ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (Omkareshwar Jyotirlinga) মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অন্তর্গত খান্ডওয়া শহরের মান্ধাতায় অবস্থিত। মান্ধাতা হল নর্মদা নদীর বুকে অবস্থিত একটি দ্বীপ। বলা হয় যে, এই দ্বীপটির আকৃতি দেবনাগরী ‘ওঁ’ প্রতীকের মতো। এখানে কাছাকাছি দুটি শিবের মন্দির রয়েছে, যার একটি এই মান্ধাতা দ্বীপে অবস্থিত ওঁকারেশ্বর মন্দির এবং অন্যটি মূল ভূখন্ডে নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত অমরেশ্বর মন্দির। জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনে এসে ভক্তরা এই দুটি মন্দিরই দর্শন করে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দুই মন্দির দর্শন না করলে জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।
শিবপুরাণ অনুযায়ী একদা ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দুজনের তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। সেই বিবাদ সন্তোষজনক পরিণতিতে না পৌঁছে চলতেই থাকলে মহাদেব তখন একটি আলোকরশ্মির স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে প্রকট হন। ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু কেউই সেই আলোকস্তম্ভের আদি ও অন্ত খুঁজে পাননি। শেষমেশ তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই দিব্য জ্যোতিই শ্রেষ্ঠতম। এভাবেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধারণাটির উদ্ভব হয়।
ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গকে ঘিরে নানারকম কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। একটি কাহিনী অনুসারে দেবতা বিন্ধ্য পর্বত নিজের পাপস্খলনের জন্য একসময় শিবপূজা করেছিলেন। তিনি বালি ও মাটি দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করে উপাসনা করেছিলেন । সেই পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব দুটি রূপে অর্থাৎ ওঁকারেশ্বর এবং অমরেশ্বর রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অন্য একটি কাহিনী অনুসারে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা মান্ধাতা এইস্থানে শিবের উপাসনা করেছিলেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না শিব জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হচ্ছিলেন ততক্ষণ সেই উপাসনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। মতান্তরে মান্ধাতার পুত্র অম্বরিশ এবং মুচুকুন্দ এখানে কঠোর তপস্যা করে শিবকে খুশি করেছিলেন। মান্ধাতার নামের সঙ্গে এই মন্দিরের কাহিনী জড়িত বলে দ্বীপটির নাম হয়েছে মান্ধাতা। আরও একটি কাহিনী অনুসারে, একবার দেবতা এবং দানবদের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছিল এবং যুদ্ধে দানবদের কাছে দেবতারা পরাস্ত হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় পরাজিত দেবগণ শিবের কাছে প্রার্থনা জানালে শিব ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়ে দানবদের পরাস্ত করেছিলেন। দেবতাদের অনুরোধে ভগবান শিব লিঙ্গটিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন যা ওঁকারেশ্বর মন্দির এবং অমরেশ্বর মন্দিরে অবস্থিত।
মহারানি অহল্যাবাই এই ওঁকারেশ্বর মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। একসময় মালওয়ার পারমার শাসকদের অধীনস্থ আদিবাসী ভীল সর্দারদের দায়িত্বেই ছিল এই ওঁকারেশ্বর মন্দির। পরবর্তীকালে তা চৌহান রাজপুতদের হাতে চলে যায়। আরও পরে আঠারো শতকে মারাঠারা মন্দিরের দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং নানারকম সংস্কার-সহ অনেক নতুন মন্দিরও নির্মাণ করে। মুসলিম শাসনকালে এই মন্দিরের ওপর ব্যাপক আক্রমণ হয়েছিল। পূর্বে জ্যোতির্লিঙ্গটি একটি ছোট মন্দিরে ছিল, সেখান থেকে বর্তমান মন্দিরে আনা হয়েছে। এখানেই আদি শঙ্করাচার্য তাঁর গুরু গোবিন্দ ভগবতপাদের সঙ্গে একটি গুহায় দেখা করেছিলেন। শিবমন্দিরের ঠিক নীচে আজও সেই গুহাটি রয়েছে যেখানে শঙ্করাচার্যের একটি মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
এই মন্দির নাগারা স্থাপত্য শৈলীর চমৎকার একটি নিদর্শন। ওঁকারেশ্বরের এই মন্দিরটি পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি মন্দির। গোটা মন্দির জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৬০টি খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। সেই স্তম্ভগুলি অত্যন্ত সুন্দর বাদামি পাথর দিয়ে তৈরি এবং প্রত্যেকটি স্তম্ভ ১৪ ফুট উঁচু। প্রতিটি স্তম্ভে সূক্ষ্ম কারুকাজ লক্ষ করা যায়। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি বিশাল সভা মন্ডপ রয়েছে। পাঁচতলার প্রত্যেক তলায় আলাদা বিগ্রহ অধিষ্ঠান করছেন। একতলাতে ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন পাওয়া যাবে। এই বিগ্রহটি জলে নিমজ্জিত থাকে। জ্যোতির্লিঙ্গের ঠিক পিছনে দেবী পার্বতীর রূপোর তৈরি মূর্তি দেখা যায়। সামনের দিকে শিব ও পার্বতীর জন্য একটি বিছানা বিছিয়ে রাখা আছে। বলা হয় এই মন্দিরে ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতী বিশ্রাম করেন। তাই এই বিছানায় আয়োজন। এই মন্দিরের শয়ন আরতি দেখবার মত। দোতলায় রয়েছেন মহাকালেশ্বর এবং তিনতলা, চারতলা ও পাঁচতলাতে রয়েছেন যথাক্রমে সিদ্ধনাথ, গুপ্তেশ্বর এবং ধ্বজেশ্বর। উল্লেখ্য যে, মূল মন্দিরে প্রথমে পঞ্চমুখী গণেশের দর্শন লাভ করা যায়। এই মন্দির গণেশ চতুর্থীর দিন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বলা হয় এখানে ৩৩ কোটি দেবদেবীর অবস্থান।
ওঁকারেশ্বর মন্দিরে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ কিছু উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ফাল্গুন মাসে অনুষ্ঠিত মহাশিবরাত্রির সময় পুরো মান্ধাতা দ্বীপটি দীপালোকে সজ্জিত হয়ে ওঠে। অসংখ্য ভক্ত এসময় নর্মদা নদীতে স্নান সেরে মন্দিরে শিব পূজা করে থাকেন। এরপর আসে শ্রাবণ উদযাপনের কথা। এই গোটা মাসজুড়ে এখানে ভক্ত সমাগম হয়। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল কার্তিক পূর্ণিমা। এটি মূলত নভেম্বর মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয়। এটি মোট দশদিনের একটি উৎসব। বিশ্বাস করা হয় যে, এই কার্তিক পূর্ণিমায় ভগবান শিব আলোর রূপ ধারণ করেছিলেন। এই দিনে শিবের উপাসনা করলে মোক্ষলাভ হয় বলে ভক্তদের বিশ্বাস। এরপরই আসে মাঘ মাসে পালিত নর্মদা উৎসবের কথা। উৎসবটি সাধারণত মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমীতে নর্মদা জয়ন্তীতে উদযাপিত হয়ে থাকে। পুরো দ্বীপটিকে তখন প্রদীপ দিয়ে সাজানো হয় এবং সঙ্গে আতসবাজির প্রদর্শন হয়। এই উৎসবটির একটি অংশ হল পঞ্চকোশী যাত্রা। শুক্লপক্ষের একাদশীতে গোমুখ ঘাটে এই যাত্রা শুরু হয়।
বিশ্বাস করা হয়, এই মন্দির দর্শন না করলে তীর্থযাত্রীদের যাত্রা সম্পূর্ণ হয় না। বলা হয়ে থাকে যে, একটানা সাতদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নর্মদাতে স্নান করে এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করলে রোগ, দুঃখ, কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ভক্তদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব তাই অপরিসীম।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান