সববাংলায়

নাগার্জুন

প্রাচীন ভারত যে বিজ্ঞান সাধনার দিক থেকে প্রভূত উন্নতি করেছিল, তা সেই সময়কার বিজ্ঞানী এবং তাঁদের অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারগুলি থেকেই বুঝতে পারা যায়। সেই বিজ্ঞানের অন্যতম একটি শাখা রসায়নবিদ্যায় প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানীদের মধ্যে যাঁদের নাম মনে আসে তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলেন নাগার্জুন (Nagarjuna)। মূলত ধাতুবিদ্যার জন্য তাঁর স্বতন্ত্র একটি পরিচয় রয়েছে। অ্যালকেমির ধারণার প্রচলন এবং তার বাস্তবায়ন যে সেই প্রাচীন ভারতেই জন্ম নিয়েছিল নাগার্জুনের কর্মকাণ্ডই তার প্রমাণ। ধাতু থেকে সোনা নির্মাণের পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রসঙ্গে নাগার্জুনের কথাই প্রথমে উঠে আসে। অনেকে আবার এই নাগার্জুনকে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গেও সংযুক্ত করেছেন। তবে কেবল ধাতুবিদ্যা নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রেও কিন্তু নাগার্জুনের অবদান রয়েছে। সেই বিষয়ে কিছু গ্রন্থও রচনা করেছিলেন তিনি।

প্রথমত, বলতে হয়,যে, প্রাচীন ভারতে নাগার্জুন নামের একাধিক মানুষের অস্তিত্বের কারণে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক রকম সংশয় তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, বৌদ্ধ দর্শনের মধ্যমক ধারার প্রতিষ্ঠাতা এবং মহাযান আন্দোলনের একজন রক্ষক ছিলেন নাগার্জুন। আরও এক নাগার্জুনের কথা ইতিহাসবিদেরা বলে থাকেন যিনি আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন এবং রসায়নবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। কেউ কেউ আবার এই দুজনকে একই ব্যক্তি বলে থাকেন। কারণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জুয়ানজাং এবং বৌদ্ধ পন্ডিত তারানাথের লেখা থেকে জানা যায় নাগার্জুন ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতেন। এই বিদ্যাই অ্যালকেমি নামে পরিচিত, যা রসায়নবিদ নাগার্জুনের প্রসঙ্গেই আলোচিত হয়ে থাকে। এমনকি কুমারজীবের জীবনীতেও অমরত্ব নিয়ে নাগার্জুনের পরীক্ষানিরীক্ষার কথা রয়েছে। এছাড়াও একজন নাগার্জুন নামে একজন তান্ত্রিক বৌদ্ধ লেখকের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে, এমনকি নাগার্জুন নামে একজন জৈন ব্যক্তির কথাও জানা যায়, যিনি কিনা হিমালয় ভ্রমণ করেছিলেন।

তবে এখানে রসায়নবিদ হিসেবে পরিচিত যে নাগার্জুন তাঁরই কর্মকান্ড আমাদের আলোচ্য বিষয়।

অনেকে বৌদ্ধ দার্শনিক এবং রসায়নবিদ নাগার্জুন একই ব্যক্তি বলে মনে করলেও এই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায়নি এখনও।

একাদশ শতাব্দীর ইরানী ঐতিহাসিক আলবিরুনির মতে, মহারাষ্ট্রে নাগার্জুনের জন্ম হয়৷ কেউ বলেন, মধ্যপ্রদেশের মহাকোশল এলাকার শ্রীপুর শহরে নাগার্জুনের জন্ম হয়েছিল। অন্য সূত্র অনুসারে, গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের নিকটবর্তী দৈহাক দুর্গে নাগার্জুনের জন্ম হয়েছিল। চীনা এবং তিব্বতি সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, বিদর্ভে রসায়নবিদ নাগার্জুনের জন্ম হয় এবং পরবর্তীতে তিনি সাতবাহন রাজবংশেে চলে যান। জনশ্রুতি অনুসারে নাগার্জুন পূর্বে নাকি জৈন ছিলেন। পরে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে তিনি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাগলওয়াড়ি গ্রামে নাগার্জুনের পরীক্ষামূলক গবেষণাগারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেকের মতে প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে কোনও এক সময়ে নাগার্জুন জীবিত ছিলেন। আবার দশম শতাব্দীতে রসায়নবিদ নাগার্জুনের অস্তিত্ব ছিল বলে মনে করা হয়। তবে প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দী বা নবম-দশম শতাব্দীর আশেপাশে নাগার্জুন জীবিত ছিলেন, এই দুটি মতামতই সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। অনেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর বৌদ্ধ দার্শনিক এবং দশম শতাব্দীর রসায়নবিদ নাগার্জুন যে আলাদা সময়ের দুই ভিন্ন ব্যক্তি তা জোরালোভাবেই ঘোষণা করেন। অনেকের বিশ্বাস, পরবর্তীকালে মুসলিম অনুপ্রবেশের ফলে, সেই বহিরাগতদের হাতে নাগার্জুনের অনেক রচনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

কথিত আছে একজন ব্রাহ্মণের কাছ থেকে লোহাকে সোনায় রূপান্তরিত করবার অলৌকিক ক্ষমতা রপ্ত করেছিলেন তিনি। এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই নাকি এক দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নালন্দার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের খাওয়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর অসামান্য জ্ঞান এবং প্রতিভার জন্য নাকি তিনি পরবর্তীকালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। জানা যায়, নিয়ম শৃঙ্খলা যথাযথভাবে পালন না করবার জন্য আট হাজার ভিক্ষুককে বহিষ্কার করেছিলেন তিনি। তবে দ্বন্দ্ব আরও জটিলতর রূপ নেয়। ভিক্ষুকদের বহিষ্কারকারী নাগার্জুন এবং ব্রাহ্মণের কাছে সোনা তৈরির পদ্ধতি শিখে দুর্ভিক্ষের সময় নালন্দার বৌদ্ধ সন্ন্যসীদের বাঁচানো নাগার্জুন একই ব্যক্তি কিনা সংশয় তা নিয়েই। দুজনে একই ব্যক্তি হলে বলতে হয়, নাগার্জুন একজন বৌদ্ধ দার্শনিক ও রসায়নবিদ ছিলেন, তবে অনেকেই এই দুজনকে একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখতে নারাজ।

নাগার্জুন মূলত ছিলেন একজন ধাতুবিদ। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে, যথা ঋগ্বেদেও ধাতুর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও যজুর্বেদ, শতপথ ব্রাহ্মণেও ধাতুর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতে পারদ নামক ধাতুটি ‘রস’ নামে পরিচিত ছিল। এই পারদ ধাতুটিকে অবলম্বন করেই অধিকাংশ গবেষণা করেছিলেন নাগার্জুন। এই রস থেকেই রসায়ন শব্দটির উৎপত্তি। নাগার্জুনের ধাতুবিদ্যা-সংক্রান্ত বিখ্যাত গ্রন্থটি হল ‘রসরত্নাকর’। অ্যালকেমি সম্পর্কিত প্রাচীনতম গ্রন্থগুলির মধ্যে এটি একটি। নাগার্জুন আকরিক থেকে সোনা, রূপা, তামা, টিনের মতো ধাতু নিষ্কাশন এবং তাদের পরিশোধন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন ও তার যথাযথ বর্ণনাও করে গিয়েছিলেন। নাগার্জুন তাঁর গবেষণাগারে ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করবার রসায়ন আবিষ্কার করেছিলেন। তবে এটি প্রকৃত সোনা ছিল না, বরং সোনার মতো উজ্জ্বল কোন পদার্থ ছিল। আজ সোনার ইমিটেশন গহনা প্রস্তুতের জন্য যে চকচকে সোনার মতো দেখতে উপাদান ব্যবহার করি, আসলে তা নাগার্জুনেরই দান। নাগার্জুনই ধাতুবিদ্যার ক্ষেত্রে পাতন এবং ভস্মীকরণ পদ্ধতির প্রবর্তক ছিলেন। বিশুদ্ধ পারদ পুনরুদ্ধার করবার প্রক্রিয়াও বিশদে বর্ণনা করে গিয়েছিলেন নাগার্জুন। রসায়ন বিষয়ক নাগার্জুনের আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘রসেন্দ্রমঙ্গল’।

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও কিন্তু নাগার্জুন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি আয়ুর্বেদ রসায়নও চর্চা করতেন। বেশ কিছু ঔষধ নির্মাণ বিষয়েও গবেষণা করেছিলেন তিনি। ‘আরোগ্যমঞ্জরী’ এবং ‘যোগসার’-এর মতো উৎকৃষ্ট চিকিৎসাগ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন নাগার্জুন। এক্ষেত্রেও পারদ নিয়ে গবেষণা করে তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন যা মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তিনি পারদ এবং সালফারের (গন্ধক) মিশ্রণে রসসিন্দুর নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন। এই রসসিন্দুর বহু রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে থাকে।  নাগার্জুনের আরও কয়েকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘যোগরত্নমালা’, ‘জীবসূত্র’, ‘যোগশতক’, ‘রসবৈশেষিকসূত্র’, ‘কক্ষপুটতন্ত্র’, ‘যোগাষ্টক’ ইত্যাদি।

নাগার্জুনের রসায়ন গবেষণাগারটি রসশালা নামে পরিচিত ছিল। তিনি তাঁর গবেষণাগারে দোল যন্ত্র, সুইদানী যন্ত্র, পাটন যন্ত্র, অধপদান যন্ত্র, ঢেকি যন্ত্র, বালুক যন্ত্র, তির্যক পাটন যন্ত্র, বিদ্যাধর যন্ত্র, ধূপ যন্ত্র, কোষ্ঠী যন্ত্র, কচ্ছপ যন্ত্র, ডমরু যন্ত্রের মতো ৩২টিরও বেশি যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

রসায়নে নাগার্জুনের অবদান আগামী প্রজন্মের কাছে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading