়ে যেতে পারে না। প্রতিবার বিশ্বকাপজয়ী দেশ এই ট্রফির একটি সোনার প্রলেপযুক্ত ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা নিজের দেশে নিয়ে যায়, অন্যদিকে মূল ট্রফিটি সর্বদা জুরিখের সদর দপ্তরে সুরক্ষিত থাকে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading