সববাংলায়

মুরুগুমা ভ্রমণ 

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্য একেকরকম। পাহাড়, জঙ্গল, নদী, রুক্ষতা—সবই এই বাংলার নানাদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। তেমনই একটি জায়গা হল মুরুগুমা। অযোধ্যা পাহাড় থেকে কিছু দূরে মুরুগুমা বাঁধের জন্য এই জায়গাটি জনপ্রিয়। কংসাবতী নদীর একটি উপনদী এখানে দেখা যায়, সেইসঙ্গে অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তীর্ণ একটি অংশও চোখে পড়ে। এমনই স্নিগ্ধ এক প্রকৃতির সান্নিধ্যে দুদন্ড অবসর যাপনের জন্য একবার অন্তত ঘুরে আসতে হবে মুরুগুমায়।

মুরুগুমা কোথায়

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার ঝালদা ব্লকের অন্তর্গত বেগুনকোদরের উত্তরদিকে মুরুগুমা অবস্থিত। অযোধ্যা পাহাড় থেকে মুরগুমার দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার এবং পুরুলিয়া শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে মুরুগুমা প্রায় ২৯০ কিলোমিটার দূরে, জলপাইগুড়ি থেকে মুরুগুমা প্রায় ৫৩৬ কিলোমিটার দূরে এবং বর্ধমান থেকে মুরুগুমা প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এছাড়াও বাঁকুড়া থেকে মুরুগুমার দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার এবং আসানসোল থেকে প্রায় ১৩৪ কিলোমিটার। কংসাবতীর নদীর একটি উপনদী সাহারাঝোরের তীরে মুরুগুমা অবস্থিত।

মুরুগুমার ইতিহাস

মুরুগুমার বিখ্যাত বাঁধটি কংসাবতী বা কাঁসাই নদীর উপনদীর উপর গড়ে উঠেছে। কাঁসাই নদী অত্যন্ত প্রাচীন এক নদী, যার পূর্বে নাম ছিল কপিশা। এই নদী এককালে বঙ্গ ও উৎকলের মধ্যে সীমানা নির্দেশের কাজ করত। কালিদাসের রচনাতেও এই কপিশার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই নদীর মতোই মুরুগুমাও অত্যন্ত প্রাচীন এক জায়গা। এখানে মূলত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বসবাস। এলাকাটি একসময় মাওবাদী বিদ্রোহ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এখানকার এই বাঁধটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এবং শুষ্ক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছোট সেচ প্রকল্পের অংশ। মুরুগুমাকে ছোটনাগপুর মালভূমির পূর্ব অংশের একটি সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

মুরুগুমা কীভাবে যাবেন

ট্রেনে করে মুরুগুমা যেতে হলে পুরুলিয়া জংশন স্টেশনে নেমে সেখান থেকে পুরুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে বাসে করে কিংবা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যাবে মুরুগুমা। এছাড়াও পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে মুরুগুমার নিকটবর্তী স্টেশন ঝালদাতে গিয়ে সেখান থেকেও মুরুগুমা চলে যাওয়া যায় সহজেই। যদি বাসে করে যেতে হয় তবে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকেই পুরুলিয়ার অনেক বাস পাওয়া যাবে। তারপর পুরুলিয়া থেকে গাড়ি বা বাসে চলে যাওয়া যাবে মুরুগুমা। যদি প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হয় তবে, বেশ কয়েকটি রাস্তা রয়েছে। তবে মুরুগুমা যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাস্তা হল দুর্গাপুর, বাঁকুড়া হয়ে, পুরুলিয়ার ডিএম বাংলো মোড় থেকে টামনা মোড়, বেগুনকোদরের ওপর দিয়ে মুরুগুমা যাওয়ার রাস্তা। এছাড়াও আরও দুটি বিকল্প রয়েছে। দুর্গাপুর, বাঁকুড়া হয়ে পুরুলিয়ার ডিএম বাংলো মোড় থেকে রাঁচী রোড ধরে ঝালদার দিক দিয়ে বেগুনকোদর হয়ে মুরুগুমা ঢোকা যায়৷ এছাড়াও আসানসোল, দিশেরগড়, রঘুনাথপুর হয়ে পুরুলিয়া ঢুকে সেখান থেকে টামনা মোড়, বেগুনকোদর হয়ে মুরুগুমা যাওয়া যায়।

মুরুগুমাতে কোথায় থাকবেন

মুরুগুমা একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এখানে থাকবারও অনেক ব্যবস্থা হয়েছে। বেশ কিছু হোটেল রয়েছে এখানে, এছাড়াও রয়েছে ইকো ট্যুরিজম অর্থাৎ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকবার সুযোগও। সেক্ষেত্রে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধকে আরও কাছ থেকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা যেতে পারে। হোটেল, রিসর্ট কিংবা ইকো ট্যুরিজম ছাড়াও এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু হোমস্টে গড়ে উঠেছে, যেগুলিতে আরামদায়ক থাকবার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীও হাতের কাছেই পাওয়া যাবে। তবে মুরুগুমা যাবার আগে এখানে থাকবার জায়গা বুক করে গেলেই ভালো।

মুরুগুমাতে কী দেখবেন

অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তার, তারই কোলে কংসাবতী নদীর স্বচ্ছ জলে পড়ে থাকা সেই পাহাড়, আর নীল আকাশের ছায়া, সেইসঙ্গে সবুজ অরণ্যের বেষ্টনী, সব মিলিয়ে এক অপরূপ নৈসর্গিক জগত যেন বিরাজ করছে এই মুরগুমায়। পুরুলিয়ার সেই অবাধ রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে পাহাড়, নদী, অরণ্যের সমাবেশে যেন এক আশ্চর্য রূপকথার জগত এখানে তৈরি হয়ে উঠেছে। মুরুগুমার এই অপরূপ জলাধারের শান্ত বিস্তীর্ণ জলের ধারে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিলেও সময়ের প্রবাহ যেন বুঝতেই পারা যাবে না। বিরাট জলাধারের কয়েকটি জায়গায় আবার সবুজ দ্বীপও চোখে পড়ে, যা নিমেষেই আন্দামানের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। মুরুগুমার এই জলাধারের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখবার অভিজ্ঞতা এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থেকে যাবে আজীবন। বিশাল আকাশের পশ্চিমপ্রান্তে অযোধ্যার গায়ে লালিমা ছড়িয়ে দিয়ে, নদীর জলকে লাল বর্ণে রঞ্জিত করে সূর্য যখন পাটে বসেন, সেই রঙিন আকাশের প্রেক্ষাপটে ছবির মতন পাখিরা দল বেঁধে যখন বাসায় ফিরে যায়, সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তটি চোখের ক্যামেরায় একবার বন্দী হয়ে গেলে মনের মনিকোঠায় তা অক্ষয় হয়ে থেকে যাবে সারাজীবন। অরণ্য-নদী-পাহাড়ের এই এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে হলে, একবার অন্তত ঘুরে আসতেই হবে মুরুগুমা।
মুরুগুমায় দেখবার জিনিস অল্প হলেও, কোনোটিই মনকে হতাশ করবে না৷

মুরুগুমা ড্যাম বা মুরুগুমা বাঁধ – পর্যটকেরা মুরুগুমাতে ঘুরতে গিয়ে থাকেন, মূলত এই মুরুগুমা ড্যামটিই দেখবার জন্য। কংসাবতীর একটি উপনদীর উপরে নির্মিত এই জলাধারের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। একদিকে অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তার লক্ষ করা যায়। জলাধারে ইতস্তত ছোট ছোট কয়েকটি দ্বীপও দেখা যায়। এই বাঁধের বাঁধানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে এমন অপরূপ প্রকৃতি উপভোগ করা যায়। জলাধারের উপচে পড়া জলে পা ভিজিয়ে বসে থাকার আনন্দও অফুরান। আপার ড্যাম এবং লোয়ার ড্যাম—জলাধারের এই দুটি অংশ থেকেই অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

মুরুগুমা সুইসাইড পয়েন্ট – মুরুগুমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও দর্শনীয় স্থান হল সুইসাইড পয়েন্ট। এই পয়েন্ট থেকে সমগ্র মুরুগুমা ড্যামটিকে উপর থেকে অনেকটা পাখির চোখের মত দেখতে পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর লাগে সেই দৃশ্য। সুইসাইড পয়েন্ট নাম হলেও এরসঙ্গে আদতে সুইসাইডের কোন যোগাযোগ নেই। এটি আসলে পাহাড়ের এমন একটি বিন্দু যার তিনদিকে খাদ এবং জলাধার। এই সুইসাইড পয়েন্টের দূরত্ব মোটামুটি দেড় কিলোমিটার হাঁটা পথ। যেহেতু এই পথ খুবই এবড়োখেবড়ো ও পাথুরে, তাই বর্ষাকালে বা দুর্যোগের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।

উকুমবুরা ভিউ পয়েন্ট – মুরুগুমাতেই আরেকটি ভিউ পয়েন্ট রয়েছে, যেটি উকুমবুরা ভিউ পয়েন্ট নামে পরিচিত। বনজঙ্গলে ঘেরা একটি অতীব সুন্দর পথ পেরিয়ে এই ভিউ পয়েন্টের দিকে যেতে হয়। এখান থেকে মুরুগুমার জলাধার এবং অযোধ্যা পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে।

মুরুগুমা গ্রাম – মুরুগুমার বাঁধ এবং সুইসাইড পয়েন্ট দেখে এখানকার গ্রামটি থেকে একবার পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা যেতে পারে। আদিবাসীদের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হবে সেখানে গেলে। এছাড়াও গ্রামবাসীরা উৎসবের দিনগুলিতে তাদের বাড়ির মাটির দেওয়ালে রঙ দিয়ে যে নানারকমের ছবি আঁকে, সেই চমৎকার শিল্পকলাও দেখতে পাওয়া যাবে। ছবি তোলার নেশা যাদের রয়েছে, তাঁদের এই গ্রাম খুব ভাল লাগবে।

মুরুগুমা থেকে পর্যটকেরা বামনি ঝর্ণা, পাখি পাহাড়, ময়ূর পাহাড়, কিংবা পুরুলিয়ার আরও অন্যান্য পর্যটনস্থানে ঘুরে আসতে পারেন অনায়াসেই।

মুরুগুমাতে কখন যাবেন

পুরুলিয়ার আবহাওয়া যেহেতু চরমভাবাপন্ন ধরনের, তাই এখানে গ্রীষ্মকালে সাঙ্ঘাতিক উষ্ণতা যেমন থাকে, তেমনি শীতকালে থাকে চরম শীতলতা। তবে যেহেতু পুরুলিয়া রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চল, তাই গ্রীষ্মের সময় এখানকার দাবদাহ অসহনীয়। ফলে গ্রীষ্মকালটিকে বাদ দিয়ে শীতকালের দিকে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালই মুরুগুমা যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় বলে মনে হয়। তবে বর্ষাকালেও এখানকার প্রাকৃতিক রূপ যেন আরও উন্মোচিত হয়ে ওঠে, তাই সেই সময়টিতেও ঘুরে আসা যায়, তবে পাহাড়ি, পাথুরে এলাকা বলেই বর্ষায় অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে ঘোরা উচিত।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • বর্ষায় মুরুগুমা গেলে এবং পায়ে হাঁটা পথে সুইসাইড পয়েন্টে গেলে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, কারণ পাথুরে পথ বর্ষায় বিপজ্জনক হতে পারে। শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের এই ধরনের হাঁটা পথে পাহাড়ের শীর্ষবিন্দুতে ওঠবার পরিকল্পনা না করাই ভাল।
  • মুরুগুমার বাঁধের স্বচ্ছ জলে কিংবা পরিচ্ছন্ন চারপাশটিকে অহেতুক আবর্জনা ফেলে নোংরা করবেন না।
  • রুক্ষ প্রকৃতি ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণে গ্রীষ্মকালটি এখানে অসহনীয় হয়ে ওঠে৷ সেই তীব্র দাবদাহে ভ্রমণের আনন্দ মাটি হতে পারে, অসুস্থতার সম্ভাবনাও থাকে, তাই গ্রীষ্মকালটি বাদ দিয়েই মুরুগুমা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ভালো।
  • মুরুগুমায় ঘুরতে গেলে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য অবশ্যই দেখে আসা উচিত। অমন সুন্দর সূর্যাস্ত খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
  • মুরুগুমা গ্রামে ঘুরতে গেলে আদিবাসীদের পরিষ্কার গ্রামটিকে নোংরা করবেন না, সর্বোপরি নিজেদের আনন্দ উপভোগের জন্য সেখানকার সহজ মানুষগুলোর জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করবেন না।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘পুরুলিয়া’, তরুণদেব ভট্টাচার্য, ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮৬
  2. https://purulia.gov.in//
  3. https://puruliatourism.com//
  4. https://www.anandabazar.com/
  5. https://tv9bangla.com/
  6. https://weekenddestinations.info/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading