হাজি মহম্মদ মহসিন (Haji Muhammad Mohsin) ছিলেন ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলার একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী। বিভিন্ন ধরনের মানবদরদী কাজের জন্য তাঁকে দানবীর উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রভূত পরিমাণ অর্থ দান করে যান যা থেকে তৈরি হয়েছিল মহসিন ফান্ড। মহসিন ফান্ড থেকেই তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইমামবাড়া ইত্যাদি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হুগলি মহসিন কলেজ এবং হুগলি ইমামবাড়া।
১৭৩২ সালের (মতান্তরে ১৭৩০ সালের) ৩ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলায় এক শিয়া মুসলমান পরিবারে হাজি মহম্মদ মহসিনের জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষেরা
সতেরো শতকে ইরান থেকে ভারতে এসেছিলেন এবং হুগলি নদীর বন্দরকে বেছে নিয়েছিলেন ব্যবসায়িক কাজকর্মের জন্য। পরবর্তীকালে তাঁরা সেখানেই স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। হাজি মহম্মদ মহসিনের বাবার নাম হাজি ফয়জুল্লাহ্ এবং মায়ের নাম জায়নাব খানাম।
প্রাথমিকভাবে তিনি বাড়িতেই তাঁর পড়াশোনা করেছিলেন। সেখানেই তিনি
কোরান, হাদিস এবং ইসলামী আইন ইত্যাদির শিক্ষালাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি এশিয়ার বিভিন্ন স্থান যেমন, ইরান, ইরাক, তুর্কি, আরব প্রভৃতি স্থান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি মক্কা, মদিনা, কুফা, কারবালা প্রভৃতি ইসলাম ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থানগুলি ভ্রমণ করেছিলেন। হজে যাওয়ার পরে মহম্মদ মহসিনকে হাজি উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
হাজি মহম্মদ মহসিন স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের, অবিভক্ত বাংলার একজন
বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং শিক্ষাবিদ হিসাবে পরিচিত। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন
খুবই সাধারণ এবং সাদামাটাভাবে যাপন করতেন। তিনি একজন সুফি সাধক মানসিকতার মানুষ ছিলেন। টুপি সেলাই করে এবং পবিত্র কোরানের লিপিবিদ্যা বা ক্যালিগ্রাফি করে তার মাধ্যমে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি নিজের
সমস্ত উপার্জিত অর্থ এবং সম্পত্তি পরবর্তীকালে দান করে দিয়েছিলেন বিভিন্ন
সমাজকল্যাণমূলক কাজের এবং শিক্ষার বিস্তারের জন্য। হাজি মহম্মদ মহসিনকে তাঁর এই দানশীল এবং দয়ালু স্বভাবের জন্য দানবীর আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
এক নজরে হাজি মহম্মদ মহসিন -এর জীবনী:
- জন্ম: ৩ জানুয়ারি, ১৭৩২ (মতান্তরে ১৭৩০)
- মৃত্যু: ২৯ নভেম্বর, ১৮১২
- কেন বিখ্যাত: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ছিলেন হাজি মহম্মদ মহসিন। সারা জীবনের সব সঞ্চয় দান করে তৈরি করেছিলেন মহসিন ফান্ড। সেই ফান্ড থেকেই তৈরি হয়েছিল অসংখ্য স্কুল, কলেজ, ইমামবাড়া ইত্যাদি।
- স্বীকৃতি: হজে যাওয়ার পরে মহম্মদ মহসিনকে হাজি উপাধিতে ভূষিত করা হয়। প্রচুর দান করার জন্য ‘দানবীর’ আখ্যা পেয়েছিলেন।
১৭৭০ সালে এক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সেই সময় হাজি মহম্মদ মহসিন পর্যাপ্ত পরিমাণে অস্থায়ী রান্নাঘর তৈরি করেছিলেন। এই রান্নাঘরগুলি স্থাপন করার
পিছনে উদ্দেশ্য ছিল, যাতে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের মুখে পুষ্টিকর এবং জীবনদায়ী খাদ্য তুলে দেওয়া যায়।
১৭৭৬ থেকে ১৭৭৭ সালের এই সময়কালে অবিভক্ত বাংলায় যে মহাদুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেই সময় হাজি মহম্মদ মহসিন অনেক অনাহারী এবং নিঃস্ব ও অসহায় মানুষদের প্রচুর সাহায্য করেছিলেন।
১৮০৩ সালে বোন মুন্নুজানের মৃত্যুর পরে, হাজি মহম্মদ মহসিন বোনের প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন। ১৮০৬ সালে তাঁর সর্বমোট সম্পত্তি অর্থমূল্য ছিল এক লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার টাকা তখনকার সময়ে। তিনি তাঁর এই বিশাল সম্পত্তি দান করে একটি ওয়াকফ ট্রাস্ট গঠন করেন ও এই সম্পত্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা উল্লেখ করেন। এই ফান্ড মহসিন ফান্ড নামে পরিচিত। তাঁর ইচ্ছানুসারে এই বিশাল সম্পদের এক তৃতীয়াংশ রাখা হয়েছিল শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রচার ও প্রসারের জন্য, নয় ভাগের চার ভাগ রাখা হয়েছিল প্রবীণ এবং বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য ভাতা দিতে এবং বাকি অংশ অর্থাৎ নয়ভাগের দুইভাগ রাখা হয়েছিল দুই ট্রাস্টির ব্যয়ভার বহনের জন্য।
১৮১২ সালের ২৯ নভেম্বর হাজি মহম্মদ মহসিনের মৃত্যু হয়। হুগলি ইমামবাড়ার কাছে তাঁর কবর অবস্থিত।
হাজি মহম্মদ মহসিনের মৃত্যুর পরে ফান্ডটির রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে না হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৫ সাল নাগাদ ফান্ডটি অধিগ্রহণ করে। সেই সময় এই ফান্ডের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। মহসিনের ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়ে ব্রিটিশরা এই ফান্ডকে দুটি ভাগে ভাগ করেন। এর একটি অংশ ব্যবহৃত হয় ধর্মীয় কর্মকান্ডে ও অন্য একটি শিক্ষার প্রসারে যার নাম দেওয়া হয় ‘মহসিন এডুকেশনাল এনডাউমেন্ট ফান্ড’। এই ফান্ড থেকে অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা তৈরি করা হয়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল- হুগলী মহসিন কলেজ, মহসিনীয়া মাদ্রাসা (ঢাকা), চট্টগ্রাম মহসিনীয়া মাদ্রাসা, কবি নজরুল সরকারী কলেজ (ঢাকা), ঢাকা গভর্মেন্ট মুসলিম হাই স্কুল, চট্টগ্রাম গভর্মেন্ট মুসলিম হাই স্কুল, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ (চট্টগ্রাম), হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (চট্টগ্রাম), হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (রাজশাহী), হুগলী মাদ্রাসা ইত্যাদি। এছাড়াও এই ফান্ড থেকে অনেক ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়।
১৮৩৬ সালের ১ অগাস্ট মহসিন ফান্ড থেকেই তৈরি হয়েছিল হুগলী মহসিন কলেজ। এই কলেজ সুদীর্ঘ ছিয়াশি বছর ধরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, কৃতিত্বের সাথে পথ হেঁটে চলেছে। বিশ্ব ইতিহাসে অনেক চিরস্মরণীয় মনীষী যেমন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রঙ্গলাল
বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বিখ্যাত সাহিত্যিকরা এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন।
বিপ্লবাচার্য্য জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ, মুজফফর আহমেদ, কানাইলাল দত্ত, ভূপতি
মজুমদার, চারু চন্দ্র রায় প্রমুখের মত আরও অনেক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ছাত্র অথবা শিক্ষক হিসেবে, যাঁরা ভারতীয় স্বাধীনতা
আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। প্রাক্তন বিচারপতি, লেখক এবং ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমির আলি, কালজয়ী সংগীতশিল্পী শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, যাঁরা সাংস্কৃতিক জগতে অনন্য কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন, তাঁরাও এই হুগলী মহসিন কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় মহসিন ফান্ডের টাকা থেকেই ১৮৪১ সালে হুগলী ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছিল এবং তা সম্পন্ন হয়েছিল ১৮৬১
সালে। এখানে ইমামবাড়া টাওয়ারে এক বিশাল আকৃতির ঘড়ি রয়েছে, যা এখানকার অন্যতম মূল আকর্ষণ।
শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রসারের পাশাপাশি ইমামবাড়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যখনই বন্যা, অতিমারী, অথবা অন্য যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটত, তখনই অভিজ্ঞ এবং পারদর্শী চিকিৎসকরা সেখানে যেতেনইমামবাড়া হাসপাতালের পক্ষ থেকে যাবতীয় চিকিৎসার জন্য ওষুধপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে করে নিয়ে যাতে ওই অসহায়, আর্ত মানুষগুলো অতি দরকারী সেবা পায়।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের একটি বন্দরের নামকরণ করা হয় হাজি
মহম্মদ মহসিনের নামে, বি এন এস হাজি মহসিন (BNS Haji Mohsin), এটি ঢাকা
ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত।
হাজি মহম্মদ মহসিন একজন শাসক বা ধনকুবের না হয়েও অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি মানব সেবার জন্য সব কিছু
নিঃস্বার্থভাবে দান করেছিলেন। বাংলার জনগণ যখন ঔপনিবেশিক শোষণে দুর্দশাগ্রস্ত ছিল, হাজি মহম্মদ মহসিন তাঁর সেবা ও সমর্পণের মাধ্যমে আশার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর দানশীলতা এবং মানবতাবাদী কর্ম এখনো তাঁর
প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জীবিত রয়েছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান