বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে সেখানে গ্রীক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অবদান লক্ষ করা যাবে। এই গ্রীক সাহিত্যের কথা উঠলেই বিখ্যাত নাট্যকারদের পাশাপাশি যাঁর নাম নিশ্চিতভাবেই উঠে আসে তিনি হলেন কিংবদন্তি গ্রীক কবি হোমার (Homer)। ঐতিহাসিকদের মতে হোমার ছিলেন একজন অন্ধ কবি। তাঁর যে দুটি মহাকাব্যের জন্য সারা বিশ্বের কাছে তিনি পরিচিত, সেগুলি হল ইলিয়াড ও ওডিসি। ধ্রুপদী গ্রীক সাহিত্যের সন্ধান পেতে হলে হোমারের কাব্য এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তাঁর মহাকাব্যে যুদ্ধ, বীরত্ব, গৌরবের কথা দারুণভাবে প্রতিফলিত। সিরিয়াস ট্র্যাজেডি তাঁর রচনার প্রধান উপকরণ হলেও হোমরিক কাব্যে কিন্তু কমেডিরও অভাব নেই। বিখ্যাত কবি ভার্জিল হোমারকে ‘কবি সার্বভৌম’ (Poet Sovereign) বা সব কবিদের রাজা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মহাকাব্য প্রাচীন গ্রীক সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রতিবিম্বস্বরূপ। হোমারের মহাকাব্য সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বহু সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকে অনুপ্রাণিত করেছে।
কিংবদন্তি গ্রীক কবি হোমারের জীবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্যের অভাব রয়েছে। হোমারের জীবন সম্পর্কে জানা যায় এমন প্রাচীনতম দুটি গ্রন্থ হল লাইফ অব হোমার এবং কন্টেস্ট অব হোমার অ্যান্ড হেসিওড। হোমারের জন্ম সাল নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তবে তাঁর লেখার ভাষা এবং শৈলী বিচার করে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, হোমার খ্রীস্টপূর্ব অষ্টম বা নবম শতাব্দীর কোন এক সময়ে জীবিত ছিলেন। হোমারের জন্মস্থান নিয়েও বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। সাতটি ভিন্ন ভিন্ন শহরকে তাঁর জন্মস্থান বলে দাবি করা হয়েছিল। যদিও মনে করা হয় হোমার হয়তো, এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলের চিওস দ্বীপের মানুষ ছিলেন। সেখানে এমন একটি পরিবার বসবাস করতেন যাঁরা হোমারকেই তাঁদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করতেন। যদিও নিশ্চিতভাবে এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে নিঃসংশয় হওয়া যায় না। এছাড়াও ইথাকা, রোডস, আর্গোস, স্মির্না, এথেন্স, কোলোফোন এবং সালামিসের মতো স্থানকেও হোমারের জন্মস্থান বলে মনে করা হয়েছে। তবে হোমার যে পূর্ব গ্রীস বা এশিয়া মাইনরের মানুষ ছিলেন তা তাঁর রচনায় এশিয়ান গ্রীকদের উপভাষার ব্যবহার দেখে বোঝা যায়।
হোমারের মা হিসেবে যে মহিলার নাম উঠে আসে তিনি হলেন ক্রিথিস। সিউডো-হেরোডোটাসের ‘লাইফ অব হোমার’ অনুযায়ী, সেই ক্রিথিস এক অপরিচিতের সন্তান গর্ভে ধারণ করেন এবং মেলস নদীর তীরে একটি পুত্রের জন্ম দেন এবং নাম রাখেন মেলেসিজেনেস। পরবর্তীকালে ক্রিথিস ফেমিয়াস নামে একজনকে বিবাহ করেন এবং ফেমিয়াম মেলেসিজেনেসকে গ্রহণ করে নেন। এই মেলেসিজেনেসই যৌবনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন এবং তার ফলে চলাফেরার জন্য তাঁর একজন গাইড বা আইওনিয়ান উপভাষায় বলতে গেলে হোমরিউন্টেসের প্রয়োজন ছিল। সেখান থেকেই তিনি হোমার নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত ক্রিথিসকে একটি নিম্ফ বলেও মনে করা হয়েছে। নিম্ফ অর্থাৎ এমন একশ্রেণীর প্রাচীন গ্রীক নারী যাঁদের সঙ্গে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং যাঁরা দেবীদের মতো অমরও হতেন।
আবার রোমান সম্রাট হ্যাড্রিয়ানের আমলের আরেকটি কাহিনি অনুযায়ী, হোমার ছিলেন টেলিমাকাস (ওডিসিয়াসের পুত্র) এবং এপিকাস্টের (নেস্টরের কন্যা) সন্তান। আবার অন্য এক সূত্রানুযায়ী হোমারের মা ছিলেন নদী-দেবতা মেলেসের কন্যা এবং পিতা ছিলেন মায়ন।
হোমারের জীবনের প্রাথমিক তথ্যগুলি নিয়েই শুধু নয়, হোমারের অস্তিত্ব, ইলিয়াড-ওডিসির রচনাকার হোমার নামের কোন একজন ব্যক্তি কিনা, এইসব নিয়েও প্রচুর সংশয় তৈরি হয়েছিল। খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী নাগাদ হোমারকে কেন্দ্র করে ওঠা প্রশ্ন বা হোমরিক প্রশ্ন প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল। তৎকালীন ব্যকরণবিদদের মধ্যে কয়েকজন দাবি করেছিলেন যে, ইলিয়াড ও ওডিসি দুজন ভিন্ন ব্যক্তির রচনা। পরবর্তীকালে বেশ কিছু ইউরোপীয় সমালোচকও এই মতকে সমর্থন করেছিলেন। আবার উনবিংশ শতাব্দীতে একটি তত্ত্বের অবতারণা হল, যেটি অনুযায়ী, হোমার নামের কোন ব্যক্তির অস্তিত্বই ছিল না কোনদিন। উক্ত দুই মহাকাব্য আসলে কিছু বেনামী চারণকবির সমষ্টিগত সৃষ্টি। পরে হোমার নামটি তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই তত্ত্ব প্রদানকারী গবেষকেরা বলেন যে, দুটি কাব্যই ক্রমাগত সংশোধিত হতে হতে এগিয়েছে এবং যখনই তা আবৃত্তি করা হয়েছে তখনই তাতে নতুন কিছু যুক্ত করা হয়েছে। খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত এই কাব্যদুটি বর্তমান রূপ পায়নি। খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতেই এথেন্সে মৌখিকভাবে প্রচলিত সেই কাব্য প্রথম লিখিত হয়েছিল।
ইলিয়াড ও ওডিসির শৈলী এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সামঞ্জস্যের কারণে অনেকেই এই দুটি কাব্যকে একজন লেখকেরই রচনা বলে মনে করেছেন। কেউ কেউ অবশ্য শৈলীর মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁরা ইলিয়াডের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন এক নাট্যশৈলী এবং ওডিসিতে পেয়েছিলেন উপন্যাসের শৈলী। এছাড়াও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণের তফাত থেকেও মহাকাব্যদুটির রচয়িতা রচয়িতা অভিন্ন কিনা সেই সংশয় দৃঢ় হয়ে ওঠে। এই দুটি রচনায় বিভিন্ন সময়ের উল্লেখ থেকে অনুমান করা যায় কাব্যের কিছু অংশ গ্রীক ইতিহাসের অন্য একটি সময়ে লেখা হয়েছিল, ফলত সন্দেহ আরও গভীর হয়।
তবে এইসব দ্বন্দ্ব, সন্দেহের উর্ধ্বে উঠে কাব্যদুটির বিষয়গত ঐক্য, কাঠামোগত জটিলতা, দুর্দান্ত রচনাভঙ্গী লেখকের অতুলনীয় প্রতিভার ইঙ্গিত দেয়। ‘বেউলফ’ নামের ইংরেজি মহাকাব্যের মতো ইলিয়াড ও ওডিসিও মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল এবং তা প্রতিভাবান একক কোন ব্যক্তি দ্বারা লিপিবদ্ধ হয়েছিল, এমনটা হতেই পারে। হতে পারে হোমার নামে একজন কবিই এই মহাকাব্যদুটির রচয়িতা বা হয়ত পূর্ববর্তী সেই চারণকবিদের থেকে এই কবি উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। অবশ্য এমনও হতে পারে হোমারের সৃষ্ট মহাকাব্য চারণকবিরা মুখে মুখে আবৃত্তি করে বেড়াতেন বা অন্ধ কবি হোমার নিজেই তা করতেন। অনেক পন্ডিত মনে করতেন যে, হোমার শব্দটি আসলে সাধারণভাবে সেইসব অন্ধ পুরুষের বোঝাতে ব্যবহার করা হত, যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মহাকাব্য আবৃত্তি করে বেড়াতেন।
বিভিন্ন পন্ডিত ও গবেষকরা হোমারকে নিয়ে এমনই নানারকম তত্ত্বের অবতারণা করেছেন।
হোমারকে গ্রীক সাহিত্যে মহাকাব্য হিসেবে পরিচিত ফর্মটির স্রষ্টা বলে মনে করা হয়। হোমার যে যুগে বসবাস করতেন, তাঁর মহাকাব্যের সময়কাল কিন্তু তারও আগের ব্রোঞ্জ যুগ বা মাইসেনিয়ান যুগ। এমন একটি যুগের কথা তিনি লিখেছেন যার লিখিত কোন বিবরণ নেই। তাঁর মহাকাব্য থেকেই পূর্ববর্তী জীবনযাপন এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে জানা যায়। ইলিয়াড মহাকাব্যটি ২৪টি ভাগে বিভক্ত। এই বিশাল মহাকাব্যে ট্রয় শহরে ট্রোজান যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ট্রয় শহরের আরও একটি নাম ইলিয়াম থেকে এই কাব্যের নামকরণ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। কীভাবে আচিয়ানরা ট্রয় অবরোধ করে ট্রোজানদের সঙ্গে দশ বছর যুদ্ধ করেছিলেন, ইলিয়াড সেই যুদ্ধেরই কাহিনি। উভয়পক্ষের দুই নায়ক অ্যাকিলিস এবং হেক্টরের গল্প রয়েছে এই কাব্যে।
এই ট্রোজান যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর থেকেই মূলত ওডিসি মহাকাব্যের সূত্রপাত হয়। এই কাব্যটিও ইলিয়াডের মতোই ২৪টি ভাগে বিভক্ত। এই কাব্যে যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাই প্রধান কাহিনি। যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া ওডিসিয়াসের গল্প এই কাব্যের প্রধান উপজীব্য। যুদ্ধ থেকে ওডিসিয়াস বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য সমুদ্রযাত্রা শুরু করে এবং তারপর ক্রমাগত জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে সেই সফরের কাহিনি।
ইলিয়াড এবং ওডিসি ছাড়াও আরও বেশকিছু কবিতা যা হোমরিক হাইমস বা শ্লোক নামেও পরিচিত, হোমারকে সেগুলিরও রচয়িতা হিসেবে মনে করেন কেউ কেউ।
হোমার কেবল প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেননি আগামী প্রজন্মের লেখকদেরও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। পরবর্তীযুগের কিংবদন্তি কবি ভার্জিল তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘দ্য ইনিয়াড’ রচনার সময়তে হোমারের মহাকাব্য থেকে কিছু উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। ভার্জিল তাঁর মহাকাব্যে দেখিয়েছিলেন এনিয়াস কীভাবে ট্রয় থেকে পালিয়ে এসে রোম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যের জন্য বিখ্যাত দান্তেও হোমারকে সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এইভাবে হোমারের কাব্য আরও পরবর্তীকালের সাহিত্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
হোমারের জন্ম ও মৃত্যুর সময় নিয়ে সংশয় রয়েছে বলেই আপাতভাবে ইলিয়াড ও ওডিসি মহাকাব্যের আনুমানিক রচনাকালকেই অর্থাৎ অষ্টম বা নবম খ্রীস্টপূর্বাব্দকেই হোমারের সময়কাল বলে মনে করা হয়। গ্রীক সভ্যতা ও শিক্ষাব্যবস্থায় হোমারের সাহিত্যকীর্তির প্রভাব অপরিসীম।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান