বাংলার ইতিহাসের অনেকখানি জড়িয়ে আছে বাংলার বুকে ইতস্তত দাঁড়িয়ে থাকা মন্দির-মসজিদ-গির্জাগুলির সঙ্গে। প্রাচীন সেইসব স্থাপত্যের নেপথ্যকাহিনী শুনলে আজও বিস্ময় জাগে। কলকাতার নিকটেই হুগলি জেলার ব্যান্ডেল অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত ব্যান্ডেল চার্চটির (Bandel Church) সঙ্গেও তেমনই বিস্ময়কর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এই চার্চটির নাম আসলে দ্য ব্যাসিলিকা অব দ্য হোলি রোজারি (The Basilica of the Holy Rosary) তবে জনমানুষের নিকট এটি ব্যান্ডেল চার্চ নামেই অধিক পরিচিত৷ বাংলায় পর্তুগীজদের বসতি স্থাপনের একটি স্মারকস্বরূপ যেন এই চার্চ। প্রথম যে কাঠামোটি নির্মিত হয়েছিল সেটি ধ্বংসের পর আবার একটি কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল এবং সেটিই আজ পর্যন্ত বজায় রয়েছে। মুঘল সম্রাট শাহজানের নামও এই চার্চের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। বর্তমানে ব্যান্ডেল চার্চ একটি জনপ্রিয় ভ্রমণস্থলে পরিণত হয়েছে।
১৪৯৮ সালে ভাস্কো-দা-গামার ভারতে আসাই ছিল প্রথম কোন পর্তুগিজ মানুষের ভারতে পদার্পণ। পর্তুগিজদের আচরণ ছিল বর্বরদের মতো। স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যবসার সময় তারা মূলত শক্তি এবং বলের ব্যবহার করত। ১৫৩৫ সালে প্রথমবার বাংলায় পর্তুগিজদের আগমন ঘটে। তারা বাংলার সুলতান মাহমুদ শাহ-এর কাছ থেকে চট্টগ্রাম এবং সাতগাঁওতে শুল্ক আদায়ের অধিকার লাভ করে। এরপর তারা সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তগ্রামে বা সাতগাঁও-এর বন্দর থেকে তাদের বাণিজ্য করতে শুরু করে। সাতগাঁওয়ের কাছাকাছি একটি বসতি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে তারা। সেই কারণেই হুগলির উত্তরে ব্যান্ডেলকে বেছে নেয় তারা। ব্যবসায়ীরা সাতগাঁও যাওয়ার পথে এই ব্যান্ডেলেই বিশ্রাম নিতেন। ১৫৭৫ সালে, মতান্তরে ১৫৭১ বা তার কাছাকাছি সময়ে সম্রাট আকবরের থেকে হুগলিতে বসতি স্থাপনের অনুমতি লাভ করে পর্তুগিজরা। অন্যদিকে সরস্বতী নদীতে পলি পড়ে সপ্তগ্রামের ব্যবসা ধীরে ধীরে পড়ে যেতে থাকলে হুগলি তাদের নতুন ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৫৭৯ সাল নাগাদ হুগলিতে তারা বন্দর তৈরি করেছিল। ফোর্ট উগোলিম নামে একটি দুর্গও তৈরি করে তারা এবং গোয়ার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংস্থা অগাস্টিয়ান ফ্রিয়ারদের তালিকাভুক্ত করে। পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের কিছু ধর্মযাজকও এখানে এসেছিলেন। বহু স্থানীয় মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কাজেও তাঁরা সফল হয়েছিলেন। জনসাধারণের মধ্যে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচারের জন্য ক্যাপ্টেন পেড্রো টাভারেস সম্রাটের থেকেও অনুমোদন লাভ করেছিল। দেখতে দেখতে হুগলিতে ক্যাথলিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজারেরও বেশি। সেই কারণেই ১৫৯৯ সালে এই ব্যান্ডেলে একটি গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল, যা বেসিলিকা অব দ্য হোলি রোজারি নামে পরিচিত এবং বর্তমানে ব্যান্ডেল চার্চ হিসেবে জনপ্রিয়।
বাংলার প্রাচীনতম চার্চগুলির মধ্যে অন্যতম এই ব্যান্ডেল চার্চ বাংলায় পর্তুগিজদের বসতি স্থাপনের অন্যতম একটি স্মারক চিহ্ন হিসেবে আজও বিরাজমান। গোয়া থেকে পাঁচজন পর্তুগিজ ধর্মযাজক ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তারের জন্য এখানে আসেন এবং সেই কাজে ক্রমশই সফলতা লাভ করতে থাকেন। এই ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এবং অবশ্যই পর্তুগিজ বসতিতে তাদের উপাসনার জন্য প্রয়োজনীয় চার্চের অভাব মেটাতেও সেইসব ধর্মযাজকদের সহায়তায় ১৫৯৯ সালে ব্যান্ডেল চার্চ তৈরি হয়েছিল।
তবে ষোড়শ শতাব্দির শেষদিকে পর্তুগিজরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হিংস্র হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষকে লুঠ করার পাশাপাশি নারী এবং শিশুদের দাস হিসেবে বিক্রয় করার ঘৃণ্য কাজকর্মও শুরু করে। এই খবর তৎকালীন মুঘল সম্রাট শাহজানের কর্ণগোচর হলে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং হুগলির বন্দরে আক্রমণের নির্দেশ দেন। ১৬৩২ সালে শাহজাহানের সেনাপতি কাসিম খানের নেতৃত্বে এই আক্রমণ সংঘটিত হয়। মুঘল সৈন্যের এই আক্রমণে হুগলি তথা এই ব্যান্ডেল লন্ডভন্ড হয়ে যায়, সেই সৈন্যদল গির্জাটিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এটি ধ্বংস করে। মাদার মেরীর মূর্তি তারা নদীর জলে ডুবিয়ে দিয়েছিল। যদিও টিয়াগো নামের একজন অনুসারী মাদার মেরীর মূর্তিটি বাঁচানোর চেষ্টা করেও নাকি ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে এইখানে আরও একটি গল্প রয়েছে, যার সত্যতা নিয়ে রয়েছে সংশয়। একদিন রাতে নাকি ফাদার ডি ক্রুজ শুনতে পেয়েছিলেন টিয়াগো তাঁকে নদী থেকে ডেকে বলছে যে, ‘আওয়ার লেডী’ (মেরী) ফিরে এসেছেন। এমনকি টিয়াগো এও বলেন, তিনি খ্রিস্টানদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ফাদার প্রথমে এটিকে স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিলেও পরের দিন সকালে চার্চের দোরগোড়ায় মেরী বা ‘আওয়ার লেডী অব হ্যাপি ওয়ায়েজ’-এর মূর্তি দেখতে পান। স্থানীয় জেলেরা মূর্তিটি নদীতে পেয়ে গির্জায় ফিরিয়ে এনেছিল। অন্য মতানুসারে টিয়াগো নাকি মাতা মেরীর মূর্তিটি নিয়ে হুগলি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। পরে যখন সেই মূর্তি পাওয়া যায় তখন তার নামকরণ করা হয় ‘আওয়ার লেডি অব দ্য হ্যাপি ওয়ায়েজ’।
যাই হোক, গোয়া থেকে আসা সেই পাঁচজন যাজকের মধ্যে চারজনকে মুঘলরা হত্যা করে এবং পঞ্চম যাজক জোয়ান দ্য ক্রুজ ও তাঁর অনুসারীদের বন্দী করে আগ্রায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সেই একমাত্র জীবিত যাজক জোয়ান দ্য ক্রুজকে শাহজাহানের সভায় বিচারের জন্য হাজির করা হয়। সম্রাট তাঁকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন এবং হাতির পায়ের নীচে তাঁকে পিষ্ট করে মারার নির্দেশ দেন। তবে হাতি যাজকের কাছে গিয়ে তাঁকে পায়ে পিষ্ট করার বদলে শুঁড় দিয়ে পিঠে তুলে নিয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে সম্রাট মোহিত হয়ে যান এবং যাজকের অপরাধ মার্জনা তো করেনই, সেইসঙ্গে গির্জাটি নতুনভাবে নির্মাণ করবার জন্য অর্থ ছাড়াও ৩১১ একর জমিও দান করেন। ১৬৬০ সালে গোমেজ দে সোটো চার্চের বর্তমান কাঠামোটি নির্মাণ করেছিলেন।
বাংলার অনেক চার্চের তুলনায় আকারে এটি ছোট হলেও এই ব্যান্ডেল চার্চের মধ্যে অনেক এমন জিনিস আছে যেগুলি দেখার জন্য পর্যটকেরা ভিড় করেন। তাছাড়াও ১৬৬০ সালে নির্মিত একটি চার্চ প্রাচীন স্থাপত্যেরও নিদর্শনস্বরূপ। এই গির্জার দরজা বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশ করেই মূল চার্চের সামনে একটি উঠোনের মতো জায়গা চোখে পড়বে, যেটি দেখতে ঠিক গুহার মতো। এটির কেন্দ্রে আবার রয়েছে একটি ফোয়ারা। এখানেই মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রভু যিশু ও মাতা মেরীর কাছে ভক্তেরা প্রার্থনা করেন। ঝর্ণার জলে অনেকে কয়েন ফেলে দিয়েও প্রার্থনা করেন। চার্চে লর্ডসের গুহাগুলিরও একটি প্রতিকৃতি রয়েছে, মনে করা হয় সেখানেই মাতা মেরীর জন্ম হয়েছিল। এখান থেকে কয়েকটি সিঁড়ি পেরিয়ে মূল গির্জার দিকে যেতে হবে। গির্জাটি ডোরিক-শৈলীতে নির্মিত হয়েছে। ১৯৯০ সালে গির্জাটির একটু সংস্কার করা হয়। মার্বেল এবং গ্রানাইট দিয়ে এই গির্জাটি আবৃত ছিল। গির্জার দেওয়ালে বেশ কিছু ম্যুরাল চোখে পড়বে। এছাড়াও যিশুর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু পেইন্টিং গির্জায় দেখা যাবে। বিখ্যাত ‘দ্য লাস্ট সাপার’ পেইন্টিংটিও চোখে পড়বে এখানে। চার্চে প্রবেশ করলে বিশাল এবং বিস্ময়কর একটি ঝাড়বাতি প্রথমেই নজর কেড়ে নেবে। এছাড়াও রঙিন কাচের জানালাগুলিও গির্জাটির শোভা বাড়িয়েছে। এছাড়াও ব্যান্ডেল চার্চের গ্র্যান্ড টাওয়ার ঘড়িটি তো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মৃত যিশুর দেহকে কোলে নিয়ে মাতা মেরীর বসে থাকার মার্বেল-মূর্তি, যেটিকে ‘মাদার অব সরোস’ বলা হয়, সেটি এই গির্জার অন্যতম একটি আকর্ষণ। গির্জার আরেকটি আকর্ষণ হল একটি বিরাট কাচের আধারে বন্দী পর্তুগিজ জাহাজের মাস্তুল। এরসঙ্গেও রয়েছে একটি গল্প। ‘আওয়ার লেডী’র মূর্তি ফিরে পাওয়ার আনন্দে সবাই যখন উদযাপনে রত তখন একটি পর্তুগিজ নাবিকদের জাহাজ ক্ষতবিক্ষত পাল এবং ক্লান্ত নাবিকদের নিয়ে ব্যান্ডেল বন্দরে উপস্থিত হয়েছিল। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন জানায়, কয়েকদিন আগে বঙ্গোপসাগরে তাদের জাহাজ এক প্রচন্ড ঝড়ের কবলে পড়েছিল এবং প্রায় জাহাজডুবির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে জানান যদি জাহাজ এবং তারা বেঁচে যায় তবে তাদের পথে প্রথম যে চার্চটি পড়বে সেখানে তারা জাহাজের মাস্তুলটি দান করবেন। সেই মাস্তুল আজ রয়েছে ব্যান্ডেল চার্চে। ব্যান্ডেল চার্চের মধ্যে আবার কিছু সমাধিও রয়েছে এবং ভিতরে রয়েছে সুদৃশ্য একটি বাগান।
বছরের বিভিন্ন সময়ে, বলতে গেলে সারা বছরই ব্যান্ডেল চার্চে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। তবে ২৫ ডিসেম্বর অর্থাৎ বড়দিনে, যে-দিনটিতে প্রভু যিশুর জন্ম হয়েছিল, সেদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ভিড় জমান। আলোর মালায় সেজে ওঠে ব্যান্ডেল চার্চ। মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রভু যিশুর কাছে প্রার্থনা জানান অগণিত ভক্ত। কেবল এদেশীয়রাই নয়, অনেক বিদেশী পর্যটকও এসময় এই ব্যান্ডেল চার্চের আনন্দ উদযাপনে সামিল হন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান